Ridge Bangla

ফেসবুক-টেলিগ্রামে ভিডিও বাণিজ্য: সর্বনাশা প্রেমের ফাঁদে তরুণীরা

বর্তমান আধুনিক বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ যেমন সহজ হয়েছে, ঠিক তেমনি সাইবার অপরাধের ধরনেও এসেছে বিবিধ পরিবর্তন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও টেলিগ্রাম এখন পরিণত হয়েছে পর্নোগ্রাফি বাণিজ্যের নতুন ঘাঁটিতে।

দেশে এসব মাধ্যমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্নোগ্রাফি ও ব্ল্যাকমেইলিং চক্রের তথ্য ফাঁস হচ্ছে সাম্প্রতিককালে নিয়মিত বিরতিতেই। প্রেমের ফাঁদ, আইডি হ্যাক এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারে এই চক্রের হাতে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর জীবন আজ বিপন্ন। এই অন্ধকার জগতের বিস্তৃতি এখন কেবল দেশের ভেতরেই নয়, এর শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, এই নেটওয়ার্কে দেশের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় অবস্থানরত ব্যবহারকারীরাও যুক্ত রয়েছে।

দেখা গেছে, অপরাধের শুরুটা হয় ফেসবুকে। নানা সময়ে ফেসবুকে ঢুকলেই সাজেস্ট পোস্ট হিসেবে সামনে আসছে বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপের অশ্লীল পোস্ট। এসব পোস্টের বিষয়বস্তু বেশিরভাগই ম্যাসেঞ্জার থেকে নেওয়া নানা ধরনের স্ক্রিনশট, যেখানে মজার ছলে যৌনোদ্দীপকভাবে কাউকে উত্তেজিত করা হয় অথবা যৌনতা সম্পর্কিত দুজনের মধ্যকার অন্তরঙ্গ বার্তা থাকে।

এসব দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কৌতূহলী মানুষের মনে আগ্রহ জাগে ঘটনার বিষয়বস্তু জানতে। সাইবার মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই কৌশলকে বলা যায় ‘কিউরিওসিটি ট্র্যাপ’। এরপর পোস্টের কমেন্ট বক্সে দেওয়া প্রাইভেট লিংকে ক্লিক করেই তারা হারিয়ে যাচ্ছে অন্য এক জগতে।

ফেসবুক ও টেলিগ্রাম ঘেঁটে এই ধরনের বেশ কিছু গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব গ্রুপের সদস্য সংখ্যা হাজার থেকে লাখের ওপর পর্যন্ত দেখা গেছে। চটকদার নামে খোলা এসব পেজ ও গ্রুপে প্রথমে বিভিন্ন তরুণীর ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিওর ডেমো ক্লিপ আপলোড করা হয়। সেখানেই দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট টেলিগ্রাম চ্যানেলের লিংক।

টেলিগ্রামকে বেছে নেওয়ার প্রধান কারণ এর শক্তিশালী এনক্রিপশন ব্যবস্থা এবং পরিচয় গোপন রাখার সুবিধা। প্রথমে ডেমো ভিডিও দেখালেও এসব গ্রুপে পূর্ণাঙ্গ ভিডিও দেখতে হলে নিতে হয় ‘প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন’। চ্যানেল বা গ্রুপ বন্ধ হয়ে গেলে একই অ্যাডমিনরা ভিন্ন নামে নতুন ব্যাকআপ চ্যানেল খুলে পুনরায় কার্যক্রম চালু করে, যা নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে তুলছে।

এই সাবস্ক্রিপশন সাধারণত মাসিক ৩০০ থেকে ১,৫০০ টাকা এবং বাৎসরিক ৩,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। লেনদেন হয় বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। নিজের পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে যা খোলা হয় বিভিন্ন ভুয়া তথ্যসম্বলিত কাগজপত্র ব্যবহার করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের জন্য ডলার বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতেও অর্থ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়। যা প্রমাণ করে এই নেটওয়ার্কের গ্রাহক শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশের বাইরেও ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গ্রাহক। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অর্থের একটি বড় অংশ আবার নতুন ভুক্তভোগী সংগ্রহ ও চ্যানেল সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করা হয়। ফলে এটি একধরনের স্বয়ংসম্পূর্ণ অপরাধ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।

