Ridge Bangla

জেরিকো: পৃথিবীর আদিমতম নগরীর ইতিহাস

সভ্যতার পাঠশালায় জেরিকোর নাম লেখা হয়েছিল সূর্যোদয়ের বহু আগেই। মানুষ যখন গুহা ছেড়ে বেরিয়ে এলো, শিকারি জীবনকে পেছনে ফেলে বেছে নিল ঘর বাঁধার সাহস, তখন এক জলপ্রবাহের তীরে তারা গড়ে তুলল মানব ইতিহাসের প্রথম শহর — জেরিকো।

জেরিকোর নাম এলেই চোখে ভেসে ওঠে বাইবেলের সেই কিংবদন্তি। যেখানে ইসরায়েলের বাসিন্দারা শহরটির চারপাশে ঘুরে বেড়িয়েছিল সাতবার, তারপর শিঙা ফুঁকে ধ্বংস করে দিয়েছিল এর দুর্ভেদ্য প্রাচীর। যশুয়া গ্রন্থে বর্ণিত এই উপাখ্যান প্রাচীন যুগের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু বাইবেলের সেই ঘটনার বহু আগে থেকেই জেরিকো ছিল এক সুপ্রতিষ্ঠিত জনপদ।

জেরিকো মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম নগরসমূহের একটি। এই শহরের পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনে বহু অনুসন্ধান, খনন ও গবেষণা চালানো হয়েছে। ১৮৬৮ সালে চার্লস ওয়ারেনের তত্ত্বাবধানে প্রথম খননকার্য শুরু হয়। জেরিকো যে উঁচু ঢিবির ওপর অবস্থিত ছিল, তা ‘তেল আল-সুলতান’ নামে পরিচিত। এখানেই চালানো হয় প্রথম খননকার্য। ওয়ারেনের দল টেম্পল মাউন্টের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ উন্মোচন করে এখান থেকে।

এরপর ১৯০৭ থেকে ১৯১১ সালে পর্যন্ত জার্মানদের নেতৃত্বে চলে পরবর্তী অভিযান। আর্নস্ট সেলিন ও কার্ল ওয়াটজিঙ্গারের নেতৃত্বে পরিচালিত সে অভিযানে জেরিকোর আরও অনেক নিদর্শন উন্মোচিত হয়, যা এই প্রাচীন শহরকে ঘিরে জ্ঞান ও অনুসন্ধানের দিগন্ত আরও বিস্তৃত করে তোলে। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত, খ্যাতিমান ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্যাথলিন কেনিয়ন জেরিকোর খননকাজের নেতৃত্ব দেন।

জেরিকোর প্রাচীনত্ব তাঁর খননেই প্রকাশ পায় জোরেশোরে। বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণেও সমর্থ হন তিনি। তিনি দেখান, লিখনপদ্ধতি উদ্ভাবন হওয়ার হাজার হাজার বছর পূর্বে, নব্যপ্রস্তর যুগে গড়ে উঠে এই বসতি। কেনিয়নের এই আবিষ্কারের ফলে বহু গবেষক বিশ্বাস করতে বাধ্য হন, জেরিকোই সম্ভবত মানব সভ্যতার প্রথম ও প্রাচীনতম বসতি। আজও জেরিকোর সেই প্রাচীনতম জনবসতির স্বীকৃতি অক্ষুণ্ন রয়েছে। ১৯৯৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত, ইতালীয় ও ফিলিস্তিনিদের যৌথ গবেষক দল একটি প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান পরিচালনা করেন। এই অভিযানে আবিষ্কৃত হয় বেশ কিছু গম্বুজ।

লেভান্ট অঞ্চলের নাতুফিয়ান সংস্কৃতি এক অভিনব ধারা সৃষ্টি করেছিল। এরা যাযাবরও নয়, আবার পুরোদস্তুর কৃষকও নয়। প্রায় ১৫,০০০ থেকে ১১,৫০০ বছর পূর্বে এই সংস্কৃতি গোটা লেভান্ট জুড়ে বিস্তৃত ছিল। পৃথিবীতে স্থায়ীভাবে কৃষিকাজ শুরুর পূর্বে নাতুফিয়ানরাই প্রথম এই জায়গায় বসবাস শুরু করে, পরবর্তীতে যা জেরিকো নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

