Ridge Bangla

মহাপ্লাবনের কাহিনি কি বিশ্বজনীন?

বাইবেলের নোয়ার নৌকা ও মহাপ্লাবনের গল্পটি বিশ্বজুড়ে অন্যতম পরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ এক ধর্মীয় উপাখ্যান। ‘দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যায়, কেবল কয়েকজন সৎ ও দূরদর্শী মানুষ একটি নৌকার সাহায্যে বেঁচে থাকেন’ এই ধাঁচের সর্বগ্রাসী প্রলয়কাহিনি শুধু বাইবেলেই সীমাবদ্ধ নয়। এই রকম মহাপ্লাবনের মিথ পাওয়া যায় বিশ্বের বহু সংস্কৃতিতেও। প্রায় ৭৫০০ বছর আগে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে কোনো এক প্রকাণ্ড বন্যা সত্যিই ঘটেছিল বলে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলে। ধারণা করা হয়, এটি হয়ত ঐ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্লাবনপুরাণগুলোর পেছনের বাস্তব প্রেক্ষাপট হতে পারে। তবে চীন, আমেরিকা, এমনকি অস্ট্রেলিয়াতেও পাওয়া যায় একই ধরনের প্রাচীন প্লাবনকথা। তাহলে কি এটি এক ধরনের বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা? নিচে তুলে ধরা হলো বিশ্বের নানা প্রান্তের প্রলয়পুরাণের সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

গিলগামেশ মহাকাব্য

মেসোপটেমিয়ার ইউফ্রেটিস নদীতীরে অবস্থিত উরুক নগরের সম্রাট ছিলেন গিলগামেশ। তার জীবনকাহিনি নিয়ে রচিত ‘গিলগামেশ মহাকাব্য’ খ্রিষ্টপূর্ব ১৮শ শতাব্দীতে লেখা হলেও এর মূল উৎস ৪ হাজার বছরের পুরনো পাঁচটি সুমেরীয় কবিতা। এই মহাকাব্যে মহাপ্লাবনের কাহিনির সাথে বাইবেলের নোয়ার কাহিনির বিস্ময়কর মিল আছে। তবে এই কাহিনির নায়ক গিলগামেশ নন। তিনি অনন্ত জীবন লাভের উপায় জানতে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন প্রাচীন এক সাধুপুরুষ উতনাপিশতিমের সঙ্গে। উতনাপিশতিম বলেন, একদিন দেবতারা মানুষের কলরবে বিরক্ত হয়ে এক মহাপ্লাবন দিয়ে মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু দেবতা ‘এয়া’ উতনাপিশতিমকে আগাম সতর্ক করে বলেন, তিনি যেন একটি নৌকা তৈরি করেন, যেটাতে সমস্ত জীবের বীজ রাখা যায়।

সাত দিনে নৌকা নির্মাণ শেষ হলে পরদিন থেকেই শুরু হয় মহাপ্রলয়। উতনাপিশতিম তার পরিবার, পশু-পাখি ও সোনা-সম্পদ নিয়ে নৌকায় আশ্রয় নেন। ছয় দিন ছয় রাত ধরে অঝোরধারায় বৃষ্টি চলে, সপ্তম দিনে পানি শান্ত হয়। একসময় নৌকা ঠেকে পর্বত চূড়ায়। পরে পায়রা, গাঙচিল ও কাক ছেড়ে দিয়ে খুঁজে পান নতুন ভূমি।

এই প্লাবন দেবতাদের রোষ হওয়ায়, ভূমিতে নেমে আসার পূর্বে উতনাপিশতিম দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি দেন। দেবতারা তার ত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে ও তার স্ত্রীকে অনন্ত জীবনদানের পাশাপাশি এবং নতুন পৃথিবীর পুনর্বাসনের অনুমতি দেন।

পলিনেশীয় প্লাবনপুরাণ

হাওয়াইয়ান উপকথায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ‘নু-উ’ নামের এক মানুষের গল্প। নু-উ উপলব্ধি করেন, তার জাতির দিকে এক ভয়ংকর প্লাবন ধেয়ে আসছে। তাই তিনি এক বিশাল নৌকা নির্মাণ করেন। প্লাবন শেষে জল সরে গেলে প্রথম দেখা মেলে মাউন্ট কেয়া পর্বতের। নু-উ মনে করেন, চাঁদের দয়ায় তিনি রক্ষা পেয়েছেন এবং সেই বিশ্বাসে তিনি বলি চড়ান। পরে স্রষ্টা ‘কানে’ রংধনু বেয়ে নেমে এসে জানান, তিনিই নু-উকে রক্ষা করেছিলেন।