এই চক্রের শিকার সিংহভাগই স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অপরাধীরা প্রথমে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং কৌশলে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ও ছবি হাতিয়ে নেয়। পরবর্তীতে সেই ভিডিওগুলোই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। টাকা দিতে না পারলে কিংবা অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হলে সংগ্রহ করা ভিডিওগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয় টেলিগ্রামের পেইড গ্রুপগুলোতে। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে সাধারণ ছবিকে সম্পাদনার মাধ্যমে পর্নোগ্রাফিতে রূপ দেওয়ার মতো ভয়ংকর তথ্যও উঠে এসেছে, যা ডিপফেক প্রযুক্তির ঝুঁকির কথাই সামনে এনে দিচ্ছে।

অনলাইনে যৌন শোষণ বা কুচক্রী মহলের অন্ধকার জগতের এই চিত্র কেবল বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে আলোচিত এপস্টেইন ফাইলসের ঘটনা আমাদের চোখে আবারও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কীভাবে নারীদের জীবনকে বিপন্ন করে তোলা হচ্ছে। জেফরি এপস্টেইন যেভাবে একটি বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন, বাংলাদেশেও টেলিগ্রামের এই গ্রুপগুলোর অ্যাডমিনরা একই পরিসরে ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইল নেটওয়ার্ক বিস্তার করছে।

বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত এই খবর আলোচনায় আসার পর গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ১০৮টি সক্রিয় পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত চ্যানেল শনাক্ত করে। এসব চ্যানেলে অবৈধভাবে অশ্লীল, যৌন উদ্দীপক পর্নোগ্রাফি কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছিল। বিটিআরসি তখন চ্যানেলগুলোর আইডি ও লিংক যুক্ত করে টেলিগ্রাম কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে চ্যানেলগুলো অপসারণের অনুরোধ জানানো হলেও বাস্তবে এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সীমিত।

পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২-এর ৮(২), ৮(৩) ও ৮(৫) ধারা অনুযায়ী, অশ্লীল ছবি বা ভিডিও প্রচার ও বিক্রয় দণ্ডনীয় অপরাধ এবং ইলেকট্রনিক মাধ্যমে এসব প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ধারা ৮(১) অনুযায়ী, সামাজিক মূল্যবোধ বা নৈতিকতা বিনষ্টকারী কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অনলাইন কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ক্ষমতা বিটিআরসির হাতে ন্যস্ত রয়েছে।

গত বছরের অক্টোবরে মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রুপ, অ্যাডমিন ও অর্থ লেনদেনকারী প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত। এ কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে টেলিগ্রামে হাজারো তরুণীর নগ্ন ভিডিও বিক্রি ও বাণিজ্য সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তা আমলে নিয়ে এই আদেশ দেন আদালত। আদেশে ডিবি পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারকে একজন চৌকস ও দক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়। আইনজীবীরা বলছেন, এই আদেশ ভবিষ্যতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।

সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির এই যুগে ডিজিটাল হাইজিন মেনে চলা জরুরি। অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিত কাউকে হুট করেই নিজের ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও না পাঠানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু রাখা এবং যেকোনো ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে ভয় না পেয়ে সরাসরি পুলিশ বা সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ জানানোই এই ভয়ানক অপরাধ প্রতিকারের কার্যকর পথ। প্রেমের আবেগে বা প্রযুক্তির প্রলোভনে পড়ে যেন আর কোনো তরুণ-তরুণীর জীবন ধ্বংস না হয়, সেজন্য কঠোর আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা এখন সময়ের দাবি।

This post was viewed: 20

আরো পড়ুন