Skip to main content

Ridge Bangla

প্রশ্নের মুখে রূপপুর প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতি: এই অন্তহীন মানবসৃষ্ট সংকটের শেষ কোথায়?

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। নিঃসন্দেহে এটি জাতি হিসেবে আমাদের গর্বের, এবং নতুন এক যুগে প্রবেশেরও প্রতীক। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, নানা অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা নিয়ে প্রায়ই উঠে আসছে এই প্রকল্পের নাম। আর ধারাবাহিকভাবেই এই বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে রিজ বাংলা। সম্প্রতি আমাদের হাতে এসেছে একটি ‘অত্যন্ত সংবেদনশীল’ ডকুমেন্ট, যেখানে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, নিয়োগ কাঠামো, মানবসম্পদ নীতি, প্রশাসনিক আচরণ, প্রকল্প পরিচালনা, ব্যয়-দক্ষতা, রাশিয়ান ঠিকাদার নির্ভরতা, এমনকি টেকনিক্যাল পরিকল্পনা নিয়েও একের পর এক গুরুতর সব বিষয় উঠে এসেছে।

ডকুমেন্টটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ সালে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড বা এনপিসিবিএল গঠনের পরও কেন প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ, কার্যকর অপারেটিং অর্গানাইজেশন হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি- সেই বিষয়ে যুক্তিসঙ্গত সব প্রশ্ন উঠে এসেছে। আর হাতে আসা ডকুমেন্ট অনুযায়ী সেসব বিষয় সিনিয়র ম্যানেজমেন্টকে তুলে ধরেছিলেন প্রতিষ্ঠানটিরই একজন কর্মী। রিজ বাংলার গোপনীয়তা নীতি বজায় রেখে আজকের অনুসন্ধানী রিপোর্টের বাকি অংশে ঐ কর্মীকে ‘মি. এক্স’ বলেই সম্বোধন করব।

মি. এক্সের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো উচ্চ-প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পের জন্য যে ধরনের শক্তিশালী অপারেটিং কাঠামো, সুস্পষ্ট দায়িত্ববণ্টন, লোকবল পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন, বাস্তবে তার অনেকটাই রূপপুরে অনুপস্থিত।

একটি দেশে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে অপারেটিং কোম্পানিকে কেন শুরু থেকেই শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হলো না- সেই বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার ভাষায়, ১০ বছর ঘনিয়ে এলেও এনপিসিবিএলের “কোনো স্ট্রাকচারই নেই”, ধাপে ধাপে পর্যাপ্ত লোকবল গড়ে ওঠেনি, এমনকি বেতন-ভাতা ছাড়া কর্মীদের জন্য প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দৃশ্যমান অন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাও তৈরি হয়নি।

এই অংশে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি হলো, তিনি মনে করেন- এনপিসিবিএলকে শুরুতে একটি শক্তিশালী অপারেটিং সত্তা হিসেবে গড়ে না তুলে এমনভাবে চালানো হয়েছে, যাতে পূর্ণাঙ্গ অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স ব্যবস্থাপনা দাঁড়াতে দেরি হয়।

মি. এক্সের দাবি, হাজার হাজার কর্মীসম্বলিত একটি নির্মাণ কাঠামোকে আলাদা করা গেলেও, অপারেটিং অর্গানাইজেশনকে সময়মতো দাঁড় করানো হয়নি। তিনি এমন প্রশ্নও তুলেছেন, একটি নির্দিষ্ট প্রকল্প-পর্বের মধ্যে নির্মাণ সংস্থা ও অপারেটিং সংস্থাকে স্পষ্টভাবে আলাদা করে না ফেললে ভবিষ্যতে দক্ষ কর্মীরা কেন এই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদে থাকতে চাইবেন?

