Ridge Bangla

শমিত সোম: সম্ভাবনার দুয়ারে নতুন অতিথি

কয়েক বছর আগেও এসব ছিল স্বপ্ন। লাল-সবুজের জার্সি মাতাবেন এমন সব ফুটবলার, ইউরোপ-আমেরিকার জার্সিতে যাদের আছে অপার সম্ভাবনা। বিলাসি জীবন, আর্থিক নিশ্চয়তা ছেড়ে ফুটবলে তলানিতে থাকা বাংলাদেশে কে খেলতে আসবে? প্রশ্নের জবাব হাতের কাছে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে আগ্রহ তৈরি হয়েছে প্রবাসীদের। তাদের একজন শমিত সোম। দেশের ফুটবলের নতুন কান্ডারি হিসেবে যাকে দেখছে ভক্ত-সমর্থকরা।

বাংলার ফুটবলের খোঁজখবর যারা রাখেন, তারা জানেন- এ দেশে ফুটবলটা এতদিন কেবল নামেই ছিল। আশি-নব্বইয়ের দশকের প্রবল জনপ্রিয় খেলায় ভাটা পড়েছে একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে। একদিকে ক্রিকেটের অবিশ্বাস্য উত্থান, আরেকদিকে কাজী সালাউদ্দিনের অধীনে ফুটবলে ক্রমাগত অবনতি। দুইয়ের মিশেলে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটি থেকে। বাংলাদেশের মানুষ রাত জেগে ইউরোপিয়ান ফুটবল উপভোগ করলেও দেশের ফুটবল নিয়ে ছিল না বিন্দুমাত্র আগ্রহ।

হামজা চৌধুরীর আগমনে পাশার দান উল্টেছে। ফুটবল এখন আলোচনার কেন্দ্রে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা একজন তারকা, যিনি খেলেছেন ইংল্যান্ডের বয়সভিত্তিক দলে, তিনি এসেছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে। হামজা এসে শক্তি বাড়িয়েছেন। গত মার্চে ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটাতেই বাংলাদেশ চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে। হামজা যখন এলেন, খুলে গেল সম্ভাবনার বিশাল দুয়ার। সেই দুয়ার দিয়ে প্রবেশ করলেন আরেক ভিনদেশি, শমিত সোম।

২৭ বছর বয়সী শমিত কানাডার সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলছেন। কানাডিয়ান ফুটবল লিগে কাভালরি এফসির জার্সিতে মাঠ মাতাচ্ছেন। দলের নিয়মিত মুখ শমিতের সুযোগ ছিল কানাডা জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার। জন্মসূত্রে কানাডিয়ান, জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন দুটি ম্যাচ। ভাগ্যিস, সেগুলো আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছিল না। নইলে তাকে পাওয়া হতো না বাংলাদেশের। কিন্তু, বিধাতা লিখে রেখেছেন ভিন্য চিত্রনাট্য।

কানাডা অনূর্ধ্ব-২০ দলের জার্সিতে ৭টি এবং অনূর্ধ্ব-২১ দলের জার্সিতে ৪টি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা আছে শমিতের। বাংলাদেশ দলে হামজা এসে যে প্রাণের সঞ্চার করেছেন, শমিত তাতে পূর্ণতাই দিতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) বড়সড় ধন্যবাদই পাবেন। দেশের ফুটবলে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় তারকা হামজা চৌধুরী। শমিতের স্থান থাকছে তার পরেই। তাকে পাওয়ার জন্য যত প্রক্রিয়া, বেশ দক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে বাফুফে। ফিফা দিয়েছে অনুমোদন, কানাডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও ছাড়পত্র ‍দিয়ে দিয়েছে। পেয়েছেন সবুজ পাসপোর্ট।

বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে একদিন, সেটি ভাবা বাতুলতা ছিল। অতদূর যাওয়ার বিলাসিতা এখনও করতে না পারলেও এশিয়ার বুকে লাল-সবুজের ঝাণ্ডা ওড়ানোর স্বপ্ন আর একেবারে অবাস্তব নয়। কে জানে, বিশ্বমঞ্চে আমার সোনার বাংলা গাওয়ার পথটাও তৈরি হওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে কি না।

ভারতের দশরথ মাঝির কথা জানেন নিশ্চয়ই? ২২ বছর ধরে একা পাথর কেটে রাস্তা বানিয়েছেন। ফুটবলের অকূল সমুদ্রে বাংলাদেশে মাঝি একজন ছিলেন এতদিন। জামাল ভূঁইয়া। ডেনমার্ক থেকে বাংলাদেশে আসেন। প্রথম প্রবাসী বাংলাদেশি ফুটবলার। তারপর এলেন তারিক কাজী। সালাউদ্দিনের আমলে সাদামাটা থাকলেও বীজটা বুনে দিয়েছিলেন তারা। হামজা-শমিতরা তারই ফসল।

দশরথ মাঝি তো ভিন্ন উদাহরণ। ফুটবলেই আছেন একজন। গ্যারেথ বেল। ওয়েলসের মহাতারকা। বেল তখনও তারকা হয়ে ওঠেননি। গতির ঝড়ে নিজেকে চেনাচ্ছেন। ইংল্যান্ড প্রস্তাব দিল, আসো আমাদের দলে। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ওয়েলসের অবস্থান ছিল ১০০-র বাইরে, ইংল্যান্ড সেরা দশে। বেল জবাব দিয়েছিলেন, আমি নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করব। ২০১৬ ইউরোতে ওয়েলস সেরা দশে চলে আসে। একই মঞ্চে ইংল্যান্ডের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খেলেন গ্যারেথ বেল। ইউরোপিয়ান ফুটবল দেখে বড় হওয়া প্রজন্ম প্রেরণা নিতেই পারে বেলের কাছ থেকে। বেলও ছিলেন একা। আগেই বলা, আমাদের আছেন অনেকে। জামাল, তারিকদের পাশে হামজা আর হালের শমিত- আশার চাষা হয়ে মাথা উঁচানোর জন্য তারা যথেষ্ট।

ফুটবলে গোলই শেষ কথা। শমিতরা গোল দেন না। তারা গোল করান। ফুটবল যারা বোঝেন, তারা জানেন, মাঝমাঠের গুরুত্ব। শমিত খেলেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে। দলকে গাঁথেন এক সুতোয়। ৯০ মিনিটে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ যারা রাখেন, ম্যাচ তাদেরই। শমিতকে তাই আগামীর চালিকাশক্তি বলা যায় অনায়াসে।

বাংলাদেশের জার্সিতে এখনও অভিষেক হয়নি শমিতের। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১০ জুন সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে গায়ে চাপাবেন লাল-সবুজের জার্সি। এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে হামজা-শমিত জুটি দেখতে মুখিয়ে সবাই। শমিতও অধীর ঢাকার মাঠ দাপিয়ে বেড়াতে। বলেছেন, ‘আমি শমিত সোম। আমি ভীষণ উন্মাদনা নিয়ে অপেক্ষায় আছি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে। সবাইকে ধন্যবাদ যারা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং ব্যাপারটি সম্ভব করেছে।’

ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। সমীহের চোখে দেখছে সবাই। আর আমরা মাঠে রাঙাচ্ছি চোখ। চোখে চোখে রেখে লড়াই করে নিজেদের জানান দিচ্ছি। বিশ্বজয় করতে হলে থাকতে হবে ডরহীন।

This post was viewed: 28

আরো পড়ুন