১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপান পার্ল হারবারে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক নৌবহরে আচমকা আক্রমণ করে, যা আমেরিকান সামরিক বাহিনীকে হতভম্ব করে দেয়। তারা এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। এর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাটকীয় মোড় নেয় এবং প্যাসিফিক থিয়েটারে যুদ্ধ শুরু হয়। আমেরিকা যোগ দেয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। ঘটনার নেপথ্যের বিবরণ জানলে উপলব্ধি করা যায় পার্ল হারবার আক্রমণ আসলে অবশ্যম্ভাবীই ছিল।
দ্বীপরাষ্ট্র জাপান তার ইতিহাসের অধিকাংশ সময় বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে জাপান শিল্প খাতে উন্নতি করে। জাপান তখন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পশ্চিমা দেশগুলোর অনুকরণে এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা করে, যেন এসব অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ ও পণ্যের বাজার নিজেদের দখলে রাখতে পারে। বিংশ শতাব্দীতে এসে জাপান আগ্রাসী হয়ে ওঠে। ১৮৯৪-৯৫ সালে চীন ও ১৯০৪-০৫ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধজয় জাপানের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সাথে সফল যুদ্ধে অংশগ্রহণও তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দেয়। তবে জাপানের সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যায়, বিশেষ করে চীনের সাথে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে। চীনা বাজার ও এশিয়ার খনিজ সম্পদ নিয়ে দুই দেশেরই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল।
ত্রিশের দশকে যখন মহামন্দা শুরু হয়, তখন জাপান তার অর্থনৈতিক দুর্ভোগ দূর করার জন্য উত্তর চীনের উর্বর ভূমি ও খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ মাঞ্চুরিয়া প্রদেশে আক্রমণ করে। সেখানে তাদের তাবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করে এবং নাম পরিবর্তন করে মাঞ্চুকুয়ো রাখে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র স্টিমসন ডক্ট্রিনের আওতায় এই সরকারের স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে। জাতিপুঞ্জ থেকে নির্ধারিত এক কমিশন যখন জাপানের আক্রমণের নিন্দা জানায়, তখন জাপান এই আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি এল স্টিমসনের নামে ডক্ট্রিনটি তেমন কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি। একদিকে এটা চীনের সার্বভৌমত্বের পক্ষে এবং জাপানের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু অন্যদিকে এটা জাপানের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ কিংবা চীনের পক্ষে নির্ভরযোগ্য সমর্থন প্রদান করতে ব্যর্থ হয়। বরং, আমেরিকান কোম্পানিগুলো জাপানের কাছে স্টিল ও পেট্রোলিয়ামের ব্যবসা চলমান রাখে, যা চীনের সাথে সংঘাতের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।
১৯৩৭ সালের জুলাইয়ে বেইজিংয়ের মার্কো পলো সেতুতে সংঘর্ষ থেকে আরেকটি সাইনো-জাপানিজ যুদ্ধ শুরু হয়। ঐ বছরের ডিসেম্বরে চীনা জাতীয়তাবাদী দল কুওমিনট্যাংয়ের রাজধানী নানচিং শহর দখল করে নেয় জাপান। ছয় সপ্তাহ জাপানি বাহিনী গণহত্যা আর ধর্ষণযজ্ঞ চালায়, যা নানচিং হত্যাকাণ্ড নামে কুখ্যাত হয়ে আছে। এতে এক থেকে দুই লক্ষ চীনা সামরিক ও বেসামরিক নাগরিক এবং কয়েক হাজার নারী জাপানিদের ধর্ষণের শিকার হন।