প্রকল্পে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশদ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মি. এক্স। তার অভিযোগ, সিনিয়রিটি, দক্ষতা ও উপযুক্ততার প্রশ্ন উপেক্ষা করে বিভিন্ন পদে পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। বিশেষভাবে তিনি উল্লেখ করেন, জুনিয়রদের দ্রুত উঁচু পজিশনে বসানো হয়েছে, আর সিনিয়রদের কখনো কখনো এমন অবস্থানে রাখা হয়েছে যা তাদের অভিজ্ঞতা বা পেশাগত মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

অপারেশনে দায়িত্বশীল অবস্থানে দীর্ঘদিনের ট্রেনিংপ্রাপ্ত একজনকে যৌক্তিক কারণ ছাড়া জুনিয়রের অধীনে বা নিম্নতর মর্যাদার কাঠামোয় নামিয়ে আনার নজিরও সেখানে আছে, যা শুধু প্রশাসনিক নয়, পেশাগতভাবেও অপমানজনক। মি. এক্সের ভাষ্যে, এ ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা, হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন নিয়োগ-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। বিশ্বের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও স্বচ্ছ পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও রূপপুরের বেলায় অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

মি. এক্সের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির অর্গানোগ্রাম রাশিয়ান মডেল অনুসরণ করে এমনভাবে তৈরি বা আংশিকভাবে সাজানো হয়েছে, যা স্বাভাবিক কর্মপদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং যার ফল বুঝতে সময় লাগবে দীর্ঘদিন, কিন্তু তার প্রভাব ইতোমধ্যেই কর্মপরিবেশে পড়ছে। বিশেষভাবে তিনি উল্লেখ করেন, যেসব মূল ইউটিলিটি-সংশ্লিষ্ট জনবল শুরুতে ভালো অবস্থানে ছিল, পরবর্তী সিদ্ধান্তে তাদের গুরুত্ব কমে গেছে। এতে তিনি ভবিষ্যতে দক্ষ প্রকৌশলীদের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

ডকুমেন্টের এক জায়গায় মি. এক্স আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ২০২৮ সালের পর যখন যখন বন্ডের মেয়াদ শেষ হবে, তখন যোগ্য ও মেধাবী কর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চাকরি ছাড়তে পারেন। তার মতে, এখনকার পরিবেশ ও নীতিগত অসন্তোষ যদি বহাল থাকে, তবে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ জনবল ধরে রাখতে পারবে না।

তার বক্তব্যে স্পষ্ট, প্রতিষ্ঠানটির ভেতরের অসন্তোষ শুধু বেতন বা পদোন্নতি-সংক্রান্ত নয়; মর্যাদা, পেশাগত পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা- সব মিলিয়েই একটি অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

কর্মীদের উপযুক্ত অফিস স্পেস, ল্যাপটপ, আইডি কার্ড, সেফটি ইকুইপমেন্টের মতো দরকারি জিনিসগুলো যথাসময়ে না পাবার বিষয়টিও উঠে এসেছে সেখানে।

পরিবহন ও অফিসে বসার স্থান নিয়েও ডকুমেন্টে একাধিক তীব্র অভিযোগ রয়েছে। ৩ শতাধিক কর্মীর জন্য অল্পসংখ্যক গাড়ি বরাদ্দ দিয়ে এমন একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যেখানে আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে চলতে হয়। এতে কর্মীদের মর্যাদা যেমন ক্ষুণ্ন হয়, তেমনি কার্যকর কর্মপরিবেশও নষ্ট হয় বলে অভিযোগ জানিয়েছেন তিনি।

রূপপুর প্রকল্প ও এর আর্থিক-কারিগরি বিষয়গুলো নিয়েও একের পর এক শঙ্কাযুক্ত প্রশ্ন উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।

  • বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি ব্যয় কত দাঁড়াবে?
  • পিপিএ কত বছরের জন্য হবে? এনপিসিবিএল না পরমাণু শক্তি কমিশনের সাথে পিপিএ হবে?
  • আইন অনুযায়ী অপারেটিং অরগানাইজেশান এনপিসিবিএল হলেও পরমাণু শক্তি কমিশনের নামে লাইসেন্স কেন হলো?
  • প্রকল্পের বিলম্বের জন্য রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকার অপর্চুনিটি লস (প্রতিদিনের জন্য প্রায় ৬৩ কোটি টাকা) হলেও ইউক্রেন যুদ্ধ, করোনা ভাইরাস আর পিজিসিবি-র উপর দায় চাপিয়ে বসে থাকা হচ্ছে কেন?
  • জাতীয় গ্রিডে কবে পাওয়ার যাবে?

