রুশ সাম্রাজ্যের ধূসর ইতিহাসে এমন এক চরিত্রের নাম খোদাই করা আছে, যার উল্লেখ ছাড়া রোমানভ রাজবংশের পতনকাহিনী অসম্পূর্ণ। তিনি গ্রিগোরি ইয়েফিমোভিচ রাসপুতিন। ১৯১৬ সালের এক হিমশীতল রাতে নেভা নদীর বরফগলা জলে যখন তার নিথর দেহটি পাওয়া যায়, তখনো কেউ জানত না যে এই মানুষটি তার মৃত্যুর এক শতাব্দী পরেও সমান রহস্যময় থেকে যাবেন। তিনি কি একজন সত্যিকারের অলৌকিক সাধু ছিলেন, নাকি ছিলেন এক সুনিপুণ ভণ্ড? কেন তাকে ঘিরে আজও বিতর্কের শেষ নেই?
যাযাবর থেকে রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে
সাইবেরিয়ার এক অখ্যাত গ্রাম থেকে উঠে আসা রাসপুতিন ছিলেন মূলত একজন ‘স্তারেৎস’ বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। তার কোনো প্রথাগত শিক্ষা ছিল না। কিন্তু ছিল মানুষের মন পড়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা। তিনি ভবঘুরে আধ্যাত্মিক সাধক হিসেবেই পরিচিতি পান।
১৯০৫ সালে যখন তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গে পা রাখেন, তখন রাশিয়ার রাজপরিবার এক চরম সংকটে নিমজ্জিত। যুবরাজ আলেক্সেই হিমোফিলিয়ার যন্ত্রণায় কাতর। আর চিকিৎসাবিজ্ঞান তার সামনে অসহায়। কথিত আছে, রাসপুতিন তার রহস্যময় প্রার্থনার মাধ্যমে যুবরাজ আলেক্সেইয়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সক্ষম হন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যেখানে ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে রাসপুতিনের এই সাফল্য তাকে জারিনা আলেকজান্দ্রার চোখে ‘ঈশ্বরের দূত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। রাজদম্পতির এই অন্ধবিশ্বাসই ছিল রাসপুতিনের ক্ষমতার উৎস। ফলে তা রাশিয়ার অভিজাত মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও চারিত্রিক স্খলন
রাসপুতিনকে ঘিরে বিতর্কের সবচেয়ে বড় জায়গাটি ছিল রাজনীতি। রাজপরিবারের ওপর ছিল তার অস্বাভাবিক প্রভাব। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার নিকোলাস যখন রণাঙ্গনে ব্যস্ত, তখন রাজপ্রাসাদের নিয়ন্ত্রণ কার্যত চলে যায় রাসপুতিনের হাতে। জারিনার ওপর তার প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে, তার এক ইশারায় রাশিয়ার মন্ত্রীরা পদ হারাতেন বা নতুন মন্ত্রী নিয়োগ হতো। ফলে তা রাশিয়ার অভিজাত শ্রেণি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। একজন সাধারণ কৃষক হয়ে রাশিয়ার সাম্রাজ্য পরিচালনা ছিল তৎকালীন আভিজাত্যের জন্য চরম অপমানজনক।
রাসপুতিন নিজেকে সাধু দাবি করলেও তার জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত। মদ্যপান, উচ্ছৃঙ্খলতা এবং নারীদের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল ওপেন সিক্রেট। লোকমুখে প্রচলিত ছিল যে, তিনি আধ্যাত্মিকতার আড়ালে সাধারণ মানুষকে সম্মোহিত করতেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ পাওয়া যায়। অনেকে মনে করেন, তিনি জার্মানির চর হিসেবে কাজ করতেন এবং রাশিয়ার সামরিক পরিকল্পনাগুলো পাচার করতেন। যদিও এর কোনো জোরালো প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু এই গুজবগুলোই রাজতন্ত্রের ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে রাশিয়ার রক্ষণশীল গির্জা এবং রাজনৈতিক মহল তাকে ‘পবিত্র শয়তান’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে শুরু করে। আবার, সমালোচকরা রটিয়েছিলেন যে, জারিনা আলেকজান্দ্রার সাথে তার অবৈধ সম্পর্ক ছিল। এই গুজব রাজপরিবারের মর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অশুভ শক্তির প্রতীক, যে রুশ সাম্রাজ্যের মুখে কলঙ্ক লেপন করেছে।
রাসপুতিনের রহস্যময় মৃত্যু
রাসপুতিনকে ঘিরে বিতর্কের চূড়া হলো তার মৃত্যু। তাকে হত্যা করাটা ছিল প্রায় অসম্ভব এক কাজ। ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রিন্স ফেলিক্স ইউসুপভের নেতৃত্বে একদল অভিজাত ব্যক্তি তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। হত্যার বর্ণনাটি রূপকথার চেয়ে কম কিছু নয়।
রাসপুতিনকে প্রথমে পটাশিয়াম সায়ানাইড মেশানো কেক ও মদ খাওয়ানো হয়। এতে একজন সাধারণ মানুষের মুহূর্তেই মৃত্যু হওয়ার কথা। কিন্তু রাসপুতিনের কিছুই হলো না। এরপর তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়, তবুও তিনি বেঁচে যান। শেষে আরও কয়েক দফা গুলি করে এবং মারধর করে তাকে বরফশীতল নেভা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। ময়নাতদন্তে দেখা যায়, বিষ বা গুলিতে নয়, বরং তীব্র ঠান্ডায় পানিতে ডুবেই তার মৃত্যু হয়েছিল। এই মৃত্যুই তাকে এক অতিপ্রাকৃত সত্তা হিসেবে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
রাজতন্ত্রের পতনে রাসপুতিনের ভূমিকা
অনেকে মনে করেন রাসপুতিন একাই রুশ বিপ্লবের কারণ। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে, রাশিয়ার পতন ছিল দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফল। রাশিয়ার সমাজ ও অর্থনীতি তখন এমনিতেই নড়বড়ে ছিল। আর রাসপুতিন ছিলেন সেই কফিনে শেষ পেরেক। রাজপরিবারের সাথে তার বিতর্কিত সম্পর্ক জনগণের সামনে জার নিকোলাসের ভাবমূর্তি নষ্ট করে তুলেছিল। ফলস্বরূপ ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
গ্রিগোরি রাসপুতিন ছিলেন তৎকালীন রাশিয়ার অস্থিরতার এক প্রতিচ্ছবি। তার চোখে ছিল সম্মোহনী শক্তি, আর চরিত্রে ছিল বৈপরীত্য। একদিকে তিনি ছিলেন যুবরাজের রক্ষাকর্তা, অন্যদিকে সাম্রাজ্যের কলঙ্ক। রাশিয়ার ইতিহাসে তিনি আজও এক অমীমাংসিত রহস্য হয়ে আছেন, যা ঘৃণা এবং কৌতূহল উভয়কেই সমানভাবে উসকে দেয়। সম্ভবত এই রহস্যময়তাই রাসপুতিনকে ইতিহাসের পাতায় চিরকাল বিতর্কিত ও প্রাসঙ্গিক করে রাখবে।