চীনের গুন-শুন-ইউর প্লাবনপুরাণ

চীনের প্লাবনপুরাণ তুলনামূলকভাবে অধিক বাস্তববাদী। এই কাহিনি খ্রিষ্টপূর্ব ২৩-২২ শতকে ঘটেছে বলে অনুমান করা হয়। কাহিনি অনুসারে, সম্রাট ইয়াও-এর শাসনকালে ইয়াংজি ও হোয়াং হো নদী প্লাবন ঘটায়। বিশাল জলাবদ্ধতার মোকাবিলা করতে তিনি আত্মীয় ‘গুন’কে দায়িত্ব দেন। গুন দেবতার কাছ থেকে এক ‘শিরাং’ চুরি করে কাজ করতে গেলে দেবতা ক্রুদ্ধ হন এবং তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর শাসনে আসেন ‘শুন’, যার আমলে বহু প্রশাসনিক সংস্কার হয়। কিন্তু চার বছর পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলায় না।

শেষে দায়িত্ব পান ‘ইউ’, যিনি এক ড্রাগনের সহায়তায় নদী ও জলাধার খননের মাধ্যমে জল নিস্কাশন করেন। তার সাফল্যের ফলে চীনের ‘জিয়া রাজবংশ’ প্রতিষ্ঠিত হয়।

গ্রিকদের প্লাবনকাহিনি

গ্রিক পুরাণে ডিউকেলিয়ন ছিলেন প্রমিথিউসের পুত্র। এই প্রমিথিউসই মানুষকে আগুন ব্যবহারের জ্ঞান দিয়েছিলেন।  ডিউকেলিয়নের গল্পে, দেবরাজ জিউস সিদ্ধান্ত নেন এক ভয়াবহ প্লাবন দিয়ে পৃথিবী থেকে মানবজাতিকে মুছে ফেলবেন। প্রমিথিউস আগে থেকেই ছেলের বিপদের আভাস পেয়ে তাকে পরামর্শ দেন, যেন সে একটি বিশাল ভাসমান কাঠের পেটি তৈরি করে। সেই পেটিতে ডিউকেলিয়ন ও তার স্ত্রী পিরহা আশ্রয় নেন। তবে তারা কোনো পশু-পাখিকে উদ্ধার করেননি।

নয়দিন পর, পানি ধীরে ধীরে নেমে যেতে শুরু করে। কিন্তু এ যুগলকে নতুন করে মানবজাতি জন্ম দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়নি। বরং থেমিস দেবীর মন্দিরের এক ওরাকল তাদের বলেন, তাদের নিজেদের মাথা ঢেকে নিজেদের ‘মায়ের হাড়’ পেছনে ছুঁড়ে ফেলতে হবে।

ডিউকেলিয়ন ও পিরহা বুঝে যান, এখানে ‘মা’ বলতে ইঙ্গিত করা হয়েছে পৃথিবীর প্রতিভূ মহামাতা গাইয়াকে। গাইয়ার হাড়ের প্রতীকস্বরূপ তারা পেছনে ছুড়ে দেন পাথর। ডিউকেলিয়নের ছোঁড়া পাথর থেকে পুরুষ ও পিরহার ছোঁড়া পাথর থেকে নারীর জন্ম হয়। এভাবেই পৃথিবী আবার মানুষে পূর্ণ হয়।

নর্স পুরাণে প্লাবন

নর্স পুরাণে পৃথিবীর সূচনালগ্নে দেবতা ও দৈত্যেরা একত্রে বাস করত। দেবতারা সবাই বুরি নামের এক আদিদেবতার বংশধর। তার ছেলে বোর এবং পুত্রবধূর ঘর থেকে জন্ম নেন ওডিন, ভিলি ও ভে। দৈত্যদের প্রথম পূর্বপুরুষ ছিলেন ইমির। তার দেহ থেকেই নিজের মতো করে আরও দৈত্যেরা জন্ম নিতে থাকে। ওডিন ও তার ভাইয়েরা বুঝতে পারেন, দৈত্যদের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে এবং এক সময় তারা দেবতাদের ছাপিয়ে যাবে। তাই তারা সকলে মিলে ইমিরকে হত্যা করেন।

ইমিরের রক্তে পৃথিবী প্লাবিত হয়, যাতে ডুবে গিয়ে মারা পড়ে অধিকাংশ দৈত্য। কেবল বার্গেলমির ও তার স্ত্রী একটি নৌকার মতো কিছুর মাধ্যমে বেঁচে যান। তারাই হন নতুন দৈত্য বংশের প্রবর্তক।

ইমিরের মৃতদেহ ব্যবহার করেই ওডিনরা গড়ে তোলেন বিশ্ব। তার মাংস দিয়ে পৃথিবী, রক্ত দিয়ে সাগর, অস্থি ও দাঁত দিয়ে পাথর। তার খুলি দিয়ে আকাশ, আর মস্তিষ্ক দিয়ে মেঘ তৈরি হয়।

এই বিশ্বের কেন্দ্রে তারা একটি দুর্গের মতো অঞ্চল গড়ে তোলেন, যাতে মানুষ সৃষ্টি করে বসবাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

