Ridge Bangla

হরমুজ প্রণালী: ইরানের তুরুপের তাস

মার্কিন-ইসরাইলি জোটের সাথে ইরানের চলমান যুদ্ধ হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব আরো একবার স্পষ্ট করে তুলেছে। সংকীর্ণ এই নৌপথের প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সারা বিশ্বেই। এর মূল কারণ কৌশলগত অবস্থান এবং তেল বাণিজ্যে এর অপরিহার্যতা। ঠিক একারণেই ইরানের প্রতিরক্ষা নীতির অন্যতম অনুষঙ্গ হরমুজ প্রণালী।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব

এমন নয় যে কেবল তেল পরিবহনের জন্যই হরমুজ ঘিরে এত মাতামাতি। পারস্য উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সংযোগ সেতু হিসেবে এই প্রণালী দশম শতক থেকেই বহুল ব্যবহৃত। এশিয়া, আফ্রিকা আর মধ্যপ্রাচ্যের বণিকরা এই পথে নিয়ে যেতেন মশলা, কাপড়, হাতির দাঁত ইত্যাদি সব মূল্যবান দ্রব্য। এর ফলে উপকূলবর্তী শহরগুলো পরিণত হয়েছিল সাংস্কৃতিক আর বাণিজ্যিক বিনিময়ের অপূর্ব মিলনস্থলে।

হরমুজের সুবিধা কুক্ষিগত করতে ঔপনিবেশিক পর্তুগিজ শক্তি ষোড়শ শতকে এর দখল নেয়। তখন থেকেই এই প্রণালী ঘিরে আরম্ভ হয় বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাড়াকাড়ি। পর্তুগিজদের পর কিছুদিন ডাচরা এখানে ছড়ি ঘোরায়, তবে কেউই স্থায়ীভাবে প্রাধান্য স্থাপন করতে পারেনি।

বিংশ শতকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ব্যাপক আকারে তেল রপ্তানি শুরু করে। হরমুজ প্রণালী হয়ে বিশাল বিশাল তেলবাহী ট্যাঙ্কার বিশ্ববাজারে তেল বয়ে নিয়ে যেত। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই প্রণালী একটি প্রভাবক হয়ে দাঁড়ায়।

কৌশলগত অবস্থান

পারস্য উপসাগরের সাথে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরে যাতায়াতের অন্যতম পথ এই প্রণালী। প্রস্থ খুব কম, কোথাও কোথাও কেবল ২১ নটিক্যাল মাইল (২৪ মাইল)। যথেষ্ট গভীর এবং তুলনামূলভাবে নিরাপদ এই নৌপথ। প্রণালীর নির্দিষ্ট পথ ধরে চলাচল করতে হয় প্রতিটি নৌযানকে।

পারাপারযোগ্য রাস্তা পড়েছে ইরান আর ওমানের জলসীমায়। হরমুজের ওমানি অংশের গভীরতা বেশি। তবে ওমানের রুক্ষকঠিন উপকূলের তুলনায় ইরানি জলসীমা জাহাজের জন্য অধিকতর সুবিধাজনক। যদিও নিয়ম অনুযায়ী এখানে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন কার্যকর হয়, তারপরেও নৈকট্যের কারণে ইরানের নিয়ন্ত্রণই বেশি।

পারস্য উপসাগরীয় এলাকা বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল ভাণ্ডার। সারা পৃথিবীর তেল সরবরাহের শতকরা ত্রিশ ভাগই যায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ফলে প্রণালীতে যেকোনো গোলযোগের ঝাঁকুনি অনুভুত হয় সারা পৃথিবীতে। তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে, যার ধাক্কা পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও।

ইরানের সমরনীতিতে হরমুজের ভূমিকা

বাণিজ্যপথ হিসেবে হরমুজের গুরুত্ব ইরানের সমরবিশারদদের চোখ এড়ায়নি। ট্যাঙ্কার চলাচলে বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে ধস নামানোর হুমকি যেকোনো শত্রুকেই ভাবিত করবে। ঠিক সেজন্যেই ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকেই এই প্রণালীকে ইরান তার প্রতিরক্ষা নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে বেশ কিছু সক্ষমতা ইতোমধ্যে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করেছে তারা।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (Islamic Revolutionary Guard Corps) মোটরচালিত ছোট ছোট বোটের বহর তৈরি করেছে। এগুলো ঝাকে ঝাকে প্রণালী দিয়ে চলাচলরত যেকোনো জাহাজের ওপর ঝটিকা আক্রমণ চালাতে পারে। দূর থেকে মিসাইল মারতে উপকূলীয় এলাকার ঘাঁটিতে বসানো আছে উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা। সেখান থেকে চাইলে তারা ড্রোনও লেলিয়ে দিতে পারে। সবথেকে ভয়াবহ হবে যদি ইরান এই প্রণালীতে মাইন পেতে রাখে, তাহলে হরমুজ পরিণত হবে জাহাজের জন্য মৃত্যুফাঁদে। ইরানের ভাণ্ডারে ম্যাগনেটিক এবং অ্যাকাউস্টিক সেন্সর সম্পন্ন মাহাম-৩ মাইন আছে, যা ফাটার জন্য জাহাজের সাথে সরাসরি সংঘর্ষ দরকার হয় না।

