Ridge Bangla

৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটামে এক যুগ পেরিয়েছে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের একটি ফ্ল্যাট থেকে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। সেই রাতে তাঁদের ৫ বছরের শিশুসন্তান মেঘ ওই ঘরেই ছিল। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়। এরপর এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত ওই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। এখন পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ পিছিয়েছে ১২৫ বার।

হত্যাকাণ্ডের পরদিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তার করা হবে। কিন্তু সেই ৪৮ ঘণ্টা আজ ১৪ বছরেও শেষ হয়নি। তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকারও দাবি করেছিলেন, তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে বাস্তবে তার প্রতিফলন মেলেনি।

এই মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় তিনটি ভিন্ন বাহিনী কাজ করেছে, কিন্তু ফলাফল শূন্য। শুরুতে তদন্ত করছিল শেরেবাংলা নগর থানা-পুলিশ। চার দিন পর মামলার তদন্তভার পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দুই মাসের তদন্তে কোনো কূলকিনারা করতে না পারার ব্যর্থতা আদালতে স্বীকার করে তারা। একই বছরের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্ট ডিবিকে মামলার দায়িত্ব র‌্যাবের হাতে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন।

এরপর র‌্যাব দীর্ঘ ১২ বছরের তদন্তকালীন সময়ে দফায় দফায় সময় নিলেও কোনো প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। ২০১৭ সালে তারা জানিয়েছিল, আলামত পরীক্ষায় সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়া গেছে। ওই ডিএনএ কার, তা শনাক্তে পরীক্ষার জন্য আলামত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেই ডিএনএ কার, তা আর শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। মেলেনি কোনো সদুত্তরও।

২০২৪ সালের শেষ দিকে মামলার তদন্তভার হস্তান্তর করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। বর্তমানে তারা ওই একই তালে কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।

উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হলেও গত ১ এপ্রিল, বুধবার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় আরও একবার পিছিয়েছে। এদিন তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী দিন ধার্য করেন ৭ মে।

হত্যাকাণ্ডের পর নিহত রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, সাগর-রুনির বাড়ির দুই নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং বন্ধু তানভীর রহমান খান। এদের মধ্যে তানভীর জামিনে রয়েছেন। পলাশ রুদ্র পাল জামিনে বের হয়ে পলাতক। বাকি আসামিরা কারাগারে।

হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গুঞ্জন উঠলেও তার কোনোটিই এখনো প্রমাণিত হয়নি। ফেব্রুয়ারি ২০২২-এ জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের দেওয়া এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ওই দম্পতি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের দুর্নীতি নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করছিলেন, যা তারা খুব শিগগিরই প্রকাশ করতে যাচ্ছিলেন। এটি প্রভাবশালী মহলের মাথাব্যথার কারণ ছিল। ব্যক্তিগত শত্রুতার কথাও বলা হলেও তদন্তকারীরা এই দিকটিতে জোরালো প্রমাণ পাননি।

এর পাশাপাশি শুরুতে ডিবি পুলিশ একে সাধারণ চুরি বা ডাকাতি বলতে চাইলেও রুনির পরিবার এবং সাংবাদিক সমাজ তা প্রত্যাখ্যান করে। কারণ, ঘর থেকে কোনো মূল্যবান সম্পদ খোয়া যায়নি।

হত্যাকাণ্ডের সময় পাঁচ বছরের শিশু সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান মেঘ এখন তরুণ। দীর্ঘ এক যুগ ধরে সে শুধু শুনেছে, তদন্ত চলছে। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পটপরিবর্তনের পর এই মামলা নিয়ে নতুন করে আশা দেখা দিলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও তার ১৮ মাসের মেয়াদে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ করে যেতে পারেনি।

নতুন সরকার দেশের হাল ধরেছে। এখন মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকার কি আদৌ প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করতে চায়? নাকি কোনো অদৃশ্য শক্তি আবারও সত্যকে আড়াল করে রাখবে? এই হত্যাকাণ্ডের বিচার যতদিন না সম্পন্ন হবে, ততদিন তা দেশে সাংবাদিক সুরক্ষার ভঙ্গুর অবস্থার এক জীবন্ত দলিল হয়ে থাকবে।

This post was viewed: 43

আরো পড়ুন