Ridge Bangla

চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য ও বিচারিক পরিক্রমা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের নব্বইয়ের দশকের এক জনপ্রিয় মুখ সোহেল চৌধুরী। তার হত্যাকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম আলোচিত অপরাধগুলোর একটি। ঘটনার ২৫ বছরের বেশি সময় পর ২০২৪ সালের ৯ মে এ মামলার রায়ে বিচারিক নিষ্পত্তি আসে, যা নতুন করে আলোচনায় আনে সেই রাতের ঘটনাপ্রবাহ, বিরোধের পটভূমি এবং দীর্ঘ আইনি লড়াই।

ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক অরুণাভ চক্রবর্তী এ মামলায় ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য দুজন হলেন ট্রাম্পস ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আফাকুল ইসলাম (বান্টি ইসলাম) ও আদনান সিদ্দিকী। দণ্ডিতদের ২ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ট্রাম্পস ক্লাবের আরেক মালিক আশিষ চৌধুরী ওরফে বোতল চৌধুরী ও শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনসহ ছয়জনকে খালাস দেওয়া হয় সে সময়।

তদন্ত ও সাক্ষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল ব্যক্তিগত ও সামাজিক দ্বন্দ্বের জটিল পটভূমি। মামলার নথি ও সাক্ষীদের বক্তব্য অনুযায়ী, চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ভালোবেসে বিয়ে করেন সে সময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা পারভিন সুলতানা দিতিকে। বিয়ের কিছুদিন পর তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন সোহেল চৌধুরী। একপর্যায়ে অন্ধকার জগতে যাতায়াত শুরু করেন তিনি।

সেই অন্ধকার জগতের অপরাধীদের সঙ্গে ১৯৯৮ সালের জুলাই মাসে রাজধানীর বনানীর ট্রাম্পস ক্লাবে একটি ঘটনার পর থেকে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। সেদিন ক্লাবে গান-বাজনা বন্ধ করা নিয়ে সোহেল চৌধুরী ও আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের মধ্যে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে চড়াও হয়ে সোহেলের বন্ধু কালা নাসির আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে গুলি করতে উদ্যত হলে তিনি বাথরুমে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, সেই ঘটনার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে।

মামলার এক সাক্ষী জানান, খুনের আগে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া ছাড়াও ট্রাম্পস ক্লাবের বান্টি ইসলামের সঙ্গে সোহেলের দুই থেকে তিনবার ঝগড়া হয়। আশিষ রায় চৌধুরী ওরফে বোতলের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। আশিষই সোহেলকে ক্লাব থেকে বের করে দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ক্লাবে না আসার ব্যাপারে হুমকি দেন।

এদিকে ক্লাবটির বিরুদ্ধে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল স্থানীয়দের। পাশের মসজিদের মুসল্লিদের দাবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে সোহেল চৌধুরী ক্লাবের কার্যক্রম বন্ধে উদ্যোগ নেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। এতে ক্লাব-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তার বিরোধ আরও তীব্র হয়। সোহেলের পরিবারের দাবি, হত্যার আগে তাকে একাধিকবার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তার মা নুরজাহান আদালতে বলেন, মৃত্যুর সপ্তাহ দুয়েক আগে ফোনে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

১৯৯৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর গভীর রাতে বনানীর ট্রাম্পস ক্লাবের সামনে ঘটে হত্যাকাণ্ডটি। সেদিন রাত দুইটার দিকে ক্লাবে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় সোহেলকে। পরে রাতের শেষভাগে তিনি আবার সেখানে গেলে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হয়ে তিনি মারা যান। একই ঘটনায় আরও কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন।

সাক্ষ্য ও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, পরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের দিয়ে এ হামলা চালানো হয়। হামলার পরপরই অভিযুক্তরা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। ঘটনার পরদিনই গুলশান থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৯৯ সালে তদন্ত শেষে নয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয় গোয়েন্দা পুলিশ। ২০০১ সালে বিচার কার্যক্রম শুরু হলেও নানা আইনি জটিলতায় তা দীর্ঘসূত্রিতায় পড়ে।

২০০৩ সালে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হলে বিচার স্থগিত হয়ে যায়। প্রায় এক দশকের বেশি সময় পর ২০১৫ সালে হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ তুলে নিলে মামলার কার্যক্রম আবার শুরু হয়। পরে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ২০২৪ সালে রায় ঘোষণা করা হয়।

This post was viewed: 5

আরো পড়ুন