অবশেষে ইরানের খারগ দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বীপটির সব সামরিক স্থাপনা হামলা করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ ইরানের চলমান যুদ্ধের মধ্যে কিছুদিন ধরেই গোয়েন্দা তথ্য ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে খবর পাওয়া যাচ্ছিল যে, ইরানের অন্তর্গত খারগ দ্বীপে হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
সর্বশেষ গত শুক্রবার (১৩ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন, যেখানে খারগ দ্বীপে হামলার দৃশ্য দেখা যায়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন তাদের ভৌগোলিক বিশ্লেষণেও হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এছাড়া ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, খারগ দ্বীপে মার্কিন বাহিনী সেখানকার সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌঘাঁটি, বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার এবং হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গারকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
তবে এ হামলায় খারগ দ্বীপের সামরিক স্থাপনাগুলোই শুধুমাত্র লক্ষ্যবস্তু ছিল বলে জানা গেছে। সেজন্য দ্বীপটির তেল স্থাপনাগুলো অক্ষত রয়েছে, সেগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি। এর আগে খারগ দ্বীপে হামলার খবর চাউর হলে ইরান সতর্ক করে বলেছিল, তাদের জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর কোনো প্রকার হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের মিসাইলের রেঞ্জের মধ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত যেকোনো সামরিক ও আর্থিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খারগ দ্বীপে করা এ হামলাকে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা হামলাগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছেন। খারগ দ্বীপ নিয়ে আমেরিকা, ইসরায়েল ও ইরানের এই চলমান হুমকি-পাল্টা হুমকি এবং উত্তেজনাকর আচরণ আলোচনার কেন্দ্রে তুলে এনেছে দ্বীপটিকে। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ছোট্ট এই দ্বীপটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, চলুন সে বিষয়ে খুঁটিনাটি জেনে নেওয়া যাক।
খারগ দ্বীপ নিয়ে আলোচনার পূর্বে আমাদের জানা দরকার, দক্ষিণে বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে ইরানের মালিকানাধীন শতাধিক দ্বীপ রয়েছে। ইরানের মালিকানাধীন এসব দ্বীপের অনেকগুলোতেই বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক বন্দর রয়েছে। পারস্য উপসাগরে ইরানের তেল পরিবহন, সামরিক কৌশল ও হরমুজ প্রণালীতে নিজস্ব প্রভাব ধরে রাখতে এই দ্বীপগুলোর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
ইরানের মালিকানাধীন দ্বীপগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দ্বীপ হলো কেশম দ্বীপ (ইরানের সবচেয়ে বড় দ্বীপ), কিশ দ্বীপ (পর্যটন ও বাণিজ্যকেন্দ্র), আবু মুসা (কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ), হরমুজ দ্বীপ (হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত) এবং খারগ দ্বীপ (প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র)। খারগ দ্বীপ মূলত ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র, যা আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে দ্বীপটিকে পাশার দানে পরিণত করেছে। আমেরিকা ও ইসরায়েল চাইছে দ্বীপটিতে আক্রমণ করে ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করার মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা অচল করে দিতে।
ইরানের বুশেহর প্রদেশের বুশেহর বন্দর হতে ৫৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ২২ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে খারগ দ্বীপের অবস্থান। দ্বীপটিকে ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয়। এখান থেকে বছরে প্রায় ৯৫ কোটি ব্যারেল তেল বহির্বিশ্বে রপ্তানি করা হয়, যা ইরানের মোট রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ। এই দ্বীপটি ইরানিদের কাছে নিষিদ্ধ দ্বীপ নামেও পরিচিত। এর পেছনে কারণ হিসেবে রয়েছে, দেশের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র হওয়ায় এই দ্বীপে প্রবেশের ক্ষেত্রে আইআরজিসি কর্তৃক কঠোর নজরদারির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