পৃথিবীতে তখন ‘ইয়াঙ্গার ড্রায়াস’ যুগ চলমান। এই যুগ ঘন ঘন খরা আর তীব্র ঠাণ্ডার জন্য সুপরিচিত। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এক জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস ছিল প্রায় অসম্ভব। তবে জেরিকোর যে স্থানে তারা বসতির গোড়াপত্তন করেছিল, সেখানে ছিল একাধিক স্বচ্ছ ও প্রবহমান প্রাকৃতিক ঝরনা। জলের এই প্রাকৃতিক উৎসগুলোই জায়গাটিকে অস্থায়ীভাবে হলেও মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে।
খ্রি.পূ. আনুমানিক ৯৬০০ অব্দে ইয়াঙ্গার ড্রায়াস যুগের অবসান ঘটে। আবহাওয়া হয়ে উঠে উষ্ণ, আর্দ্র ও মানব বসবাসের উপযোগী। তখন থেকেই এই স্থানটি দীর্ঘমেয়াদি বসতির জন্য অনুকূল হয়ে ওঠে। খ্রি.পূ. প্রায় ৯৫০০ অব্দ নাগাদ, এখানে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে মানুষেরা। ফলে, যাযাবর জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে মানুষ নির্মাণ করে ইতিহাসের প্রথম নগরী।

খ্রি.পূ. ৯৫০০ অব্দ থেকে খ্রি.পূ. ৬৫০০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়কে জেরিকোর প্রত্নতত্ত্বে ‘পাত্র-পূর্ব নব্যপ্রস্তর যুগ’ নামে চিহ্নিত করা হয়। এই সময়ে জেরিকোতে মৃৎপাত্রের প্রচলন ছিল না। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি তৈরি হতো পাথর ও কাঠ দিয়ে।

তখনকার জেরিকোর প্রাক-নগর পর্যায়ের জীবনধারা ছিল শিকার ও সংগ্রহনির্ভর। বন্য পশু-পাখির ওপর নির্ভরতা ছিল প্রবল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুনো শস্যকে পোষ মানানো হয়। কৃষিকাজে এগিয়ে আসে মানুষ। গম, যব ও নানা রকম ডাল ছিল তখনকার সময়ের প্রধান শস্য। সেসময়ের ঘরবাড়ি ছিল গোলাকৃতির। শুকনো কাদামাটি ও খড় মিশিয়ে তৈরি হত দেয়াল ও ছাদ। রান্নার চুলা থাকত ঘরের ভেতরে কিংবা বাইরে।

খ্রি.পূ. ৮৩৫০ অব্দ থেকে খ্রি.পূ. অব্দ ৭৩৭০ অব্দ সময়ে গড়ে ওঠে ‘সুলতানীয় বসতি’ নামে এক জনপদ, যার বিস্তৃতি ছিল প্রায় ৪০,০০০ বর্গ মিটার। এই জনপদ ঘিরে ছিল ১২ ফুট উঁচু এক মজবুত প্রাচীর, যার ভিত্তি ছিল প্রায় ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি প্রশস্ত। ঢিবিটির পশ্চিম প্রান্তে নির্মিত হয় ২৮ ফুট উঁচু এক পাথরের গম্বুজ, যা সেই সময়ের জন্য ছিল এক বিস্ময়কর স্থাপত্য কীর্তি। গবেষকদের ধারণা, এই প্রাচীর মানুষের আক্রমণের বিরুদ্ধে নয়, বরং বন্যার পানি রোধ করার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। তখন ঠিক কত মানুষ সেখানে বাস করত, তা জানা কঠিন।

খ্রি.পূ. আনুমানিক ৬৮০০ অব্দের শুরুতে এই অঞ্চলে প্রযুক্তির উন্নতি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া যায়। বিস্তৃতভাবে শস্য চাষাবাদ শুরু হয়, এবং গৃহপালিত প্রাণী পোষ মানানোর চেষ্টা চলে।

এই সময় ধর্মীয় বিশ্বাসও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে এক উপাসনা চর্চার প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে মৃতের খুলিতে কাদামাটি দিয়ে মুখাবয়ব গঠন করে ঘরে সংরক্ষণ করা হতো। খুলির চোখে বসানো হতো ঝিনুক, আর মৃতদেহ ফেলে রাখা হতো বাইরে, যাতে তা স্বাভাবিকভাবে পচে যায়। পরে দেহ কবর দেওয়া হতো ঘরের মেঝের নিচে, কখনো বা পরিত্যক্ত বাড়ির ধ্বংসাবশেষে। তবে খুলি রেখে দেওয়া হতো পরিবারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, তারা বিশ্বাস করত মানুষের আত্মিক কেন্দ্র হচ্ছে মাথা; শরীরের বাকিটুকু শুধুই মাটির ধুলা। তখনই উদ্ভাবিত হয় হাত দিয়ে শস্য গুঁড়ানোর যন্ত্র — জাঁতাকল, কাপড় বুননের যন্ত্র — চরকা, খোদাই করার যন্ত্র তুরপুনের মতো নানা হাতিয়ার।

খ্রি.পূ. তৃতীয় সহস্রাব্দের মধ্যভাগে এসে এই শহর তার সর্বোচ্চ আকার ও জনসংখ্যায় উন্নীত হয় বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। শহরটি ঘিরে নির্মাণ করা হয় বিশালাকৃতির প্রতিরক্ষা প্রাচীর, যার অভ্যন্তরে বানানো হয় এক শক্তপোক্ত প্রাসাদ।

