যেকোনো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে শাসনকার্যের প্রধান হিসেবে আমরা সাধারণত প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদেরকেই চিন্তা করি। কিন্তু তারা কি সত্যিই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী? নাকি পর্দার আড়ালে বসে থাকা কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠী তাদের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই সামনে আসে ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State) এর ধারণা। বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত এবং রহস্যময় শব্দবন্ধগুলোর একটি হলো এই ‘ডিপ স্টেট’। কিন্তু ‘ডিপ স্টেট’ বলতে আসলে কী বোঝানো হয়?
কী এই ’ডিপ স্টেট’?
সহজ কথায়, ‘ডিপ স্টেট’ বলতে একটি দেশের অভ্যন্তরে এক গোপন বা ছায়া সরকারকে বোঝানো হয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হয়েও পর্দার আড়াল থেকে এরা দেশ পরিচালনা, মূলনীতি নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণ করে। এটি কোনো একক ব্যক্তি বা দল নয়, বরং একটি অঘোষিত নেটওয়ার্ক। সাধারণত গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, প্রভাবশালী আমলা, থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সমন্বয়ে এই জাল তৈরি হয়। সরকার পরিবর্তন হলেও এই কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয় না। অর্থাৎ, ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও রাষ্ট্রের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ থেকে যায় এই অদৃশ্য শক্তির হাতেই। ফলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা দৃশ্যমান সরকারের তোয়াক্কা না করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সর্বদা কাজ করে যায় এই দল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও উৎপত্তিস্থল
’ডিপ স্টেট’ ধারণার জন্ম আধুনিক তুরস্কে। তুর্কি ভাষায় একে বলা হয় ‘ডেরিন ডেভলেট’ (Derin Devlet)। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তৎকালীন তুরস্কের সামরিক বাহিনী ও বিচার বিভাগের একটি অংশ ‘ডেরিন ডেভলেট’ নামে পরিচিত ছিল। এই গোপন চক্র মনে করত তারা রাষ্ট্রের ‘সেকুলার’ বা ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ আদর্শের পাহারাদার। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শকে রক্ষা করা। তাই কোনো নির্বাচিত সরকার সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হলে এই চক্রটি অভ্যুত্থান বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করত।
পরবর্তীতে এই ধারণাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে আলোচিত হতে শুরু করে। পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীকে প্রায়ই সে দেশের ‘ডিপ স্টেট’ হিসেবে অভিহিত করা হয় যারা সরাসরি ক্ষমতায় না থেকেও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে।
ডিপ স্টেটের উপাদানসমূহ
সিআইএ (CIA), কেজিবি (KGB), আইএসআই (ISI) বা মোসাদের মতো গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়ই ডিপ স্টেটের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। তাদের কাছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গোপন তথ্য থাকে। ফলে এই সংস্থাগুলো অনেক সময় রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে সরকারের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। উচ্চপদস্থ সেনাকর্মকর্তারা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে অনেক সময় বেসামরিক সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। একইভাবে, সরকারি আমলারা বছরের পর বছর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থেকে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রাখেন। আবার, বড় বড় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, তেল কোম্পানি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে যুদ্ধের উস্কানি দেয় বা বৈদেশিক নীতি পরিবর্তন করতে সরকারকে বাধ্য করে। এছাড়াও, বিচার বিভাগ ও থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক তাদের আইনি ব্যাখ্যা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে জনমত গঠন করে ডিপ স্টেট হিসেবে কাজ করতে পারে।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বনাম বাস্তবতা
অনেকে মনে করেন ‘ডিপ স্টেট’ কেবল একটি ‘কন্সপিরেসি থিওরি’ বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।
বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বারবার ‘ডিপ স্টেট’ নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন, তখন উদারপন্থীরা একে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের অভিযোগ এফবিআই এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি বিশেষ অংশ তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য ষড়যন্ত্র করছে। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, আমেরিকায় কোনো একক গোপন সংগঠন নেই। বরং সেখানকার আমলাতন্ত্র ও গোয়েন্দা কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদী পেশাদারিত্বকে অনেক সময় রাজনৈতিক স্বার্থে ‘ডিপ স্টেট’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। যখন আমলাতন্ত্র বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশ অমান্য করে, তখনই তা ‘ডিপ স্টেট’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অনেকের মতে, এটি মূলত রাষ্ট্রের চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স ব্যবস্থার একটি অংশ। এর মাধ্যমে যে কোনো খামখেয়ালি শাসককে আটকে দেয়া সম্ভব।
গণতন্ত্রের জন্য এটি কতটা বিপজ্জনক?
একটি কার্যকর গণতন্ত্রে ক্ষমতা থাকে জনগণের হাতে। কিন্তু ডিপ স্টেট সক্রিয় হলে জনগণের রায় মূল্যহীন হয়ে পড়ে। এই অদৃশ্য বাধার কারণে নির্বাচিত সরকার চাইলেও জনগণের জন্য কল্যাণকর অনেক পরিবর্তন আনতে পারে না। সরকার বড় কোনো পরিবর্তন আনতে চাইলে ডিপ স্টেট তাদের নিজস্ব সুবিধার জন্য সেই সংস্কারে বাধা দেয়। যেহেতু এদের কেউ চেনে না বা ভোট দেয় না, তাই এদের কর্মকাণ্ডের কোনো জবাবদিহিতাও থাকে না। ফলে জবাবদিহিতার উর্ধ্বে থেকে অনেক সময় ব্যক্তিগত লাভের জন্য রাষ্ট্রকে যুদ্ধ বা সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয় এই দল।
তবে, কেউ কেউ আবার এই কাঠামোর ইতিবাচকতাও খুঁজে পান। তারা মনে করেন একটি শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক কাঠামো রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে। চরমপন্থি বা অদূরদর্শী শাসক কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে গেলে এই স্থায়ী কাঠামোই রাষ্ট্রকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে।
ডিপ স্টেট’ আসলে আধুনিক রাষ্ট্রের একটি অনিবার্য অঙ্গ। পৃথিবীর অনেক দেশেই এর অস্তিত্ব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। কোথাও আবার এটি সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রেখে সরকারকে রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ রাখতে এটি অনেক সময় ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে বিপত্তি তখনই ঘটে, যখন এই স্থায়ী কাঠামোটি জনগণের ইচ্ছার চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে বড় করে দেখে। সেজন্য আধুনিক যুগে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে এই অদৃশ্য ছায়া রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষ কেবল ‘ভোটের কাগুজে রাজা’ হয়েই থেকে যাবে। আর প্রকৃত ক্ষমতা থাকবে এই ‘ডিপস্টেট’ এর হাতে।