Ridge Bangla

রাশিয়া ও চীনের ‘কৌশলগত নীরবতা’: কেন ইরানকে বারবার একাই লড়ে যেতে হয়?

​মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এখন এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ইরানজুড়ে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা এবং এর ফলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ দেশটির শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রাণহানি বিশ্বকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রতিক্রিয়ায় ইরানও ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে শত শত ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছে। এই সংঘাত যখন একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে, তখন বিশ্ববাসীর নজর এখন মস্কো ও বেইজিংয়ের দিকে। প্রশ্ন উঠেছে, রাশিয়ার ‘অজেয়’ সমরশক্তি আর চীনের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রভাব কি কেবল গতানুগতিক কূটনৈতিক বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ? কেন সংকটকালে ইরানকে বারবার একাই লড়ে যেতে হয়?

​মিত্রতার সমীকরণ বনাম বাস্তব রাজনীতি

​দীর্ঘদিন ধরেই ইরান, রাশিয়া এবং চীনকে একটি অলিখিত ‘পশ্চিমবিরোধী অক্ষ’ হিসেবে দেখা হয়। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহ করে সহায়তা করেছে, আবার চীনের বিশাল জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ মেটায় ইরান। কিন্তু যখনই তেহরানের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ে, তখনই এই দুই পরাশক্তির অবস্থানে এক ধরনের ‘কৌশলগত নীরবতা’ বা ‘Strategic Silence’ পরিলক্ষিত হয়। এর পেছনে কাজ করছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং নিজ নিজ দেশের জাতীয় স্বার্থ।

​রাশিয়ার সীমাবদ্ধতা ও ইউক্রেন ফ্যাক্টর

​রাশিয়া বর্তমানে নিজেই এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন সীমান্তে আটকে থাকা ক্রেমলিনের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া প্রায় অসম্ভব। রাশিয়ার জন্য ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার, কিন্তু ইসরায়েলের সাথেও রাশিয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল ও গভীর। সিরিয়ায় রুশ সামরিক উপস্থিতির ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সাথে রাশিয়ার একটি সমঝোতা রয়েছে।

এছাড়া, ইসরায়েলে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক রুশ বংশোদ্ভূত নাগরিক পুতিন প্রশাসনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার বিষয়।

​মস্কো জানে যে, ইরানে সরাসরি সামরিক সহায়তা দিলে তারা আমেরিকার সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা এই মুহূর্তে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক সামর্থ্যের বাইরে। তাই রাশিয়া ইরানকে রাজনৈতিক সমর্থন দিলেও বা অস্ত্র বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিলেও, ময়দানে ইরানের পাশে দাঁড়ানোর ঝুঁকি তারা নিচ্ছে না। তাদের নীরবতা আসলে একটি সুচিন্তিত নিষ্ক্রিয়তা।

​চীনের অর্থনৈতিক কূটনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা

​অন্যদিকে চীনের দর্শন সম্পূর্ণ আলাদা। বেইজিং কখনোই কোনো সামরিক জোটে জড়িয়ে পড়তে চায় না। চীনের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক আধিপত্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তা। ইরান চীনের জন্য তেলের একটি বড় উৎস ঠিকই, কিন্তু সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এমনকি ইসরায়েলের সাথেও চীনের বিশাল বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো একটি পক্ষের হয়ে যুদ্ধে নামলে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) এবং সামগ্রিক বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে।

​চীন বিশ্বাস করে ‘মধ্যস্থতা’র শক্তিতে, ‘মিলিটারাইজেশন’ বা সামরিকীকরণে নয়। তারা তেহরান ও রিয়াদের মধ্যে বরফ গলাতে সফল হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আমেরিকার বিশাল সামরিক শক্তির সামনে দাঁড়িয়ে ইরানের জন্য ঢাল হওয়া চীনের নীতিতে নেই। বেইজিংয়ের কৌশল হলো- যতক্ষণ পর্যন্ত পরিস্থিতি তাদের বাণিজ্যে বড় ধরনের আঘাত না হানছে, ততক্ষণ তারা কেবলমাত্র ‘শান্তি বজায় রাখার’ আহ্বান জানিয়ে যাবে।

ইরানের একাকী লড়াইয়ের ঐতিহাসিক বাস্তবতা

​ইরানের জন্য এই নিঃসঙ্গতা নতুন কিছু নয়। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকেই দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে অনেকটা একঘরে। সাদ্দাম হোসেনের সাথে আট বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধেও ইরান কাউকে পাশে পায়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান বুঝতে পারছে যে, রাশিয়া বা চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তাদের জন্য কাল হতে পারে। আমেরিকা যেভাবে ইসরায়েলের সুরক্ষায় সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করে বা গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করে, ইরানের জন্য রাশিয়া বা চীনের ভূমিকা সেই তুলনায় অতি নগণ্য।

​ইরানের মিত্ররা আসলে ‘সুসময়ের বন্ধু’ অথবা ‘পারস্পরিক স্বার্থের অংশীদার’। তারা ইরানকে ব্যবহার করতে চায় পশ্চিমা শক্তিকে ব্যস্ত রাখার একটি মাধ্যম হিসেবে। রাশিয়া ও চীন চায় মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা যেন ইরানের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত থেকে নিজেদের সম্পদ ও মনোযোগ ব্যয় করে, যাতে ইউক্রেন বা তাইওয়ান ইস্যুতে তারা বাড়তি সুবিধা পায়। এই দাবার চালের বলি হচ্ছে ইরান নিজেই।

​সামরিক প্রযুক্তি ও সক্ষমতার ফারাক

​বাস্তবতা হলো, ইসরায়েল ও আমেরিকার যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন- আয়রন ডোম বা অ্যারো সিস্টেম), তার বিপরীতে রাশিয়ার এস-৪০০ বা চীনের আধুনিক প্রযুক্তি ইরানকে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই দুই দেশ সব সময় দ্বিধাবোধ করেছে। ইরানকে শক্তিশালী করার অর্থ হলো মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়া, যা রাশিয়া বা চীন কেউই পুরোপুরি চায় না। তারা চায় ইরান টিকে থাকুক, কিন্তু এতটাও শক্তিশালী না হোক যাতে ইরান নিজেই একক আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়।

​রাশিয়া ও চীনের ‘কৌশলগত নীরবতা’ আসলে আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। এখানে কোনো চিরস্থায়ী বন্ধু নেই, আছে কেবল চিরস্থায়ী স্বার্থ। ইরানকে বারবার একাই লড়ে যেতে হচ্ছে কারণ তাদের তথাকথিত মিত্ররা সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার চেয়ে কূটনৈতিক টেবিলে বসে ফায়দা লুটতে বেশি আগ্রহী। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু এবং ইসরায়েলি হামলা তেহরানের জন্য এক চরম পরীক্ষা। ​যদি ইরান এই যুদ্ধে টিকে থাকতে চায়, তবে তাদের বুঝতে হবে যে মস্কো বা বেইজিংয়ের সাহায্য কেবলমাত্র শর্তসাপেক্ষ এবং সীমিত। দিনের শেষে, মধ্যপ্রাচ্যের এই রুক্ষ মরুভূমিতে ইরানকে তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই নিজের রক্ত দিয়েই লড়তে হবে।

This post was viewed: 9

আরো পড়ুন