ভারতের রাজধানী দিল্লির কোনো এক অজ্ঞাত ঠিকানায় এখন সময় কাটছে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। গতকাল ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ছাত্রজনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যা, গত দেড় দশকের অধিক সময়ের শাসনকালে গুম-খুনসহ মানবতাবিরোধী নানা অপরাধের দায়ে দীর্ঘ বিচারকার্য শেষে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর তার ভাগ্য এখন ঝুলে আছে জটিল এক আইনি ও কূটনৈতিক দ্বৈরথের ওপর।
বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম স্পর্শকাতর এই রায়ের পর ঢাকা জরুরি ভিত্তিতে চিঠি পাঠিয়েছে দিল্লিতে। আবেদন স্পষ্ট, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় যেন দ্রুত শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের চোখে এই অনুরোধ কি এতটাই সরল? নাকি দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত হওয়া প্রত্যর্পণ চুক্তিরই কিছু ‘বিশেষ ধারা’?
জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনালের এই রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানায় যে, রায়টি তাদের নজরে এসেছে। তবে বিশ্লেষকরা লক্ষ করেছেন বিবৃতিতে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ শব্দবন্ধটি উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে লেখা হয়েছে। কূটনৈতিক মহলে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা ইঙ্গিত দেয় যে নয়াদিল্লি হয়তো এই বিচারিক প্রতিষ্ঠানের নামকরণ বা আইনি ভিত্তি নিয়ে পুরোপুরি একমত নয়।
এ ঘটনাটি এখন দুই দেশের মধ্যে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির (যা ২০১৬ সালে সংশোধিত হয়) অ্যাসিড টেস্ট। মূলত দুই দেশের মধ্যে পলাতক আসামিদের দ্রুত বিনিময়ের উদ্দেশ্যেই চুক্তিটি স্বাক্ষর করা হয়েছিল। ঢাকা চাইছে চুক্তিটির ১০(৩) ধারা ব্যবহার করে প্রক্রিয়াটি দ্রুত সারতে।
এই সংশোধিত ধারা অনুযায়ী, অনুরোধকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সেসব অভিযোগের পক্ষে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ না করলেও চলবে। শুধু সংশ্লিষ্ট আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পেশ করলেই তা বৈধ অনুরোধ হিসেবে গণ্য হবে। আপাতদৃষ্টিতে এই ধারা শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের পথকে মসৃণ করেছে।
তবে চুক্তির মৌলিক কাঠামোতে এমন কিছু ‘সেফটি ভালভ’ বা ধারা রয়েছে যা অনুরোধ-প্রাপক দেশ হিসেবে ভারতকে প্রত্যর্পণ নাকচ করার ক্ষমতা দেয়। প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাধাটি হলো, ‘রাজনৈতিক প্রকৃতি’র অভিযোগ। চুক্তি অনুযায়ী, যদি হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ করা ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিক প্রকৃতির হয়, তবে ভারত সেই অনুরোধ খারিজ করে দিতে পারে।
যদিও চুক্তিতেই স্পষ্ট করে বলা আছে যে হত্যা, গণহত্যা, গুম, অনিচ্ছাকৃত হত্যা ঘটানো ও সন্ত্রাসবাদের মতো গুরুতর অপরাধগুলোকে ‘রাজনৈতিক’ বলে খারিজ করা যাবে না। তবুও জটিলতা থেকেই যায়। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা মামলাগুলোতে গণহত্যা ও হত্যার মতো অভিযোগ থাকায় আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোকে সম্পূর্ণভাবে ‘রাজনৈতিক’ বলে বাতিল করা কঠিন। তবে যেহেতু অভিযোগের প্রেক্ষাপট রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন ও ক্ষমতা দখলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাই এর ব্যাখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
এছাড়াও অনুরোধ-প্রাপক দেশেও যদি ওই একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ‘প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধে’র কোনো মামলা চলমান থাকে তাহলেও সেটা দেখিয়ে অনুরোধ-প্রেরক দেশের প্রত্যর্পণ দাবী খারিজ করা যাবে। তবে আশার কথা হচ্ছে- এই মুহুর্তে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ভারতে কোনো মামলা চলছে না এবং অচিরে মামলা হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। তাই এক্ষেত্রে অবশ্য এই ধারা প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়।
তবে এই চুক্তির ভেতরেই লুকিয়ে আছে আরও একটি ধারা, যা নয়াদিল্লির জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে। সেটি হলো, অনুরোধ-প্রাপক দেশ যদি মনে করে যে ‘অভিযোগগুলো শুধু ন্যায় বিচারের স্বার্থে সরল বিশ্বাসে আনা হয়নি’, তবে তারা সেই অনুরোধ নাকচ করার ক্ষমতা রাখবে। দিল্লির কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত, এটাই ভারতকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেবে। সামরিক অপরাধ সংক্রান্ত আরও একটি ধারা থাকলেও, এই সরল বিশ্বাস সম্পর্কিত ধারাটিই হবে মূল ফোকাস।
ভারত প্রকাশ্যে এই রায় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ না করলেও তারা গোপনে এই যুক্তি দিতে পারে যে, ক্ষমতাচ্যুত একজন প্রধানমন্ত্রী তার অনুপস্থিতিতে হওয়া এই রায়ে সঠিক ও সুষ্ঠু বিচার পাননি। সেক্ষেত্রে ভারত সরাসরি বাংলাদেশের আদালতকে দোষারোপ না করেও কূটনৈতিকভাবে ঘোষণা করতে পারে যে, তাদের মতে অভিযোগগুলো সরল বিশ্বাসে বা একমাত্র ন্যায়বিচারের স্বার্থে আনা হয়নি। সে কারণেই হাসিনাকে হস্তান্তর করা সম্ভব নয়।
এই পরিস্থিতিতে প্রত্যর্পণ চুক্তি এখন আর কেবল দুটি দেশের আইনি বাধ্যবাধকতার দলিল নয়, এখন এটি উভয়ের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তাদের আনুগত্যের এক কঠিন পরীক্ষা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি কেবল আইনি নয়, বরং পুরোপুরি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কূটনীতির ওপর নির্ভরশীল।