Ridge Bangla

এলডিসি থেকে উত্তরণ: বাংলাদেশের সামনে যত চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি

২০২৬ সালের নভেম্বর বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক মাইলফলক নিয়ে আসছে। জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের (Least Developed Country – LDC) তালিকা থেকে উত্তরণ হবে বাংলাদেশের। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এই তিনটি মানদণ্ডেই বাংলাদেশ সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।

এটি বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ যে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সামাজিক উন্নয়নের বিকাশ ঘটিয়েছে, তারই প্রমাণ বহন করে। এই অর্জন যেমন আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে, একইসাথে আন্তর্জাতিক ঋণ বাজারে ঋণের ক্রেডিট রেটিং উন্নত হওয়ার সম্ভাবনাও সৃষ্টি করবে। তবে এই সম্মানজনক উত্তরণই উন্নয়নের দিক থেকে চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং এটি একটি নতুন, অনেক বেশি কঠিন এবং প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক যাত্রার সূচনা।

এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার পর বাংলাদেশ তার দীর্ঘদিনের ভোগ করা বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সুবিধা হারাবে। এই সুবিধা হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই দেশের অর্থনীতি একাধিক গুরুতর চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকির সম্মুখীন হতে চলেছে, যার মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। ​

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত (Duty-Free) ও কোটামুক্ত (Quota-Free) প্রবেশাধিকার সুবিধা হারানো। বর্তমানে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলোর বিশেষ GSP (Generalized System of Preferences) সুবিধার আওতায় বাংলাদেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ রপ্তানিপণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করে। এই সুবিধা বাংলাদেশকে প্রতিদ্বন্দ্বী অনেকগুলো দেশের তুলনায় এগিয়ে রাখে।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। উত্তরণের পর এই খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য প্রধান বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর গড়ে প্রায় ৮%-১২% পর্যন্ত শুল্ক আরোপিত হতে পারে। এই শুল্কের কারণে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দাম প্রতিযোগী দেশগুলোর- যেমন ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, পাকিস্তান- তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, যা তার মূল সুবিধা, অর্থাৎ ‘মূল্য প্রতিযোগিতা’র সক্ষমতা নষ্ট করবে। এতে রপ্তানি আয় ৫.৫% থেকে ৭.৫% পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যার আর্থিক মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার। এটি আমাদের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

যদিও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) উত্তরণকারী দেশগুলোর জন্য তিন বছরের ট্রানজিশন পিরিয়ড বা রূপান্তরকাল দিয়েছে (অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত সুবিধা বহাল থাকবে), তবে এই বাড়তি সময় বাংলাদেশের প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট না-ও হতে পারে।

এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে অবশ্যই নতুন বাণিজ্য চুক্তির জন্য প্রস্তুত হতে হবে। ​এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশের প্রধান কৌশল হওয়া উচিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের GSP+ সুবিধা নিশ্চিত করা। GSP+ পেতে হলে বাংলাদেশকে সুশাসন, মানবাধিকার, শ্রমিকের অধিকার এবং পরিবেশ সংক্রান্ত ২৭টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন সম্পূর্ণরূপে মেনে চলতে হবে।

এই শর্তগুলো পূরণ করা এবং আন্তর্জাতিক মহলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা একটি বিরাট কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। একইসঙ্গে, ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও জাপানের মতো বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) অথবা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (PTA) স্বাক্ষর করা জরুরি।

ওষুধ (Pharmaceuticals) শিল্পে মেধাস্বত্ব  সুবিধা হারানো এলডিসি উত্তরণের অন্যতম গুরুতর প্রভাব হিসেবে পরিগণিত হবে। এলডিসিভুক্ত হিসেবে বাংলাদেশ WTO-র TRIPS (Trade-Related Aspects of Intellectual Property Rights) চুক্তির বিশেষ ছাড় সুবিধা ভোগ করে। এর ফলে, বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর পেটেন্ট (Patents) আইন না মেনেও বিভিন্ন নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ফর্মুলা ব্যবহার করার অনুমতি রয়েছে। এর ফলে দেশের দরিদ্র নাগরিকেরা স্বল্পমূল্যে ওষুধ পায়।

​এলডিসি থেকে উত্তরণের পর, যদিও ওষুধের ক্ষেত্রে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত এই সুবিধা বহাল থাকবে, তবে এর পরের সময় থেকে বাংলাদেশকে প্রতিটি ওষুধের ফর্মুলা ব্যবহারের জন্য আবিষ্কারক প্রতিষ্ঠানকে মেধাস্বত্বের অর্থ দিতে হবে। এর ফলে ওষুধের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে এবং স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশীয় ওষুধশিল্পকে এখন থেকেই গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিপুল বিনিয়োগ করা প্রয়োজন।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান পরিবর্তিত হবে। এই পরিবর্তন দুটি প্রধান ঝুঁকি তৈরি করবে, যার একটি হচ্ছে সহজ শর্তের ঋণ হারানো। বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা থেকে প্রাপ্ত সহজ শর্তের ঋণ এবং অনুদান বন্ধ হয়ে যাবে বা সীমিত হবে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে এখন থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি সুদে এবং কঠোর শর্তে ঋণ গ্রহণ করতে হবে।

আরেকটি হচ্ছে  ঋণ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি পাওয়া। সহজ শর্তের ঋণের অবসান হওয়ায় ঋণের সার্ভিসিং খরচ বাড়বে। দেশের সামগ্রিক ঋণের বোঝা যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা না যায়, তবে তা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ​এছাড়াও, জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যাবে এবং উন্নত দেশগুলো কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন শিক্ষাবৃত্তি ও প্রযুক্তি সহায়তা কর্মসূচি সীমিত হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর যদি এই খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে, তবে গোটা অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং তৈরি পোশাকের বাইরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল এবং ব্লু ইকোনমির মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। উচ্চশিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। শ্রম বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এলডিসি থেকে বের হয়ে মধ্যম আয়ের দেশের ‘ফাঁদ’ (Middle Income Trap) এড়াতে হলে মানবসম্পদের গুণগত মান বৃদ্ধি অপরিহার্য।

আর্থিক খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের আধিক্য, দুর্নীতি এবং ব্যবসার পরিবেশের দুর্বলতা বিদেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং আর্থিক খাতে সংস্কার আনা আবশ্যক।

বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব। সরকারের প্রতিবেদনেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং এর ফলে বিনিয়োগ শঙ্কা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা না থাকলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি এবং অর্থনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়া সফল করা কঠিন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল দেশগুলোকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

এলডিসি থেকে উত্তরণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু এই অর্জনকে টেকসই করতে হলে চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং ২০২৯ সালের ‘ট্রানজিশন পিরিয়ড’কে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি। রপ্তানি-ক্ষতি ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যা মোকাবিলার জন্য সরকারকে বেশ কিছু কৌশল গ্রহণ করতে হবে। যেমন: GSP+ এবং অন্যান্য বাজারে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

এর পাশাপাশি প্রয়োজন হবে অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমানো। উচ্চ-মূল্য সংযোজিত পণ্য এবং নতুন খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা অন্যতম দায়িত্ব হবে সরকারের। ওষুধশিল্পের গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে সরকারি প্রণোদনা দিতে হবে এবং এর পাশাপাশি এবং মেধাস্বত্ব আইনগুলোর আধুনিকীকরণ করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনকে সফল করতে হলে সরকারকে দ্রুত, কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে বাংলাদেশ কেবল উন্নয়নশীল দেশে পরিণত না হয়ে একটি টেকসই এবং সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।

এই পোস্টটি পাঠ হয়েছে: ১০

আরো পড়ুন