Ridge Bangla

ষাট গম্বুজ মসজিদ: ইতিহাস, স্থাপত্য ও খান জাহান আলীর অমর কীর্তি

বাগেরহাট দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার এক শান্ত জনপদ, যেখানে ইতিহাস আজও নিঃশব্দে কথা বলে। এই শহরের বুকেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের সবচেয়ে গৌরবময় নিদর্শন ষাট গম্বুজ মসজিদ। ইট, পাথর আর সময়ের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এই স্থাপনা শুধু একটি উপাসনালয় নয়; এটি বাংলার সুলতানি আমলের শক্তি, শিল্পবোধ ও ধর্মীয় চেতনার এক অনন্য দলিল।

ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রস্তরনির্মিত ঐতিহাসিক মসজিদ। দক্ষিণ এশিয়ার স্থাপত্য ইতিহাসেও এটি একটি ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। খুলনা বিভাগীয় শহর থেকে অল্প দূরে, বাগেরহাট শহর থেকে মাত্র চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে, সবুজ প্রকৃতির মাঝে এই মসজিদ যেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব প্রহরী।

পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়। বাংলা তখন সুলতানি শাসনের অধীনে। সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনামলে সুন্দরবন অঞ্চলকে জনবসতিতে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব পান দরবেশ ও সেনানায়ক খান জাহান আলী। তিনি এই অঞ্চলে গড়ে তোলেন খলিফাতাবাদ নামের এক নতুন প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র, যা আজকের বাগেরহাট নামে পরিচিত।

এই নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই নির্মিত হয় ষাট গম্বুজ মসজিদ। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রথমদিকে এটি খান জাহান আলীর দরবার বা বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তী সময়ে এটি বৃহৎ জামে মসজিদ ও ধর্মীয় শিক্ষা-কেন্দ্রে পরিণত হয়। ইট, চুন ও চুনাপাথরের সমন্বয়ে নির্মিত এই বিশাল স্থাপনা সম্পূর্ণ করতে লেগেছিল বহু বছর। নির্মাণসামগ্রীর একটি বড় অংশ আনা হয়েছিল তৎকালীন রাজমহল অঞ্চল থেকে।

নামের সঙ্গে বাস্তবতার মজার পার্থক্য রয়েছে। মসজিদটির নাম ‘ষাট গম্বুজ’ হলেও প্রকৃতপক্ষে এখানে মোট গম্বুজের সংখ্যা ৮১টি। ভেতরে ৭৭টি গম্বুজ এবং চার কোণে চারটি মিনার-আকৃতির গম্বুজ রয়েছে। তবে মসজিদের অভ্যন্তরে থাকা ৬ সারিতে সাজানো ৬০টি বিশাল প্রস্তর স্তম্ভ থেকেই সম্ভবত ‘ষাট গম্বুজ’ নামের উৎপত্তি। তুঘলকি ও জৌনপুরী স্থাপত্যশৈলীর মিশেলে নির্মিত এই মসজিদে মোটা দেয়াল, ভারী স্তম্ভ এবং খিলানযুক্ত দরজার ব্যবহার চোখে পড়ে। এর স্থাপত্যে বাহুল্য নেই, কিন্তু রয়েছে দৃঢ়তা ও শৈল্পিক ভারসাম্য। শত শত বছর পেরিয়েও মসজিদটি আজও স্থির ও অটল, যেন সময়কে অতিক্রম করে দাঁড়িয়ে আছে।

মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে মোট ১০টি মিহরাব। এর মধ্যে মাঝখানের মিহরাবটি সবচেয়ে বড় ও নান্দনিক। পোড়ামাটির অলংকরণ ও পাথরের নকশায় এই মিহরাব মধ্যযুগীয় বাংলার শিল্পরুচির পরিচয় বহন করে। ধারণা করা হয়, খান জাহান আলী নিজে এই কেন্দ্রীয় মিহরাবের সামনে দাঁড়িয়ে ইবাদত করতেন।

পূর্বদিকে রয়েছে ১১টি খিলানযুক্ত দরজা, যা মসজিদের মূল প্রবেশপথ। উত্তর ও দক্ষিণপাশে আরও ১৪টি দরজা রয়েছে, দুই পাশে ৭টি করে। এতগুলো দরজার ফলে ভেতরে বাতাস চলাচল সহজ হয়, আর গম্বুজের নিচে তৈরি হয় এক স্বাভাবিক শীতল পরিবেশ। গ্রীষ্মের দাবদাহেও মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলে এক ধরনের প্রশান্তি অনুভূত হয়।

ষাট গম্বুজ মসজিদ শুধু একটি স্থাপত্য নয়; এটি খান জাহান আলীর জীবনদর্শনের প্রতিফলন। তিনি ছিলেন একাধারে শাসক, সুফি সাধক ও সমাজসংস্কারক। সুন্দরবনের দুর্গম অঞ্চলে বসতি স্থাপন, জলাশয় খনন, মসজিদ ও রাস্তা নির্মাণ- সবকিছুই ছিল মানুষের কল্যাণের জন্য। ঐতিহাসিকদের মতে, ষাট গম্বুজ মসজিদ কেবল নামাজের স্থান নয়; এটি ছিল শিক্ষা, বিচার ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্র। এখানে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হতো, সামাজিক সমস্যার সমাধান হতো, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও নেওয়া হতো।

মসজিদের পাশেই রয়েছে রহস্যময় খান জাহানের দিঘি। এই বিশাল জলাশয় শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ নয়, বরং লোককথা ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু। দিঘিতে বসবাসকারী কুমিরগুলো স্থানীয়দের কাছে বিশেষ সম্মানের প্রতীক। ধারণা করা হয়, এদের অনেকের বয়স শত বছরেরও বেশি। বিশেষ ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে আজও কুমিরদের খাবার দেওয়া হয়। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, এই কুমিরগুলো খান জাহান আলীর আমল থেকেই এ এলাকার রক্ষক হিসেবে রয়েছে। ইতিহাস ও কিংবদন্তির এই মিশ্রণ ষাট গম্বুজ মসজিদকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।

দিনের আলোয় ষাট গম্বুজ মসজিদ যেমন দৃঢ় ও গম্ভীর, সূর্যাস্তের পর তেমনই মায়াবী। লালচে সূর্যালোকে ইটের দেয়াল যেন নতুন করে জেগে ওঠে। পাশের দিঘির জলে হালকা ঢেউ, দূরে পাখির ডাক- সব মিলিয়ে এক অপার্থিব আবেশ তৈরি হয়। তখন মনে হয়, ইতিহাস যেন নিঃশব্দে দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলছে।

ষাট গম্বুজ মসজিদ শুধু বাগেরহাটের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের গর্ব। এটি আমাদের জানায়, এই ভূখণ্ডে একসময় কত উন্নত স্থাপত্যজ্ঞান, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক চেতনা ছিল। ধর্ম, ইতিহাস, শিল্প ও মানবিক দর্শনের এক অপূর্ব মিলন এই মসজিদ। আজও দেশি-বিদেশি পর্যটক, গবেষক ও ইতিহাসপ্রেমীরা ছুটে আসেন ষাট গম্বুজ মসজিদ দেখতে। কেউ আসে স্থাপত্যের টানে, কেউ আসে আধ্যাত্মিক প্রশান্তির খোঁজে। সবার কাছেই এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ষাট গম্বুজ মসজিদ ইট-পাথরের একটি স্থাপনা মাত্র নয়; এটি বাংলার গভীর শেকড়ের প্রতীক, অতীতের গৌরব আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া এক চিরন্তন নিদর্শন।

This post was viewed: 12

আরো পড়ুন