আয়তনে ছোট হলেও এটি ইরানের জ্বালানি সেক্টরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। দ্বীপটির চারপাশে রয়েছে গভীর খাত, যা জ্বালানি তেলবাহী বিশাল ট্যাংকারগুলোর নোঙর করার জন্য এক প্রাকৃতিক আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এছাড়াও এখানে রয়েছে বড় বড় তেল সংরক্ষণ ট্যাংক, একাধিক তেল লোডিং টার্মিনাল, বিশাল তেলবাহী ট্যাংকারের জেটি ও পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তেলক্ষেত্র হতে আসা তেলের মজুত। এখান থেকেই ইরানের তেল এশিয়ায় রপ্তানি করা হয়, যার বেশিরভাগের গন্তব্য চীন। ইরানের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিনটি প্রধান তেলক্ষেত্র আবোজার, ফোরুজান ও দোরুদ তেলক্ষেত্র থেকে তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে এখানে এসে প্রক্রিয়াজাত হয়ে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ে।
খারগ দ্বীপটি এবারই প্রথম নয়, আগেও যুদ্ধকালীন সময়ে গোলাবারুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ১৯৮০-১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলাকালে দ্বীপটি বহুবার ইরাকি বাহিনীর বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তবে দ্বীপটি তেলনির্ভর অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও দ্রুতই ইরান এখানকার অবকাঠামো পুনর্গঠন করে রপ্তানি বাণিজ্য স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু বর্তমানে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উত্তেজনা যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে করে দ্বীপটি আবারও হামলার শিকার হতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
এই দ্বীপ বর্তমানে ইরানি অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিতি পেলেও এর আলাদা ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে, যা পৃথিবীর জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতির যুগে প্রবেশের আগে থেকেই উক্ত অঞ্চলে কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখে আসছে। কিছু কিছু রেওয়াতে দ্বীপটির সঙ্গে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের যোগসূত্রের কথা শোনা গেলেও এই দ্বীপটিকে প্রথমবার পর্তুগিজরা জয় করে দখলে নেয়। এরপর আঠারো শতকের মধ্যভাগে এখানে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্য শুরু করে। তবে ১৭৬৬ সালে তারা স্থানীয়দের কর্তৃক বিতাড়িত হয়।
এরপর গত শতাব্দীতে ইরানি শাহদের শাসনামলে রেজা শাহ দ্বীপটিকে রাজনৈতিক বন্দীদের নির্বাসনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেন। ১৯৫৮ সালে দ্বীপটির আধুনিকায়ন শুরুর পর ১৯৬০ সালে এখান থেকে জ্বালানি তেলের প্রথম বড় চালান রপ্তানি করা হয়। এছাড়াও দ্বীপটিতে ৩-৪ হাজার বছর পূর্বের এলামাইট, খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০-৩৩০ অব্দের একিমেনিড যুগের মানব বসতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্যের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে আছে এই দ্বীপটি। এখানে আবিষ্কৃত প্রাচীন কবরস্থানে জরথুস্ত্রবাদ, খ্রিষ্টান এবং সাসানিদ আমলের সমাধি পাওয়া গেছে। এছাড়াও এখানে একিমেনিড যুগের আবিষ্কৃত শিলালিপিতে পারস্য উপসাগর নাম স্পষ্টভাবে খোদাই করা অবস্থায় পাওয়া গেছে।
পারস্য উপসাগরে অবস্থিত এই খারগ দ্বীপ শুধু ইরানের জন্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই দ্বীপ থেকেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি করা হয়। পারস্য উপসাগরকে কেন্দ্র করে তেল সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় কেন্দ্র এই দ্বীপ। সুতরাং বর্তমানে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে গুরুতর আক্রমণের শিকার হয়ে দ্বীপটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দামে দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানকে ঘিরে পশ্চিমা জোটের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটি ক্রমান্বয়ে এই দ্বীপের তেল ব্যবস্থাপনায় নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, নতুন দুটি ট্যাংক সংস্কারের মাধ্যমে এর ধারণক্ষমতা ২০ লাখ ব্যারেল বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে ইরানের দৈনিক তেল রপ্তানি ১৬ লাখ ব্যারেলের কাছাকাছি হলেও এই টার্মিনালের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা দিনে ৭০ লাখ ব্যারেল।