Ridge Bangla

মহাস্থানগড়: আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস, সভ্যতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি

বাংলার ইতিহাস মানেই অসংখ্য রাজবংশ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক দীর্ঘ প্রবাহ। সেই ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন ও বিস্ময়কর সাক্ষ্যগুলোর একটি হলো মহাস্থানগড়।

বগুড়ার করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন নগরী আজও বহন করছে আড়াই হাজার বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস, কিংবদন্তি ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য। বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন নগরী হিসেবে পরিচিত এই স্থানটি প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগরের রাজধানী ছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

ঐতিহাসিকদের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দ থেকেই এখানে মানববসতির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। সময়ের পরিক্রমায় এটি হয়ে ওঠে পুণ্ড্ররাজ্যের কেন্দ্রীয় রাজধানী। প্রাচীন গ্রন্থ ও পুরাণে এই অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায় বিভিন্ন নামে- পুণ্ড্রবর্ধন, পৌণ্ড্রনগর এবং পুণ্ড্রনগর। ২০১৬ সালে মহাস্থানগড়কে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেয়।

কিংবদন্তি অনুযায়ী, স্কন্দপুরাণে বলা হয়েছে, বিষ্ণুর অবতার পরশুরাম কঠিন তপস্যার উদ্দেশ্যে করতোয়া নদীর তীরে এই অঞ্চল আবিষ্কার করেন। তপস্যায় সিদ্ধিলাভের পর তিনি এই স্থানের নাম দেন ‘মহাস্থান’। সেই নামই পরবর্তীতে ইতিহাসে স্থায়ী রূপ পায়। একইসঙ্গে লোককথায় রয়েছে রাজা নল ও নীলের দ্বন্দ্ব, অভিশপ্ত ব্রাহ্মণের আগমন এবং নানা পৌরাণিক কাহিনি, যা আজও স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।

চীনা পর্যটক ও বৌদ্ধ ভিক্ষু হিউয়েন সাঙ (ইউয়ান চোয়াং) সপ্তম শতকে এই নগরী পরিদর্শন করেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। তাঁর বিবরণে উঠে এসেছে এক সমৃদ্ধ বৌদ্ধ শিক্ষা কেন্দ্রের কথা, যেখানে চীন ও তিব্বতসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা আসতেন। তাঁর বর্ণনায় করতোয়া নদীর বিস্তৃতি ও নগরীর সমৃদ্ধ জীবনযাত্রার চিত্রও পাওয়া যায়। এটি প্রমাণ করে যে মহাস্থানগড় শুধু রাজনৈতিক রাজধানীই ছিল না, বরং জ্ঞানচর্চারও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও ছিল।

ভৌগোলিকভাবে মহাস্থানগড় বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩–১৮ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬ মিটার উঁচু একটি প্রাচীন উচ্চভূমি, যা প্রাকৃতিকভাবে প্রতিরক্ষার জন্য অনুকূল ছিল। একসময় এই নগরী ছিল আয়তাকার দুর্গ নগর, যার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় দেড় কিলোমিটার। চারপাশে ছিল বিশাল প্রতিরক্ষা প্রাচীর, বিভিন্ন প্রবেশদ্বার, যেমন কাঁটা দুয়ার, বুড়ির ফটক, দোরাব শাহ তোরণ এবং তাম্র দরজা। এই কাঠামোই প্রমাণ করে প্রাচীন নগর পরিকল্পনার উন্নত ধারা।

নগরীর ভেতরে রয়েছে অসংখ্য প্রত্ননিদর্শন- জিয়ৎ কুণ্ড, মানকালীর ধাপ, পরশুরামের প্রাসাদ, বৈরাগীর ভিটা, খোদার পাথর ভিটা, জাহাজঘাটা ও গোবিন্দ ভিটা। প্রতিটি স্থাপনা ইতিহাসের একেকটি অধ্যায়কে তুলে ধরে। এর আশপাশে ছড়িয়ে আছে শতাধিক ঢিবি ও প্রত্নস্থান, যা প্রাচীন জনপদের বিস্তৃতি ও জনজীবনের প্রমাণ বহন করে।

লোককথায় মহাস্থানগড়কে ঘিরে রয়েছে বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর গোকুল মেধসহ নানা কাহিনি। নরপতির ধাপ, তোতারাম পণ্ডিতের ধাপ এবং ভাসু বিহারের মতো প্রত্নস্থাপনাগুলো এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের সাক্ষ্য দেয়।

প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের ইতিহাসও সমৃদ্ধ। ১৮০৮ সালে ফ্রান্সিস বুকানন প্রথম এই স্থান শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে ১৮৭৯ সালে আলেকজান্ডার কানিংহাম একে প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী হিসেবে চিহ্নিত করেন। ১৯৩১ সালের খননে ব্রাহ্মী লিপিযুক্ত শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়, যেখানে সম্রাট অশোকের দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের প্রতি সহায়তার নির্দেশ পাওয়া যায়।

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ খনন কার্যক্রমে নতুন নতুন তথ্য উন্মোচিত হয়। ১৯৯৩ সাল থেকে পরিচালিত এই খননে ১৮টি নির্মাণ স্তর এবং প্রাক-মৌর্য যুগের নিদর্শন পাওয়া যায়। মাটির ঘর, চুলা, রুলেটেড পাত্র ও উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র প্রমাণ করে যে এখানে এক উন্নত ও ধারাবাহিক মানবসভ্যতা ছিল।

মহাস্থানগড় শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়, এটি বাংলার সভ্যতার এক জীবন্ত ইতিহাস। এখানে রাষ্ট্রব্যবস্থা, ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ একসঙ্গে ঘটেছে। প্রাচীন বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র থেকে শুরু করে হিন্দু পুরাণের কাহিনি, ইসলামি ঐতিহ্যের কিংবদন্তি- সবই মিশে গেছে এই একক ভৌগোলিক স্থানে।

আজও মহাস্থানগড় দাঁড়িয়ে আছে নীরব সাক্ষী হয়ে। ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীর, মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা নিদর্শন এবং ছড়িয়ে থাকা ঢিবিগুলো যেন বলছে হাজার বছরের না বলা গল্প। এটি শুধু বগুড়ার একটি পর্যটন বা প্রত্নস্থল নয়, বরং সমগ্র বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের এক অমূল্য ভান্ডার।

This post was viewed: 9

আরো পড়ুন