Ridge Bangla

হাসানের সুরেলা যাত্রার গল্প

বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের জনপ্রিয় মুখ সৈয়দ হাসানুর রহমান। ১৯৭৪ সালের ১৯ এপ্রিল তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। নব্বইয়ের দশকে তরুণ সমাজের কাছে এক আইকন হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। দুই শতাধিক ব্যান্ড গান গাইতে গিয়ে তিনি ব্যান্ড সঙ্গীতাঙ্গনে এক অনন্য পরিচিতি লাভ করেছেন।

হাসানের সঙ্গীতজীবনের শুরু ১৯৯৩ সালে, যখন তিনি ব্যান্ড দল আর্কের (ARK) ভোকালিস্ট হিসেবে যোগ দেন। আর্কের সঙ্গে তার সঙ্গীতযাত্রা শুরু হলেও ক্রমে তিনি তার নিজস্ব ভয়েস ও স্টাইলের কারণে দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। আর্কে থাকাকালেই তিনি প্রথমবার ব্যান্ড সঙ্গীতের জগতে পরিচিতি পান।

১৯৯৬ সালে আর্কের প্রথম অ্যালবাম ‘তাজমহল’ প্রকাশিত হয়। এই অ্যালবামে তার গানগুলো মূলত নিজের লেখা ও সুরের, যা ব্যান্ড সঙ্গীতের পাশাপাশি পশ্চিমা ধাঁচের গান হিসেবে তরুণ শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। অ্যালবামের গানগুলো সুপারহিট হয়, যা তাকে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ড ভোকালিস্ট হিসেবে পরিচিতি দেয়।

দুই বছর পর, ১৯৯৮ সালে, আর্ক ‘জন্মভূমি’ নামে আরেকটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। এটি আগের তুলনায় আরও বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই অ্যালবামের জনপ্রিয় গান ‘যা রে যা’ আজও শ্রোতাদের প্রিয় তালিকায় রয়েছে।

হাসানের সঙ্গীতজীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব আশিকুজ্জামান টুলুর সঙ্গে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে। হাসানের কণ্ঠ শুনে টুলু প্রস্তাব দেন যে, বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে ইংরেজি গানের সুরে একটি বাংলা কমার্শিয়াল ক্যাসেট বের করা হবে। হাসান প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন। ফলস্বরূপ ‘কপি আর ২’ নামের ক্যাসেটটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

আর্কে প্রায় নয় বছর থাকার পর ২০০২ সালে হাসান ব্যান্ড আর্ক ছেড়ে নতুন ব্যান্ড ‘স্বাধীনতা’ গঠন করেন। স্বাধীনতার ব্যানারে প্রথম অ্যালবাম ‘কারবালা’ প্রকাশিত হয়। ২০১০ সালের শেষের দিকে তিনি আবার আর্কে যোগ দেন।

হাসানের সঙ্গীতজীবনের বৈশিষ্ট্য হলো, তার উত্থান একেবারেই আকস্মিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, তার গানের সুর, কথা এবং ভয়েস তার ব্যান্ডজীবনকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। আর্ক ব্যান্ডের সঙ্গে থাকাকালীন তিনি ‘তাজমহল’ ও ‘জন্মভূমি’ অ্যালবামের মাধ্যমে তার কণ্ঠের গুণ এবং সঙ্গীতের দিকনির্দেশনা সমৃদ্ধ করেন। পরবর্তীতে স্বাধীনতা ব্যান্ড এবং একক অ্যালবাম ‘তাল’ প্রকাশ করে তিনি তার সৃজনশীলতা আরও প্রসারিত করেন।

হাসান মনে করেন, তার অনেক গান এখনো চূড়ান্ত সন্তুষ্টি দিতে পারেনি। তিনি এমন গান করতে চান, যা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেবে। এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি একক ও ব্যান্ডের মাধ্যমে ক্রমাগত নতুন সুর এবং কথা তৈরি করছেন।

২০০৪ সালে তিনি এলআরবির সঙ্গে ‘বৃহস্পতি’ নামে একটি মিশ্র অ্যালবাম প্রকাশ করেন। এর পরের অ্যালবামগুলো হলো- আপন কষ্ট, বেস্ট অব হাসান, ফেরারী, হ্যালো কষ্ট, কন্যা মন দিলি না, লাল বন্ধু নীল বন্ধু এবং তিনশ তিন। এসব অ্যালবামের মাধ্যমে হাসান ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ব্যান্ড সঙ্গীতের এই আইকন শুধুমাত্র কণ্ঠের জন্য নয়, বরং সৃজনশীলতা ও শিল্পের মান বজায় রাখার জন্যও প্রশংসিত। বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসে সৈয়দ হাসানুর রহমান এক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, যার সঙ্গীত একাধিক প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে।

তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি আলোচনার আড়ালে রয়েছেন, সঙ্গীত থেকেও কিছুটা দূরে সরে গেছেন। তার অনুপস্থিতিতে ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয়েছে একধরনের শূন্যতা। একসময়ের সেই প্রাণবন্ত ব্যান্ড তারকার ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন অসংখ্য শ্রোতা।

This post was viewed: 22

আরো পড়ুন