Ridge Bangla

দ্য ট্যালেন্ট রেস: বিশ্বজুড়ে এআই বিশেষজ্ঞদের টেনে নেয়ার লড়াই

আগুন, বিদ্যুৎ কিংবা কম্পিউটারের মতো যুগান্তকারী আবিষ্কারের মতো এআই বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স হচ্ছে বিজ্ঞানের সর্বশেষ যুগান্তকারী আবিষ্কার। এটি নিয়ে গবেষণা হচ্ছিল বেশ আগে থেকেই। সম্প্রতি চ্যাটজিপিটি দিয়ে এআই’য়ের অগ্রযাত্রার প্রথম সফল সূচনা হয়। এরপর একের পর এক এসেছে জেমিনি, কোপাইলট, পারপ্লেক্সিটি, গ্রক ইত্যাদির মতো শক্তিশালী এআই চ্যাটবট। মাঝখানে চীনের তৈরি ‘ডিপসিক’ এআইয়ের বাজারে রীতিমতো ট্রিলিয়ন ডলারের ধস নামিয়েছিল।

​বর্তমানে নতুন স্বর্ণখনি বলা হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই-কে। তবে এই খনি থেকে সোনা তোলার জন্য কোদাল বা বেলচার ব্যবহার দরকার নেই। বরং প্রয়োজন এমন কিছু মস্তিষ্ক, যা জটিল অ্যালগরিদম বুঝতে পারে এবং মেশিনকে মানুষের মতো ভাবতে শেখাতে পারে। আর এই বিশেষ মস্তিষ্কগুলোর মালিকদের আমরা বলে থাকি এআই বিশেষজ্ঞ (AI Expert)।

বর্তমানে এআই বিশেষজ্ঞদের পেতে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে এক তীব্র, নীরব লড়াই। যেসব প্রতিষ্ঠান এআইয়ের পিছনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে, তারা এই বিশেষজ্ঞদের পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিপুল পারিশ্রমিক ও অন্যান্য সুবিধার বিনিময়ে তাদেরকে আকৃষ্ট করে চলেছে তারা। একে বলা হচ্ছে ‘দ্য ট্যালেন্ট রেস’ বা মেধার দৌড়। এই দৌড়ে যে জিতবে, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ তারই হাতে থাকবে।

​একটা সময় ছিল যখন দেশগুলো তেল বা খনিজ সম্পদের জন্য লড়াই করত। এক দেশ আরেক দেশে আক্রমণ চালাতো, যুদ্ধ পরিচালনা করতো। কিন্তু এখন লড়াইটা আমূল বদলে গেছে। এই লড়াইয়ের যোদ্ধারা হচ্ছেন মেধাবী প্রকৌশলী, গবেষক আর ডেটা সায়েন্টিস্টরা। গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট, অ্যাপলের মতো টেক জায়ান্টগুলো বিশ্বের সেরা এআই প্রতিভাদের অবিশ্বাস্য বেতন, প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হওয়ার সুযোগ আর গবেষণার অফুরন্ত সুবিধা দিয়ে নিজেদের দিকে টেনে নিচ্ছে।

কান পাতলেই শোনা যায়, একজন সদ্য পিএইচডি শেষ করা নতুন এআই গবেষকের বার্ষিক বেতন মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়াও এখন আর অস্বাভাবিক কিছু নয়। অতীতে যেকোনো জায়গাতেই সদ্য পিএইচডি শেষ করা একজন ব্যক্তির এরকম পারিশ্রমিক অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু এআই নিয়ে কাজ করা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সব প্রথা ভেঙে দিয়ে তাদেরকে টেনে নিচ্ছে।

এআই প্রতিভাদের টেনে নেয়ার এই লড়াইটা শুধু বড় বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। শত শত স্টার্টআপ, যারা হয়তো যুগান্তকারী কোনো এআই মডেল নিয়ে কাজ করছে, তাদের জন্যও সেরা প্রতিভা খুঁজে পাওয়া জীবন-মরণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এই স্টার্ট-আপগুলোর চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করছে এই প্রতিভাদের উপর।

অনেক সময় বড় কোম্পানিগুলো কোনো সম্ভাবনাময় ছোট স্টার্টআপকে কিনে নেয় শুধু তাদের প্রযুক্তি বা পণ্যের জন্য নয়, বরং তাদের মেধাবী দলটিকে নিজেদের করে নেওয়ার জন্য। এভাবে তূলনামূলক সহজেই একঝাঁক মেধাবী মুখকে নিজেদের ডেরায় ভেড়ানো যায়। এই কৌশলকে বলা হয়ে থাকে ‘অ্যাকুই-হায়ারিং’ (Acqui-hiring), যা এই ট্যালেন্ট রেসের এক অন্যতম রণকৌশল।

​তবে এই দৌড়ের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় এখন আর শুধু কোম্পানি নয়, বরং শক্তিশালী দেশগুলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের যে প্রতিযোগিতা চলছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এআই। চীন ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রধান এআই উদ্ভাবনী কেন্দ্র হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। তারা একদিকে যেমন নিজেদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, তেমনই অন্যদিকে বিদেশে থাকা প্রবাসী চীনা গবেষকদের আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

​অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও পিছিয়ে নেই। সিলিকন ভ্যালির আকর্ষণ তো রয়েছেই, এর পাশাপাশি তারা ‘গ্লোবাল ট্যালেন্ট’ ভিসার মতো প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে, বিশেষ করে ভারত, ইউরোপ ও কানাডা থেকে সেরা এআই বিশেষজ্ঞদের নিজেদের দেশে নিয়ে আসছে। এই দুই পরাশক্তির বাইরে কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং ইসরায়েলও এআই গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।

​এই তীব্র প্রতিযোগিতার কিছু অন্ধকার দিকও রয়েছে। এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা বা অ্যাকাডেমিয়া। টেক কোম্পানিগুলোর চোখধাঁধানো বেতনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বা গবেষণার কাজ চালিয়ে যাওয়াটা অনেক মেধাবীর জন্যই কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে, সেরা অধ্যাপকরা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে এআই ইন্ডাস্ট্রিতে যোগ দিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্পন্ন গবেষণার গতি কমছে, তেমনই আগামী প্রজন্মের জন্য এআই বিশেষজ্ঞ তৈরি করার মতো যথেষ্ট শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না। একে বলা হচ্ছে ‘একাডেমিক ব্রেইন ড্রেন’।

​এর পাশাপাশি, এই ট্যালেন্ট রেস প্রযুক্তি জগতে এক ধরনের বিভেদ তৈরি করছে। হাতেগোনা কয়েকটি বড় কোম্পানি এবং দেশের হাতে বিশ্বের সেরা এআই মেধা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। ফলে, ছোট দেশ বা কোম্পানিগুলোর পক্ষে এই প্রযুক্তির সুফল পাওয়া বা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। যে দেশ বা কোম্পানি এই মেধাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে, তাকে আকর্ষণ করতে পারবে এবং বিকাশের সুযোগ করে দেবে, তারাই আগামী দিনের প্রযুক্তিগত বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবে। এই দৌড় এখনো থামেনি, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি আরও তীব্র হচ্ছে।

This post was viewed: 26

আরো পড়ুন