মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে, যখন ড্রোন আর মিসাইলের গর্জনে কেঁপে ওঠে পারস্য উপসাগরের তীর, তখন সাধারণ বিশ্লেষকরা একে দেখেন কেবল ভূ-রাজনীতি, জ্বালানি তেল কিংবা পারমাণবিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই হিসেবে। কিন্তু এই দৃশ্যমান সংঘাতের আড়ালে উঠেছে ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রবল জোয়ার। সম্প্রতি ইরানে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানকে কেবল কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আমেরিকার ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিস্টান এবং ইসরায়েলের কট্টরপন্থী জায়নবাদী ইহুদিদের কাছে এটি একটি ‘ঐশ্বরিক পরিকল্পনার’ অংশ। তাদের চোখে এই যুদ্ধ কেবল দুটি ভূখণ্ডের লড়াই নয়, বরং এটি বাইবেলে বর্ণিত শেষ সময়ের এক ভবিষ্যদ্বাণী।
ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিস্টানদের দৃষ্টিভঙ্গি: আর্মাগেডনের অপেক্ষা
আমেরিকার রাজনীতিতে ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিস্টানরা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গোষ্ঠী। তাদের বিশ্বাসের মূলে যে তত্ত্ব রয়েছে, সে তত্ত্ব অনুযায়ী, যিশু খ্রিস্টের দ্বিতীয় আগমনের জন্য কিছু পূর্বশর্ত পূরণ হতে হবে, যার প্রধানতম হলো পবিত্র ভূমিতে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং সুরক্ষা। ইভাঞ্জেলিক্যালদের কাছে ইরান কেবল একটি দেশ নয়, বরং এটি বাইবেলে উল্লেখিত ‘পারস্য’, যাকে তারা হিব্রু বাইবেলের ‘এজেকিয়েল’ অধ্যায়ে বর্ণিত ‘গগ এবং মাগগ’-এর যুদ্ধের অন্যতম পক্ষ হিসেবে মনে করে।
তাদের বিশ্বাস মতে, শেষ যুদ্ধে পারস্য বা ইরান ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে উদ্যত হবে এবং সেই সঙ্কটময় মুহূর্তে ঈশ্বর স্বয়ং ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়াবেন। এই বিশ্বাস থেকেই তারা আমেরিকার ইসরায়েল নীতিকে অন্ধভাবে সমর্থন করে। তাদের কাছে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো মানে হলো অশুভ শক্তিকে প্রতিহত করা এবং যিশু খ্রিস্টের প্রত্যাবর্তনের পথ প্রশস্ত করা। তারা মনে করে, ইসরায়েলকে দেওয়া প্রতিটি সমর্থন আসলে ঈশ্বরের আশীর্বাদ পাওয়ার পথ। বাইবেলের জেনেসিস ১২:৩ পদের উল্লেখ করে তারা বিশ্বাস করে, “যারা ইসরায়েলকে আশীর্বাদ করবে, ঈশ্বর তাদের আশীর্বাদ করবেন; আর যারা তাকে অভিশাপ দেবে, ঈশ্বর তাদের অভিশাপ দেবেন।”
জায়নবাদী ইহুদিদের প্রেক্ষাপট: অস্তিত্ব ও আধ্যাত্মিক পুনরুদ্ধার
ইসরায়েলের জায়নবাদী ইহুদিদের কাছে এই লড়াই আরও বেশি বাস্তবমুখী এবং একই সাথে আধ্যাত্মিক। জায়নবাদের একটি বড় অংশ মনে করে, ইহুদিদের এই ভূমিতে ফিরে আসা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এটি একটি হাজার বছরের পুরনো প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। তাদের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কেন্দ্রে রয়েছে ‘তৃতীয় মন্দির’ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা এবং ‘মসীহ’ বা ত্রাণকর্তার আগমন।
জায়নবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ইরানকে দেখা হয় প্রাচীন ‘হামান’-এর আধুনিক সংস্করণ হিসেবে, যে ইহুদি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। বর্তমান ইরানের ‘রেভল্যুশনারি গার্ডস’ কিংবা তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে তারা প্রাচীন শত্রু ‘আমালেক’ (Amalek)-এর উত্তরসূরি মনে করে। হিব্রু ধর্মগ্রন্থে আমালেকের সাথে চিরস্থায়ী যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। তাই ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান তাদের কাছে কেবল আত্মরক্ষা নয়, বরং পবিত্র ভূমির পবিত্রতা রক্ষা এবং ইহুদি জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক আধ্যাত্মিক যুদ্ধ। তারা মনে করে, ইরান যদি পারমাণবিক শক্তি অর্জন করে, তবে তা হবে ঈশ্বরের দেওয়া উপহার অর্থাৎ ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্য এক চূড়ান্ত অবমাননা। সুতরাং, ইরানের শক্তি খর্ব করা তাদের কাছে ধর্মীয়ভাবে একটি বাধ্যতামূলক কাজ।
