Ridge Bangla

ঢাকার রিকশাচিত্র: ঐতিহ্যের রঙে গড়া শিল্পধারা

ঢাকা শহরের পরিচিতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে রিকশা এবং এর পেছনে আঁকা বর্ণিল চিত্রশিল্প- রিকশাচিত্র। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কো একে ‘চলমান জীবন্ত চিত্র প্রদর্শনী’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই শিল্পধারা ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় দেশ-বিদেশে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ঢাকার রিকশাচিত্র।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, ঢাকায় রিকশার প্রচলন ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে। এর কয়েক বছরের মধ্যেই রিকশার পেছনে চিত্র আঁকার প্রবণতা শুরু হয়। গবেষকদের মতে, ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি, বিশেষ করে দেশভাগের প্রাক্কালে এই শিল্পের সূচনা। গবেষক শাওন আকন্দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৪৭ সালের দিকেই রিকশাচিত্রের বিস্তার ঘটে, এবং ধীরে ধীরে এটি শহরের এক স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক উপাদানে পরিণত হয়।

প্রাথমিকভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীদের হাতেই এই শিল্পের বিকাশ ঘটে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই তারা নিজস্ব কল্পনা ও দক্ষতায় রিকশার পেছনে রঙিন চিত্র আঁকতেন। এই স্বতঃস্ফূর্ত শিল্পচর্চাই রিকশাচিত্রকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি। অনেক গবেষকের মতে, সুনীল দাস এই অঞ্চলের প্রথমদিকের রিকশা-চিত্রশিল্পীদের একজন।

রিকশাচিত্রের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রিকশাকে আকর্ষণীয় করে তোলা। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর বিষয়বস্তুতেও এসেছে বৈচিত্র্য। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকাদের প্রতিকৃতি ছিল এই শিল্পের প্রধান অনুষঙ্গ। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি, পশু-পাখি, ফুল-ফল, এমনকি ধর্মীয় কাহিনী ও সামাজিক বার্তাও স্থান পায় এই চিত্রে।

রিকশার পেছনের প্যানেলই ছিল এই শিল্পের মূল ক্যানভাস। উজ্জ্বল রঙ, নাটকীয় ভঙ্গি এবং সরল আঙ্গিক- সব মিলিয়ে এটি একধরনের লোকশিল্প বা ফোক আর্ট হিসেবে স্বীকৃতি পায়। অনেক ক্ষেত্রে একে পপ আর্ট বা ক্র্যাফট হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। ঢাকার রিকশাচিত্র শুধু নান্দনিকতা নয়, বরং সমাজ-সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগ-অনুভূতিরও প্রতিফলন।

তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্পে এসেছে চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে হাতে আঁকা চিত্রের পরিবর্তে কম্পিউটার ডিজাইন ও প্রিন্ট করা ধাতব প্লেট ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী হাতে আঁকা রিকশাচিত্রের আবেদন কিছুটা কমে যাচ্ছে। এতে অনেক শিল্পী তাদের পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন এবং এই শিল্পধারা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

তারপরও কিছু উদ্যোগ এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রিকশাচিত্র নিয়ে কর্মশালা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদেও এ বিষয়ে নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, যা নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করছে।

২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রিকশার ব্যবহার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছিল। বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি অনন্য দিক হিসেবে রিকশাচিত্র তখন ব্যাপক প্রশংসা পায়।

ঢাকার রিকশাচিত্র শুধু একটি শিল্প নয়, এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। এখন প্রয়োজন যথাযথ সংরক্ষণ, পৃষ্ঠপোষকতা এবং আধুনিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা। তাহলেই হয়তো আবারও ফিরে আসবে রিকশাচিত্রের সেই সোনালি দিন।

This post was viewed: 2

আরো পড়ুন