Ridge Bangla

ভারতবধের মাহাত্ম্য আসলে কতটুকু?

একটু পেছন ফিরি। ভারত ম্যাচ শুরুর আগে বাংলাদেশ দলের তারকাদের সবার কন্ঠে ছিল অভিন্ন সুর। ভারতকে হারাতে হবে, জয়খরা কাটাতে হবে। জয়খরা বলতে ভারতের বিপক্ষে ২২ বছর অধরা জয় নয় কেবল, বছরজুড়ে ভালো খেলেও জয় না পাওয়ার আক্ষেপ ঘোচানোরও একটা সুযোগ। জাতীয় স্টেডিয়াম ঢাকায় ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যার অপেক্ষায় ছিল সবাই। ফুটবলারদের অপেক্ষা পেশাদারত্ব ছাড়িয়ে যেন আরও বেশি। শোনা যাক তিন তারকা–জামাল ভূঁইয়া, হামজা চৌধুরী ও শমিত সোমের চাওয়ার কথা।

ক্যাপ্টেন জামাল বলেছিলেন, ‘আমরা এই ম্যাচের জন্য সবাই অপেক্ষা করছি। এটা একটা ভালো ম্যাচ হতে চলেছে। ভালো প্র্যাকটিস করেছি সবাই। ভারতের সঙ্গে খেলা নিয়ে আমি আত্মবিশ্বাসী। খেলোয়াড়দের সবার মধ্যে আত্মবিশ্বাস আছে। আশা করি, ভারতের সঙ্গে তিন পয়েন্ট পাব।’

হামজা লিখেছিলেন, ‘বড় ম্যাচের সব প্রস্তুতি শেষ! আপনাদের সবাইকে দেখা আর আপনাদের দারুণ উচ্ছ্বাস অনুভব করার জন্য আর তর সইছে না!’

শমিত বলেছিলেন, ‘জানি, ভারত ভালো দল, আমরাও ভালো দল। এই ম্যাচটার অনেক অর্থ আছে, তাই না? যে দ্বৈরথটা আমাদের মধ্যে আছে, ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে, কিন্তু আমরা প্রস্তুত থাকব। আশা করি, আমরা জিততে পারব। আমরা ভালো খেলতে পারি, ভালো পারফরম্যান্স দিতে পারি। যে জয়টা খুঁজছি আমরা, এই মঙ্গলবারের ম্যাচে সেটা আশা করি পাব।’

দলের তিন সুপারস্টারের কথায় মিল পাচ্ছেন? ঠিক ধরেছেন। প্রত্যেকের মাঝে জয়ের তীব্র ক্ষুধা দৃশ্যমান। হামজা-শমিতরা জাতীয় দলে আসার পর থেকে বাংলাদেশ শিবিরে এটি প্রখর হতে শুরু করে। স্থানীয়রা আগে যেভাবে খেলে যেত, এখন বদলাতে হচ্ছে খোলনলচে। যার ফল, ভারতকে একপ্রকার বলে-কয়ে হারানো।

এবার আসা যাক, এই জয় আসলে কতটা গুরুত্ব রাখছে? আদৌ কোনো কাজে আসবে এটি। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এশিয়ান কাপের বাছাইপর্ব থেকে তো আগেই নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের বিদায়। ওই যে বলে না, একটা দুয়ার বন্ধ হওয়া মানে আরও অনেকগুলো দুয়ার খুলে যাওয়া? বাংলাদেশের এই জয়টি ঠিক তা-ই! ব্যবধান ন্যূনতম, ১-০ গোল। স্কোরলাইন দেখে বোঝার উপায় নেই, এই একটি গোল আসলে কতটা ভ্যালুয়েবল।

বিশ্ব ফুটবলের মানদণ্ডে এই জয় কেউ মনে রাখবে না৷ একটু সংশোধন দরকার। আজ হয়তো মনে রাখবে না। যখন বাংলার ফুটবল দাঁড়িয়ে যাবে, নতুন প্রজন্ম সবার চোখে চোখ রেখে লড়াই করবে, সেদিন সবাই খুঁজবে। ১৮ নভেম্বর, ২০২৫। জাতীয় স্টেডিয়াম, ঢাকায় রচিত হয় এক সাহসী আখ্যান। ২২ বছরের জয়খরা কাটিয়ে ভারতকে হারায় বাংলাদেশ, যা আসলে ভিত্তিপ্রস্তর, দেশের ফুটবল নামক ইমারতের।

এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বের চলতি বছর মার্চে ভারতের বিপক্ষে শুরু করে বাংলাদেশ। হামজার প্রথম ম্যাচে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা ড্র করে। কোনো গোল হয়নি ম্যাচে। তবে, আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান দল ভারত থেকে দেশে ফেরে। তারপর শমিত সোম যোগ দিলেন। ফাহামিদুল ইসলাম এলেন। জায়ান আহমেদ জায়গা পেলেন। কিউবা মিচেলের অভিষেক হলো। ভিনদেশের বিলাসিতার মায়া ত্যাগ করে ছেলেরা বাংলার পতাকাকে ধারণ করেছে। মুখে মুখে নয়, মনে-প্রাণে। সিঙ্গাপুর, হংকংয়ের বিপক্ষে জাতীয় স্টেডিয়ামে ফল আসেনি। তবু, কেউ ঘাবড়ে যায়নি। দর্শক আরও দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে ভারতবধের সাক্ষী হতে এসেছে।

ভারত ম্যাচের পর হামজা বলেছিলেন, ‘আমরা ইন শা আল্লাহ বড় টুর্নামেন্টেও খেলব। কোয়ালিফাই করব। খালি সময় আর ধৈর্য নিয়ে আমরা দল গঠন করছি। অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করছি। চাপের মুখে খেলা শিখছি। স্টেডিয়াম-ভর্তি মানুষের সামনে খেলাটা অনেক অনেক চাপের। আগের চারটি ম্যাচে কঠিন সময় ছিল। কিন্তু, দলটি অসাধারণ। পুরো দেশ যেন একসঙ্গে খেলছে, সবাই উদযাপন করছে।’

এই তো! যে দেশের ফুটবল গ্যালারিতে বিনামূল্যে দেখতেও রাজি ছিল না লোকে, ক’দিন আগেও ফাঁকা গ্যালারিই ছিল বাস্তবতা, সেখানে ভারতের বিপক্ষে জাতীয় স্টেডিয়ামে দর্শক হয়েছে ২২ হাজার ৪০০। টিকিট ছাড়ার ছয় মিনিটে সোল্ড আউট। এতে লাভটা হয়েছে ফুটবলের। ম্যানেজমেন্ট পয়সাকড়ির মুখ দেখবে, বিনিয়োগ আসবে। ফুটবলাররা জবাবদিহিতার ভয়টা পাবে। আন্তর্জাতিক মানের তারকাদের সঙ্গে থেকে নিজেদের শান দিতে পারবে।

গ্যারেথ বেলকে নিশ্চয়ই চেনেন। ওয়েলসের তারকা ফুটবলাররা। একসময় বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার ছিলেন। তাকে দলে ভেড়াতে চেয়েছিল ইংল্যান্ড। তিনি মানা করেছেন। বেল যখন মানা করেন, র‌্যাঙ্কিংয়ে তার দলের অবস্থান ১০০-র বাইরে, ইংল্যান্ড সেরা দশে! সেই বেল ইউরোর মঞ্চে ইংল্যান্ডের সঙ্গে খেলেছে। র‌্যাঙ্কিংয়ে তখন তফাৎ নেই বললেই চলে।

আমাদের হামজা-শমিতরা একই স্বপ্নের পথে ছুটছেন। সেখানে একটি জয় প্রয়োজন ছিল। উজ্জীবনী শক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে যে জয়ের বিকল্প নেই। ভারতের সঙ্গে বছরের শেষ ম্যাচের জয়টা মনে করিয়ে দেয় পুরোনো প্রবাদ– ‘শেষ ভালো যার, সব ভালো তার।’

এই পোস্টটি পাঠ হয়েছে: ৫২

আরো পড়ুন