দুই ধারার মিলনবিন্দু: অভিন্ন স্বার্থ
ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিস্টান ও জায়নবাদী ইহুদিদের চূড়ান্ত ধর্মীয় লক্ষ্য ভিন্ন হলেও বর্তমান ইরান ইস্যুতে তারা একই বিন্দুতে এসে মিলেছে। ইভাঞ্জেলিক্যালরা চায় যিশুর আগমন, আর জায়নবাদীরা চায় মসীহ’র আগমন এবং ইহুদি রাজত্বের বিস্তার। এই দুই বিশ্বাসের সেতুবন্ধন হলো ইরানকে ধ্বংস করা এবং ইসরায়েলকে শক্তিশালী করা।
আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই ইভাঞ্জেলিক্যাল ভোটব্যাংক হোয়াইট হাউসের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে যাতে তারা ইসরায়েলের প্রতিটি আক্রমণাত্মক পদক্ষেপকে সমর্থন দেয়। তেল আবিব এবং ওয়াশিংটনের এই সামরিক সংহতি আসলে একধরনের ‘থিও-পলিটিক্যাল’ বা ধর্ম-রাজনৈতিক আঁতাত। ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পেছনে গোয়েন্দা তথ্যের চেয়েও বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে এই সম্মিলিত বিশ্বাস যে পারস্যের দম্ভ চূর্ণ করা ঈশ্বরের ইচ্ছা।
বৈশ্বিক প্রভাব ও ঝুঁকি
এই সংঘাতকে যখন ধর্মীয় চশমায় দেখা হয়, তখন কূটনীতির সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসে। কারণ, ধর্মীয় বিশ্বাসে সমঝোতার চেয়ে ‘বিজয়’ বা ‘ধ্বংস’ বেশি গুরুত্ব পায়। ইভাঞ্জেলিক্যালদের বিশ্বাস অনুযায়ী যদি এই সংঘাত ‘আর্মাগেডন’ বা মহাপ্রলয়ের দিকে নিয়ে যায়, তবে তারা একে ভয় পাওয়ার বদলে স্বাগত জানাবে, কারণ এটি তাদের বিশ্বাসের চূড়ান্ত সার্থকতা। অন্যদিকে, ইসরায়েলি জায়নবাদীরা একে তাদের পবিত্র ভূখণ্ড সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে।
কিন্তু এই ধর্মীয় উন্মাদনা মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বিশ্বের জন্য এক ভয়ংকর বার্তা বহন করছে। যখন রাষ্ট্রীয় নীতি বাইবেলের রূপক কিংবা প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, তখন মানবিক বিপর্যয় কিংবা পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি গৌণ হয়ে পড়ে। ইরানকে লক্ষ্য করে চালানো প্রতিটি মিসাইল যেন এই বিশ্বাসের আগুনে আরও ঘি ঢালছে।
ইরান, আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই ত্রিমুখী সংঘাতকে বিশ্লেষণ করতে গেলে কেবল আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার কৌশল দিয়ে তা সম্ভব নয়। এর গভীরে লুকিয়ে আছে কয়েক হাজার বছরের পুরনো ধর্মীয় বিশ্বাস, ভয় এবং প্রত্যাশা। ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিস্টান এবং জায়নবাদী ইহুদিদের এই ধর্মীয় জোট বর্তমান বিশ্বরাজনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যেখানে যুদ্ধ মানে কেবল ধ্বংস নয়, বরং এক শ্রেণির মানুষের কাছে এটিই হলো মুক্তির পথ। যতক্ষণ পর্যন্ত এই সংঘাতকে ধর্মীয় পবিত্রতার মোড়ক থেকে বের করে বাস্তবসম্মত কূটনীতিতে আনা না যাবে, ততক্ষণ মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি কেবল রূপকথার পাতায়ই সীমাবদ্ধ থাকবে। বিশ্বাসের এই লড়াই কি শেষ পর্যন্ত শান্তি আনবে, নাকি এক নজিরবিহীন প্রলয়ের সূচনা করবে- তা সময়ই বলে দেবে।