আরও কঠিন প্রশ্ন এসেছে স্বার্থের সংঘাত নিয়ে। মি. এক্স জানতে চেয়েছেন, যাদের সঙ্গে বাংলাদেশকে কয়েক দশক সম্পর্ক রেখে চলতে হবে, সেই জেনারেল ডিজাইনারদের সঙ্গে কেন স্বাধীনভাবে চুক্তি করা হলো না?

প্রকল্পের প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ভবিষ্যতে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ফুয়েল ব্যবহারের পরবর্তী ধাপ, স্টোরেজ পরিকল্পনার মতো সংবেদনশীল পর্বে রেডিও-অ্যাকটিভিটি মোকাবিলার ব্যবস্থা যথাযথভাবে ভাবা হয়েছে কি না। প্রয়োজনীয় সুবিধা ও প্রস্তুতি আগে না থাকলে অপারেশন যে গোটা দেশের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে- সেই ব্যাপারেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

মি. এক্স আরও বলেন, গরম ও শীত- দুই মৌসুমের পরিবেশগত পার্থক্য বিবেচনায় রেখে অনেক কম্পোনেন্ট বা কন্ডিশনিং বিষয় পর্যাপ্তভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি প্রকল্পে। এমনকি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজাইন ডকুমেন্ট (P&ID, PPI List) দীর্ঘদিন হাতে না পাওয়ার অভিযোগও সেই ডকুমেন্টে আছে।

একইসঙ্গে তিনি ক্যাপিটাল/মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং, সামার-উইন্টার অপারেশন কন্ডিশন, বেসিক সেফটি-সংক্রান্ত স্থাপনা, এমনকি টেকনো-কমার্শিয়াল ফিজিবিলিটি স্টাডির বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন করেছেন। আরও গুরুতরভাবে তিনি লিখেছেন, রাশিয়ান ঠিকাদারদের কাছ থেকে যথাসময়ে কাজ আদায় করা যাচ্ছে না।

একইসাথে প্রশ্ন উঠে এসেছে ওয়ার হাউস/স্টোরের মতো বড় স্থাপনার কথা ডিজাইনার/কন্ট্রাক্টরের ভুলে যাওয়া, অ্যাডমিন বিল্ডিংসহ অন্যান্য ওয়ার্কপ্লেসের জায়গা কর্মীদের সেটআপ ও স্ট্যাটাস বিবেচনায় ডিজাইন না করা, ফায়ার ট্র্যাকগুলো বছরের পর বছর পড়ে থাকলেও কমিশন না হওয়া, রাশিয়ান ঠিকাদারদের অদক্ষতা, অপর্যাপ্ত লোকবল, অতি-মূল্যায়ন, ভুলে ভরা ডকুমেন্টপ্রাপ্তি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাবস্টেশন চীনা অখ্যাত কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া, ভেন্টিলেশনসহ অন্যান্য কাজ সমাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা, সুপেয় পানির অভাবের মতো গুরুতর সব বিষয় নিয়ে।

আমাদের হাতে আসা মি. এক্সের এই ডকুমেন্টে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, নিয়োগে অস্বচ্ছতা, পেশাগত অপমানবোধ, দক্ষ জনবল হারানোর আশঙ্কা, লজিস্টিক ব্যর্থতা, এবং প্রকল্প পরিচালনার বহুস্তরীয় দুর্বলতা নিয়ে ধারাবাহিক সব প্রশ্ন উঠে এসেছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ, উচ্চ-ব্যয়বহুল এবং জাতীয় মর্যাদাসম্পন্ন প্রকল্পের ব্যাপারে এমন সব প্রশ্ন উঠলে সেগুলোকে হেলাফেলা করে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যত দ্রুত এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে এসব ব্যাপারে সুরাহার পদক্ষেপ নেবেন, দেশের জন্য ততই মঙ্গল।

This post was viewed: 393

আরো পড়ুন