Ridge Bangla

তনু হত্যাকাণ্ড: বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার এক অন্ধকার গলি

২০১৬ সালের ২০ মার্চ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অন্যরকম রাত। কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতর উদ্ধার করা হয় ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর নিথর দেহ।

গত মাসে সেই ঘটনার এক দশক পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু দশ বছর পরও তনুর মা-বাবার আর্তনাদ থামেনি, মেলেনি কোনো আসামির পরিচয়, নিশ্চিত হয়নি বিচার। তনু হত্যাকাণ্ড এখন কেবল একটি অপরাধের চিত্র নয়, বরং এটি বাংলাদেশের দীর্ঘসূত্রিতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১৬ সালের সেই রাতে তনু সেনানিবাসের ভেতর একটি বাড়িতে টিউশনি শেষে ফিরছিলেন। কিন্তু রাত বেশি হয়ে যাওয়ার পরও বাড়িতে না ফেরায় তাঁর বাবা ইয়ার হোসেন, যিনি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের একজন কর্মচারী ছিলেন, মেয়ের খোঁজে বের হন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পাওয়ার হাউসের অদূরে একটি ঝোপের মধ্যে তনুর ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। সেনানিবাসের মতো সংরক্ষিত এলাকায় এমন ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় তোলে। এই ঘটনায় সরাসরি সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ ওঠে বিভিন্ন মহলে।

প্রাথমিক সুরতহাল ও পারিপার্শ্বিক তথ্য অনুযায়ী, তনুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল। তবে ঘটনার শুরু থেকেই তদন্ত প্রক্রিয়া হোঁচট খেতে থাকে। দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে না পাওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হলে জনমনে গভীর সন্দেহ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

তদন্তের স্বার্থে পরবর্তীকালে তনুর কাপড় থেকে সংগৃহীত আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি জানায়, তনুর পোশাকে তিনজনের শুক্রাণু পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, এটি ছিল একটি দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড। কিন্তু সেই তিন ব্যক্তি কারা? তদন্ত সংস্থাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যর্থ হয়েছে।

ঘটনার এই দশ বছরে তদন্ত কর্মকর্তার পরিবর্তন হয়েছে মোট ছয়বার। থানা-পুলিশ থেকে ডিবি, এরপর সিআইডি এবং সর্বশেষ ২০২০ সাল থেকে মামলার দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থা পরিবর্তনের এই খেলায় কেবল সময় পার হয়েছে, কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

পিবিআই দীর্ঘ সময় তদন্ত করার পর সম্প্রতি তিন সন্দেহভাজন ব্যক্তির ডিএনএ নমুনা মেলানোর আবেদন জানিয়েছে, যা তনুর পরিবারের মনে নতুন করে ক্ষীণ আশার আলো জ্বালিয়েছে।

চলতি ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল, সোমবার বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মুমিনুল হকের আদালতে হাজির হন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের রাজধানীর কল্যাণপুরের পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম। আদালতের তলবের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কুমিল্লায় এসে মামলার অগ্রগতি তুলে ধরেন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তিনজনের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার আবেদন করেন। আদালত তাঁর আবেদনে সম্মতি দেয়।

দীর্ঘ এক দশক পর এই প্রথমবারের মতো তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে তিনজন সন্দেহভাজন সাবেক সেনাসদস্যের নাম প্রকাশ্যে আসে। তারা হলেন, ঘটনার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান এবং সৈনিক শাহীন আলম। তবে তনুর বাবা ইয়ার হোসেনের দাবি, সৈনিকের নাম শাহীন আলম নয়, বরং সৈনিক হিসেবে জাহিদ নামটি শুরু থেকেই তাদের সন্দেহের তালিকায় ছিল।

তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতকে জানান, ২০১৭ সালের মে মাসে তনুর পোশাকে পাওয়া তিনজন পুরুষের শুক্রাণু থেকে ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হলেও সন্দেহভাজনদের কাছ থেকে নমুনা নিয়ে তা মিলিয়ে দেখা হয়নি। অর্থাৎ, এক দশক ধরে তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি সম্পন্নই করা হয়নি। এখন সেই ডিএনএ ম্যাচিংয়ের মাধ্যমেই মামলাটির নতুন অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

উল্লেখ্য, তনু হত্যার পর ২০১৭ সালের ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল এই সন্দেহভাজনদের ঢাকার সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। কিন্তু তখন তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এতদিন ধরে যেসব নাম কেবল পরিবারের অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন আনুষ্ঠানিক তদন্তের অংশ হিসেবে সামনে এসেছে।

তদন্তের এই দীর্ঘ সময়ে মোট ছয়জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান প্রায় চার বছর তদন্ত করেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আনতে পারেননি। এর আগে সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহম্মদও দীর্ঘ সময় এই মামলার দায়িত্বে ছিলেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে তাঁর মাধ্যমেই মামলাটি আবার সক্রিয় পর্যায়ে ফিরে আসে।

তনু হত্যাকাণ্ড নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ছিল, একটি সংরক্ষিত এবং সুরক্ষিত এলাকায় এমন জঘন্য অপরাধ করে অপরাধীরা কীভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে? তদন্ত কর্মকর্তাদের বারবার পরিবর্তনের পেছনে অদৃশ্য কোনো চাপ ছিল কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আজও প্রশ্ন রয়েছে।

তনুর মা আনোয়ারা বেগম দীর্ঘ দশ বছর ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, ক্ষমতা এবং অর্থের অভাবে তাঁরা প্রকৃত বিচার পাচ্ছেন না।

তাঁর কণ্ঠে আজও সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার বেদনা। তিনি বলেন, তাঁর মেয়েকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি মৃত্যুর আগে অন্তত খুনিদের বিচার দেখে যেতে চান। তাঁর অভিযোগ, সার্জেন্ট জাহিদ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, কিন্তু এতদিন কেউ তাঁর কথা শোনেনি। এখন আদালতে নাম আসায় তিনি নতুন করে বিচার পাওয়ার আশা দেখছেন।

এই দীর্ঘ বিলম্ব ও নতুন তথ্যের আবির্ভাব একটি মৌলিক প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। তা হলো, যে তদন্ত ২০১৭ সালেই কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া যেত, সেটি কেন ২০২৬ সালে এসে পৌঁছাল? এটি কি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি এর পেছনে ছিল অদৃশ্য প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক অনীহা?

This post was viewed: 32

আরো পড়ুন