এই নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে থাকে। তার মাঝে ছিল বিমান, তেল, ধাতব পদার্থ ও অন্যান্য গুরুতর পণ্যের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ। তবে জাপানের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিল। ১৯৪০ সালের শেষের দিকে নাৎসি জার্মান বাহিনী ফ্রান্স, মধ্য ইউরোপ, স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও উত্তর আফ্রিকার অধিকাংশ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। আমেরিকা তখন সংগ্রাম করতে থাকা গ্রেট ব্রিটেনকে সামরিক সহায়তা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র তেল ও অন্যান্য গুরুতর পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আশা করেছিল জাপানের সম্প্রসারণের উচ্চাভিলাষে লাগাম টেনে ধরতে পারবে। কিন্তু এতে জাপান বরং আরো দৃঢ়ভাবে চিন্তা করা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের যুদ্ধ আসন্ন। জাপানের সাধারণ জনগণও এশিয়া প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানো নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিল। ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বরে জাপান নাৎসি জার্মানি ও ফ্যাসিস্ট ইতালির সাথে চুক্তি করে অক্ষশক্তি গঠন করে।
আমেরিকান নিষেধাজ্ঞার জবাবে নাৎসি অধিকৃত ফ্রান্সের অনুমতি নিয়ে জাপান খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ফ্রেঞ্চ ইন্দোচায়নায় প্রবেশ করে। ১৯৪১ সালের জুলাইয়ে জাপান দক্ষিণ ইন্দোচায়নায় প্রবেশ করে। সেখান থেকে তারা চাল, রাবার ও টিন সমৃদ্ধ ব্রিটিশ মালয় এবং তেলসমৃদ্ধ ডাচ ইস্ট ইন্ডিজে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ১৯৪১ সালের ২৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে থাকা জাপানি সম্পদ জব্দ করার নির্দেশ দেন।
এতে জাপান গোপনে তাদের ‘দক্ষিণমুখী অভিযান’ পরিকল্পনা শুরু করে, যেখানে তারা সিঙ্গাপুরে অবস্থান করা ব্রিটিশ নৌবাহিনী এবং ফিলিপাইন ও পার্ল হারবারে অবস্থান করা আমেরিকান নৌবাহিনীর ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের কূটনৈতিক আলোচনাও চলতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র জাপানকে চীন ও ইন্দোচায়না থেকে সেনা প্রত্যাহারের চাপ দেয়, কিন্তু জাপান তা প্রত্যাখ্যান করতে থাকে।
১৯৪০ সালে যুক্তরাষ্ট্র পার্ল হারবারে তাদের এশিয়া প্যাসিফিকের প্রধান নৌঘাঁটি স্থাপন করে। যুক্তরাষ্ট্র কখনোই প্রত্যাশা করেনি জাপান হাওয়াইয়ে এসে আক্রমণ করবে। কিন্তু জাপানি এডমিরাল ইসোরকু ইয়ামামোতো কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা করতে থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক নৌবহর ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য, যেন আমেরিকান নৌবাহিনীর মনোবল আর অবশিষ্ট না থাকে এবং জাপানের জন্য ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ (ইন্দোনেশিয়া) দখলে আর বাধা না থাকে।
শুরুর দিকে জাপানের আক্রমণ অনেকটা সফলই ছিল। পার্ল হারবারে থাকা আটটি আমেরিকান যুদ্ধজাহাজের সবকয়টিই ধ্বংস হয়, ৩০০ এর বেশি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয় এবং ২,৪০০ আমেরিকানের মৃত্যু হয়। ১৯৪২ এর শুরুতে জাপান একে একে মিয়ানমার, ব্রিটিশ মালয়া (মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর) এবং ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ (ইন্দোনেশিয়া) দখল করে নেয়।
তবে জাপান, তাদের মূল লক্ষ্য যেটা ছিল, সেই আমেরিকান নৌবহরকে ধ্বংস করে দিতে পারেনি। তাছাড়া সেদিন কোনো আমেরিকান এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার পার্ল হারবারে ছিল না। এর জন্য জাপানকে চরম মূল্য দিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র তখন প্যাসিফিক থিয়েটারে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৪২ সালের জুনে মিডওয়ের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী জয়লাভ করলে প্যাসিফিক অঞ্চলে যুদ্ধের গতিপথ বদলে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমা আক্রমণ করে এবং জাপান আত্মসমর্পণ করে।