ওজিবওয়ে জাতির প্লাবন কাহিনি

উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যেও রয়েছে প্রাচীন প্লাবনকথা। ওজিবওয়ে জনগোষ্ঠীর কাহিনি অনুযায়ী, বহু বছর আগে মানুষের মধ্যে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে গিয়েছিল। তারা অশুভ আচরণে লিপ্ত হয়েছিল। সৃষ্টিকর্তা এই অবস্থায় অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন এবং বিশ্বকে শুদ্ধ করার জন্য একটি ভয়ংকর প্লাবনের সিদ্ধান্ত নেন।

তবে একজন সাধুপুরুষ ওয়েনাবুজু সময় থাকতে একটি কাঠের ভেলা তৈরি করে ফেলেন। তার সঙ্গে ছিল কয়েকটি প্রাণী। তারা একটানা এক চন্দ্রমাস ভেলার ওপর ভেসে থাকেন। পরবর্তী সময়ে ওয়েনাবুজু পুরনো পৃথিবীর মাটি নিয়ে নতুন পৃথিবী গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি প্রথমে পানিতে পাঠান একটি লুন পাখি, কিন্তু সে নিচে পৌঁছাতে পারে না। এরপর যায় একটি বিবর, সেও ব্যর্থ হয়। অবশেষে একটি ছোট্ট কুট পাখি এই দুঃসাহসিক কাজ করতে চায়। ওয়েনাবুজু তাকে ক্ষুদ্র মনে করলেও অনুমতি দেয়। এ নিয়ে ভেলায় থাকা প্রাণীদের মধ্যে তর্ক শুরু হয় কে এই কাজ ভালোভাবে করতে পারবে তা নিয়ে। কে সফল হবে পানির নিচ থেকে পুরনো পৃথিবীর মাটি তুলে আনতে, সেই প্রশ্নে। একে একে সব প্রাণীই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ভোর হলে তারা আবিষ্কার করে, ছোট্ট কুট পাখিটি নেই। কিছুক্ষণ পর তার নিথর দেহ ভেসে ওঠে জলের উপর, আর প্রাণীরা তাকে ভেলার কাছে টেনে আনে।

কিন্তু তারপরই ঘটে আশ্চর্য এক ঘটনা। কুটের ঠোঁটে ধরা ছিল একফোঁটা কাদা। এটি ছিল সেই হারিয়ে যাওয়া পুরনো পৃথিবীরই নিদর্শন, পানির গভীর থেকে উদ্ধারকৃত এক মাটির কণা। সব প্রাণী তখন অনুশোচনায় ভরে ওঠে। তারা বুঝতে পারে, যাকে সবচেয়ে দুর্বল ভেবে তারা তাচ্ছিল্য করেছিল, সেই কুট-ই শেষ পর্যন্ত তাদের আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ওয়েনাবুজু তখন মন্ত্রবলে কুটের দেহে প্রাণ ফিরিয়ে আনেন। এবং সেই ক্ষুদ্র কাদার কণাকে নির্দেশ দেন, তা যেন বিস্তৃত হতে শুরু করে। নতুন ভূখণ্ডের বীজ যে কাদায় নিহিত ছিল, তা এখন বেড়ে উঠবে এক নতুন পৃথিবী হয়ে। তবে সে কাদা স্থাপন করার জন্য প্রয়োজন ছিল এক শক্ত ভিত্তির। ঠিক তখনই এক বিশাল খোলসওয়ালা কচ্ছপ সামনে এগিয়ে আসে। তার পিঠের উপর জমি গড়ে তুলতে সম্মতি দেয়।

এই কচ্ছপের পিঠেই ধীরে ধীরে নতুন ভূমির বিস্তার শুরু হয়। প্রথমে পিঁপড়েরা সেখানে ওঠে, তারপর একে একে অন্যান্য প্রাণী সেখানে যায়।  সবার শেষে, ওয়েনাবুজুও সেই ভূমিতে পা রাখেন। এটিকেই তিনি নতুন মানবজাতির আবাস হিসেবে এক বিশুদ্ধ, পরিশুদ্ধ, ও পুনর্জন্মপ্রাপ্ত পৃথিবী ঘোষণা করেন। বিশ্বের মহাপ্লাবনের কাহিনিগুলো শুধু ধ্বংস নয়, বরং নতুন শুরু, বাঁচার ইচ্ছা ও শিক্ষা গ্রহণের গল্প। এসব গল্পে ফুটে ওঠে মানবতার টিকে থাকার সংগ্রাম।

তথ্যসূত্র

১। Flood Myths From Around the World

২।  World Flood Myths – Ark Encounter

৩। Why are flood myths in so many ancient stories?

৪। Flood Stories from Around the World – TalkOrigins Archive

This post was viewed: 21

আরো পড়ুন