খ্রি.পূ. তৃতীয় সহস্রাব্দের অন্তিমে, অর্থাৎ ব্রোঞ্জ যুগের শেষপর্যায়ের দিকে, কানান অঞ্চলে এটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ শহর। সময়ের সাথে সাথে শহরের প্রাচীরের পুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই প্রাচীরসমূহ ধসে খ্রি.পূ. ১৫৭৩ অব্দে শহরটি ধ্বংস হয়ে যায়।

অনেকে মনে করেন, এই ধ্বংসযজ্ঞ ইসরায়েলীয়দের আক্রমণের ফল, যা যশুয়ার সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু বাস্তবে এই ধ্বংসের কাহিনি যশুয়ার বহু শতাব্দী পূর্বেই সংঘটিত হয়েছে। মিশরীয় বাহিনী যখন হিকসোসদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল, তখনই পতন ঘটে এই শহরের। অর্থাৎ, বাইবেলে বর্ণিত ইসরায়েলীয়দের মিশরত্যাগ এবং জেরিকো শহর জয়; এই ঘটনার বহু আগেই শহরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, যশুয়ার যুদ্ধকাল, অর্থাৎ, খ্রি.পূ. ১৩শ শতকে জেরিকো পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। উল্লেখ্য, যশুয়া ছিলেন মুসা (আ) সহকারী এবং হিব্রু বাইবেলের এক চরিত্র। তিনি পরবর্তীতে ইসরায়েলিদের কেনান দেশে নিয়ে যাওয়ার নেতৃত্ব দেন।

ব্রোঞ্জ যুগ পরবর্তী বহু শতাব্দীজুড়ে জেরিকো শহর ছিল জনমানবহীন। এই দীর্ঘ শূন্যতা কাটিয়ে শহরটি আবার প্রাণ ফিরে পায় খ্রি.পূ. ১০ম ও ৯ম শতকে, লৌহ যুগে। খ্রি.পূ. ৬ষ্ঠ শতকে ব্যাবিলনীয়রা জুডিয়া আক্রমণ করে জেরিকো ধ্বংস করে দেয়। এরপর ব্যাবিলনীয় শাসন চলে দীর্ঘ সাতচল্লিশ বছর। অবশেষে খ্রি.পূ. ৫৯৮ সালে পারসিকরা ব্যাবিলন দখল করলে জেরিকোর জন্য উদিত হয় নতুন এক সূর্য। তখন শহরটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দুই শতক পর, এই শহরের ভাগ্যে আবারও পরিবর্তন আসে। দিক‌্‌বিজয়ী আলেকজান্ডার পারসিকদের পরাজিত করে জেরিকোকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে এটি চলে যায় সেলুসিড সাম্রাজ্যের অধীনে। খ্রি.পূ. ১৪০ সাল থেকে খ্রি.পূ. ৩৭ সাল পর্যন্ত জুডিয়ায় হাশমোনীয় বংশ শাসন করে। এ সময় জেরিকো রূপ নেয় এক উদ্যান নগরীতে।

রোমান বিজয়ের পর, মারকাস অ্যান্টনি ক্লিওপেট্রাকে জেরিকোর মালিকানা উপহার দেন। কিন্তু তাদের আত্মহত্যার পর এই শহরের মালিক হন রাজা হেরোদ, যিনি রোমানদের অধীনে জুডিয়ার শাসক ছিলেন। তিনি জেরিকোতে নির্মাণ করেন দৃষ্টিনন্দন এক হিপ্পোড্রোম, জলবাহী নালা, গড়ে তোলেন বিশাল এক রাজপ্রাসাদ। ফলে জেরিকো হয়ে ওঠে এক মর্যাদাপূর্ণ শহর।

পরে জেরিকো সম্পূর্ণভাবে রোমান সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। কিন্তু এটাই তার শেষ অধ্যায় ছিল না। বাইজান্টাইন, উমাইয়া, ক্রুসেডার, ওসমান তুর্কি— একে একে বহু শক্তির হাতে জেরিকোর কর্তৃত্ব গেছে। যুগে যুগে নানা রূপে, নানা শাসকে, জেরিকো বারবার বদলে গেছে, কিন্তু হারায়নি তার ঐতিহাসিক মহিমা।

তথ্যসূত্র:
১। Jericho: City of Biblical World, J.R. Bartlett, The Lutterworth Press, 1987
২। The Battle of Jericho, Sharon M. Draper, Atheneum Books for Young Readers, 2003
৩। Jericho | Facts & History – Britannica
৪। Jericho: The Ancient City Filled with Secrets
৫। The Ancient City of Jericho: The Oldest City in the World

This post was viewed: 25

আরো পড়ুন