সকালবেলায় যে মানুষটি হাসিমুখে পরিবারকে বিদায় জানিয়ে কাজ করতে বের হয়েছেন কিংবা বিকেলে পাড়ার দোকানে বসে হাসিমুখে চা খেয়েছেন, সমাজের চোখে সেই ‘ভদ্র’ ও ‘সাধারণ’ মানুষটিই হয়তো গভীর রাতে কোনো এক উন্মত্ত ভিড়ের অংশ হয়ে অন্য একজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলছেন। আপাতদৃষ্টিতে এই বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হলেও এটাই রূঢ় বাস্তবতা। একে সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনি। প্রশ্ন হলো, ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলে একজন বিবেকবান মানুষের বিচারবুদ্ধি কোথায় হারিয়ে যায়? কেন মানুষ তখন ব্যক্তিগত নীতিবোধ ভুলে গিয়ে এক হিংস্র প্রাণীতে পরিণত হয়?
ব্যক্তিত্বের অবলুপ্তি বা ডি-ইন্ডিভিজুয়েশন
মব সাইকোলজির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যক্তিত্বের অবলুপ্তি। ১৮৯৫ সালে ফরাসি মনোবিজ্ঞানী গুস্তাভ লে বন তার বিখ্যাত ‘দ্য ক্রাউড’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন যে, ভিড়ের মধ্যে মানুষের ব্যক্তিগত চেতনা লুপ্ত হয়ে যায় এবং একটি ‘যৌথ মস্তিষ্ক’ তৈরি হয়। যখন একজন ব্যক্তি নিজেকে কোনো একটি বড় গোষ্ঠীর অংশ হিসেবে দেখেন, তখন তার নিজস্ব দায়বদ্ধতা ও আত্মপরিচয় ঢাকা পড়ে যায়। সে তখন নিজেকে কোনো স্বাধীন সত্তা নয়, বরং একটি বড় ঝড়ের একটি ধূলিকণা মনে করে। এই নামহীনতা তাকে এমন সব কাজ করতে প্ররোচিত করে, যা সে একা অবস্থায় করার কথা কল্পনাও করতে পারত না।
দায়িত্বের বিভাজন
ভিড়ের মধ্যে অপরাধ করার সাহস বাড়ে ‘দায়িত্বের বিভাজন’ তত্ত্বের কারণে। যখন একশো জন মানুষ মিলে কাউকে আক্রমণ করে, তখন প্রত্যেকে মনে করে, “আমি একা তো মারছি না, সবাই মারছে। সুতরাং এর দায় আমার একার নয়।” এই মানসিকতা প্রতিটি ব্যক্তির নিজস্ব অপরাধবোধকে প্রশমিত করে। মনোবিজ্ঞানে একে ‘বাইস্ট্যান্ডার ইফেক্ট’-এর একটি চরম রূপ বলা যেতে পারে। এখানে ব্যক্তি মনে করে, ভিড়ের বিশালতার আড়ালে তার নিজের অপরাধ ঢাকা পড়ে যাবে এবং আইন বা সমাজ তাকে চিহ্নিত করতে পারবে না।
আবেগের সংক্রমণ
ভিড় বা মব অনেকটা আগুনের মতো কাজ করে। আগুনের শিখা যেমন এক ডাল থেকে অন্য ডালে ছড়িয়ে পড়ে, আবেগও তেমনি ভিড়ের মধ্যে সংক্রামিত হয়। ভিড়ের মধ্যে থাকা দু-একজন ব্যক্তি যদি চরম উত্তেজিত বা ক্ষিপ্ত থাকে, তবে তাদের সেই ক্রোধ খুব দ্রুত পুরো দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। একে বলা হয় ‘সোশ্যাল ফ্যাসিলিটেশন’। মানুষের মস্তিষ্কের ‘মিরর নিউরন’ অন্যকে যা করতে দেখে, নিজের অজান্তেই তা অনুসরণ করতে প্ররোচিত করে। ফলে কোনো যৌক্তিক বিচার ছাড়াই মানুষ কেবল অন্যদের আক্রমণাত্মক ভঙ্গি দেখে নিজেও হিংস্র হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে তার নিজস্ব বিবেক, নৈতিকতা কিংবা পরিস্থিতি বিচার করার বুদ্ধি কোন কাজে আসে না। অনেকটা ‘হিতাহিতজ্ঞানশূন্য’ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
বিমানবিকীকরণ বা ডিহিউম্যানাইজেশন
মব ভায়োলেন্সের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো শিকার বা ভিক্টিমকে ‘মানুষ’ হিসেবে না দেখে তাকে একটি ‘লেবেল’ বা তকমা দিয়ে দেওয়া। হতে পারে সেটি ‘চোর’, ‘ছেলেধরা’, ‘ধর্মদ্রোহী’ কিংবা ‘দেশের শত্রু’। যখন কোনো মানুষকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তখন ভিড়ের কাছে সে আর একজন রক্তমাংসের মানুষ থাকে না, বরং একটি ঘৃণ্য বস্তুতে পরিণত হয়। এই মানসিক প্রক্রিয়ায় ভিক্টিমের প্রতি সহমর্মিতা বা এম্প্যাথি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। তখন তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলাকে অপরাধ নয়, বরং ‘ন্যায়বিচার’ বা ‘পবিত্র দায়িত্ব’ হিসেবে মনে করতে শুরু করে সাধারণ মানুষ।
দলগত চিন্তা ও সামাজিক চাপ
মানুষ মূলত সামাজিক প্রাণী। সে সবসময় দলের সাথে থাকতে পছন্দ করে। কোনো উত্তেজিত ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে যদি কেউ সেই সহিংসতার বিরোধিতা করে, তবে সে নিজেই দলের লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ার ভয় পায়। ফলে নিজের নৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেয়ে দলের সাথে তাল মিলিয়ে চলাই তখন তার কাছে নিরাপদ মনে হয়। এই আনুগত্যের চাপ একজন বিবেকবান মানুষকেও নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে বাধ্য করে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক সময় মব ভায়োলেন্স কেবল তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফল নয়। সমাজের সাধারণ মানুষের মনে জমে থাকা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সিস্টেমের প্রতি অনাস্থা যখন কোনো একটি স্ফুলিঙ্গ পায়, তখন তা ভিড়ের মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয়। তখন সামনে পাওয়া যেকোনো দুর্বল শিকারকে তারা তাদের সমস্ত বঞ্চনার প্রতিনিধি বানিয়ে আক্রমণ করে।
মব ভায়োলেন্স বা ভিড়ের এই উন্মত্ততা দমনে কেবল আইন ও শাস্তিই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। ব্যক্তিমানুষকে ভিড়ের মধ্যেও নিজের বিবেক জাগ্রত রাখার শিক্ষা দিতে হবে। যখন সমাজ ও রাষ্ট্র দ্রুত এবং সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে পারবে না, তখন মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কমবে না। পরিশেষে, আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন- ভিড়ের কোনো চেহারা নেই, কিন্তু সেই ভিড়ের প্রতিটি হাত কোনো না কোনো মানুষের। সেই হাতটি দয়া করবে নাকি পাথর ছুঁড়বে, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে মানুষের শিক্ষা ও মূল্যবোধের ওপর।