প্রণালীরে ভেতরে আটটি বড় দ্বীপ আছে। এর সাতটিই ইরানের অধীনে। যদিও তিনটি দ্বীপ নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে বিবাদ আছে তাদের- আবু মুসা, বড় টানভ আর ছোট টানভ (Greater Tunb, Lesser Tunb islands)। ১৯৭০ সাল থেকেই প্রতিটি দ্বীপেই সামরিক স্থাপনা তৈরি করেছে ইরান। তদুপরি বন্দর আব্বাস, বেশেহর, শাহবাহার ইত্যাদি নৌঘাঁটি থেকে খোলা সাগরে খুব দ্রুত হামলা করতে পারে তাদের নৌবাহিনী।

ইরান জানে সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তিতে অগ্রসরমান শত্রুরাষ্ট্রের বিপক্ষে সম্মুখসমরে কুলিয়ে ওঠার শক্তি তাদের নেই। তাদের অন্যতম কৌশল হতে পারে হরমুজকে অস্ত্রে পরিণত করে বিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে চাঞ্চল্য তৈরি হবে সেটা আন্তর্জাতিক মহলকে বাধ্য করবে যুদ্ধ সংক্ষিপ্ত বা বন্ধ করার জন্য চাপ দিতে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির পক্ষেও প্রতিটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার পাহারা দিয়ে প্রণালী পার করে দেয়া কার্যত অসম্ভব।

পশ্চিমা অবরোধের মুখে ইরানি কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝেই এই প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেয়। বর্তমান লড়াই আরম্ভ হওয়ার পর ইরানের নতুন আয়াতুল্লাহ ইতোমধ্যেই সেই আদেশ জারি করেছেন। বেশ কিছু হামলার পর নৌ-পরিবহন কোম্পানিগুলো হরমুজ দিয়ে চলাচল স্থগিত করে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে তেল সরবরাহ ও মূল্যে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইরানি আক্রমণের মুখ তেল উৎপাদন কমিয়ে দেয়ায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো স্বল্পতা মোকাবেলায় সংরক্ষিত তেল ছাড় করা শুরু করেছে। কিন্তু তাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।

ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল

হরমুজ প্রণালী ইরানের সুরক্ষা কবচের অন্যতম। বছরের পর বছর অবরোধ আর বর্তমান সহিংসতার পরেও তাই এর ওপর নিয়ন্ত্রণ এতটুকু হ্রাস করেনি তারা। তবে মনে রাখতে হবে ইরানের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিও তেল, এবং এর উল্লেখযোগ্য অংশও যায় হরমুজ ধরে। সুতরাং এখানে জাহাজ চলাচল না করলে সারা পৃথিবীতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ইরানও তার বাইরে নয়। তাছাড়া এই অবরোধ দীর্ঘমেয়াদি হলে ইরানের অন্যতম মিত্র চীন ও রাশিয়াও নাখোশ হতে পারে।  মিত্রদের সন্তুষ্ট রাখতে কূটনৈতিকভাবে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান। ভারত আর রাশিয়ার পতাকাবাহী জাহাজকে নির্বিঘ্নে চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছে।

মিডল ইস্ট ইন্সটিটিউটের সিনিয়র ফেলো ব্রায়ান কাটুঁলিস (Brian Katulis) ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাথে এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন- যদি কূটনীতি কাজ না করে তাহলে হরমুজ প্রণালী খোলা এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা নিশ্চিহ্ন করার একমাত্র উপায় স্থলবাহিনী মোতায়েন। তেমনটা হলে অত্যন্ত বিপদজনক মোড় নেবে চলমান যুদ্ধ।

ইরানকে খেলতে হচ্ছে খুব সাবধানে। প্রণালী একেবারে বন্ধ করে দিলে অন্যান্য বেশ কিছু দেশ যোগ দিতে পারে মার্কিন-ইসরাইলি জোটে। পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠলে হয়তো হরমুজের দখল নিতে চূড়ান্ত শক্তিও প্রয়োগ করতে পারে পশ্চিমারা। সবকিছুই নির্ভর করছে কোন পক্ষ কতটুকু ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিতে ইচ্ছুক তার উপর।

This post was viewed: 2

আরো পড়ুন