একজন শিল্পী আশা ভোঁশলের অনিঃশেষ সুরযাত্রার স্মরণে দুই-চার লাইন লেখা কঠিন। তবে এটুকু তো বলাই যায় যে, নন্দিত কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলের প্রয়াণ ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতভুবনে এক যুগের অবসান ঘটাল। ৯২ বছর বয়সে মুম্বাইয়ে তাঁর মৃত্যু হয়, যার মধ্য দিয়ে থেমে যায় ভারতীয় সঙ্গীতের এক জীবন্ত ইতিহাসও।
প্রায় আট দশকজুড়ে বিস্তৃত তাঁর সংগীতজীবন শুধু বলিউড নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার শ্রোতাদের আবেগ, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ছিল। তাঁর কণ্ঠে ছিল একইসঙ্গে দুষ্টুমি, আবেগ, ব্যথা, সুরের খেলা, প্রণয় ও দার্শনিক গভীরতা। এই বিরল বহুরূপী শক্তিই তাঁকে সাধারণ জনপ্রিয়তার বাইরে নিয়ে এক ঐতিহাসিক শিল্পীতে পরিণত করেছে। এই অবস্থান মাত্র দুই-একজনেরই আছে।
শৈশবেই গান শুরু করা আশা ১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবিতে প্রথম কোরাস গান রেকর্ড করেন। পরে হিন্দি চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন তিনি। তারপর ১৯৫৭ সালের নয়া দৌড় ছবির ‘উড়ে জাব জাব জুলফে তেরি’ গানটি দিলীপ কুমার এবং বৈজন্তীমালার কণ্ঠে জাদু ছড়িয়ে ঠাঁই নিয়েছে চিররঙিন তথা বলিউড ক্লাসিক হিসেবে। এই গান তাঁকে বড় পরিসরে প্রতিষ্ঠা দেয়।
এরপর তিনি আর পেছনে তাকাননি। “আজা আজা…”, “দম মারো দম”, “দিল চীজ কিয়া হ্যায়”, “চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে”, “রঙ্গিলা রে”- এমনই অসংখ্য গান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। তাঁর শিল্পীসত্তার বড় আদর্শ ছিল নিজেকে এক ঘরানায় আটকে না রাখা। অর্থাৎ গজল, পপ, কাওয়ালি, ভজন, লোকধর্মী সুর, ক্যাবারে, রোম্যান্টিক গান- কী গাইতে বাদ রেখেছেন তিনি! সবখানেই তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
শিল্পী হিসেবে তাঁর অর্জনও অসামান্য। তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, পদ্মবিভূষণ, একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও বহু ফিল্মফেয়ার সম্মানে ভূষিত হন। আন্তর্জাতিক পরিসরেও তাঁর কণ্ঠ পৌঁছেছে। ব্রিটিশ শিল্পী বয় জর্জের প্রকল্পে কণ্ঠ দেওয়া থেকে শুরু করে গ্র্যামি-মনোনয়নের ইতিহাসে ভারতীয় সংগীতশিল্পীদের জন্যও তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ নাম।
জনপ্রিয়তার দিক থেকেও তিনি ছিলেন এক বিস্ময়। শুধু চলচ্চিত্রের নায়িকাদের কণ্ঠ নন, তিনি ভারতীয় নগরজীবন, প্রেম, বেদনা ও আধুনিকতার এক সঙ্গীত-প্রতীক। তবে আশা ভোঁসলের সাফল্যের পেছনে সহশিল্পীদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুরকার ও. পি. নাইয়ার তাঁর কণ্ঠের উজ্জ্বলতা ও তেজকে বড় পরিসরে সামনে এনেছিলেন। মোহাম্মদ রফির সঙ্গে তাঁর ডুয়েট হিন্দি ছবির সোনালি অধ্যায়ের অংশ হয়ে আছে।
যা-ই হোক, আর. ডি. বর্মনের সঙ্গে তাঁর সৃজনশীল সহযোগিতা ভারতীয় চলচ্চিত্রসংগীতে আধুনিকতা, পাশ্চাত্য ছন্দ ও নতুন শব্দশৈলীর সুযোগ সৃষ্টি করে গানের একটা আলাদা ধারা এনেছিল। পরবর্তী সময়ে এ. আর. রহমানের সঙ্গেও তিনি নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। এসব সহযাত্রাই প্রমাণ করে- তিনি শুধু একক নন, তিনি ছিলেন সহযোগিতার মধ্য দিয়েও দীপ্যমান এক শিল্পীসত্ত্বা।
পুরুষদের হিসেবে কুমার শানু আর নারীদের মধ্যে তিনি। সংখ্যা হিসেব করতে গেলেও তাঁর বিস্তার বিস্ময়কর। গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ২০১১ সালে তাঁকে ‘Most Studio Recordings – Singles’ শিরোনামে নথিভুক্ত করে। সেখানে বলা হয়, তিনি ২০টির বেশি ভাষায় প্রায় ১১,০০০ স্টুডিও রেকর্ডিং করেছেন!
সাম্প্রতিক সংবাদসংস্থাগুলো তাঁর মোট গানসংখ্যা প্রায় ১২,০০০ বলছে। আর তাঁর দীর্ঘদিনের জীবনীভিত্তিক ওয়েব-উৎসগুলোতে উল্লেখ আছে, তিনি প্রায় ৯২৫টি চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। তাই সংযতভাবে বলা যায়, শত শত চলচ্চিত্র আর হাজার হাজার সিঙ্গেল/স্টুডিও রেকর্ডিং মিলিয়ে আশা ভোঁসলে উপমহাদেশের সংগীত-ইতিহাসে এক অনুকরণীয় উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন।
শিল্পী হিসেবে আশা ভোঁসলের কণ্ঠ থেমে গেছে আজ। কিন্তু তাঁর সুরেলা সেসব গান আজও মানুষের স্মৃতিতে যেমন টিকে আছে, তেমনি আরও বহুদিন বেঁচে থাকবে। আশা ভোঁসলের প্রয়াণে পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি তাঁর অর্জনগুলোকে। তাঁর সৃষ্টিশীলতা অনুপ্রাণিত করুক ভারতবর্ষের প্রতিটি দেশের শিল্পীদের।
লেখক
ড. মো. আদনাম আরিফ সালিম
সহযোগী অধ্যাপক
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়