Ridge Bangla

কীভাবে সাইরাস দ্য গ্রেট প্রাচীন পারস্যকে পরাশক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন?

সাম্রাজ্য গঠনের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী এক শাসক ছিলেন সাইরাস দ্য গ্রেট। দয়ালু, সহনশীল ও দূরদর্শী এই পারস্য সম্রাট তাঁর সামরিক সাফল্য ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার মাধ্যমে মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে যাযাবর গোত্রীয় সমাজ থেকে গড়ে তুলেছিলেন বিশাল এক সাম্রাজ্য।

খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দের দিকে জন্মগ্রহণ করেন সাইরাস। পরবর্তীতে তিনি ‘সাইরাস দ্য গ্রেট’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন ইতিহাসে। আধুনিক ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে, পশুপালনকারী পাসারগাদে গোত্রের সদস্য হিসেবেই তাঁর জন্ম। তাঁর শৈশব বা বংশানুক্রমিক ইতিহাস নিয়ে নিশ্চিত তথ্য না থাকলেও ধারণা করা হয়, জন্মসূত্রে বা বিবাহসূত্রে তিনি অ্যাকেমেনিড রাজবংশের সদস্য ছিলেন।

খ্রি.পূ. ৫৫৮ অব্দে, সাইরাস পারস্যের বিভিন্ন গোত্রপতিদের একত্রিত করে মিডিয়ান রাজা অ্যাস্টিয়াজেসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা দেন। মিডিয়ান সেনাবাহিনীর এক বিশিষ্ট জেনারেলের পক্ষত্যাগ তাঁকে যুদ্ধজয়ে সহায়তা করে। খ্রি.পূ. ৫৫০ অব্দে পাসারগাদে যুদ্ধে অ্যাস্টিয়াজেসকে পরাজিত করে তিনি রাজধানী একবাতানার দখল নেন।

এর ফলে পারস্য পরাজিত জাতির তালিকা থেকে উঠে এসে নাম লেখায় বিজয়ীর আসনে। তবে প্রতিশোধস্পৃহা নয়, সাইরাস বেছে নিলেন সংযম ও ক্ষমার পথ। তিনি অ্যাস্টিয়াজেসকে রাজকীয় সম্মানে অবসর দেন, একবাতানাকে গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হিসেবে রেখে দেন। মিডিয়ান অভিজাতদের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত করেন। তবে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে তিনি অ্যাস্টিয়াজেসের জামাতা ও নাতিদের হত্যা করেন।

পারস্যের উত্থানে উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠেন লিডিয়ার রাজা ক্রোসাস, যাঁর রাজ্য বর্তমান তুরস্কের পশ্চিমাংশজুড়ে বিস্তৃত ছিল। পারস্যের সম্ভাব্য আগ্রাসন ঠেকাতে ক্রোসাস ডেলফির গ্রিক ওরাকলের শরণাপন্ন হন। দেবতার দূত তাঁকে জানান, “যদি ক্রোসাস যুদ্ধ করেন, তবে একটি মহান সাম্রাজ্যের পতন ঘটবে।”

এই ভবিষ্যদ্বাণীকে আত্মবিশ্বাসে পরিণত করে খ্রি.পূ. ৫৪৭ অব্দে ক্রোসাস বিশাল এক বাহিনী নিয়ে পারস্য আক্রমণ করেন। যুদ্ধের শুরুতে নির্ণায়ক ফল না এলেও সাইরাস হঠাৎ শীতের মধ্যে লিডিয়ানদের পিছু ধাওয়ার পর তাদের রাজধানী সার্দিস অবরোধ করেন।

চূড়ান্ত যুদ্ধে পারস্য বাহিনী ছিল সংখ্যায় অল্প। তখন মিডিয়ান জেনারেল হরপাগাস সৈন্যদের উটের পিঠে বসিয়ে সামনের সারিতে রাখেন। উটের গন্ধে লিডিয়ান ঘোড়ার দল ভীত হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়। পরাজিত লিডিয়ানরা শেষমেশ সার্দিসে আত্মসমর্পণ করে। ডেলফির ওরাকল ভবিষ্যদ্বাণী ঠিকই হয়েছিল। একটি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, তবে তা ছিল ক্রোসাসের নিজের সাম্রাজ্য।

মিডিয়ানদের মতো লিডিয়ানদের প্রতিও সাইরাস গ্রহণ করেন উদারপন্থা নীতি। তিনি সার্দিসের কোষাগার সংরক্ষণ করেন, ক্রোসাসকে নিজ দরবারে স্থান দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি, ধর্ম ও আইন বজায় রাখার অনুমতি দেন। ফলে অধীনস্থ জনগণের আস্থা অর্জন করতে তার বেশি সময় লাগেনি।

তবে এই সহনশীলতা ছিল শর্তসাপেক্ষ। লিডিয়ার কোষাগার প্রহরীদের বিদ্রোহের পর সাইরাস বিদ্রোহীদের মৃত্যুদণ্ড দেন। সাইরাসের সেনাপতি হরপাগাস এরপর আয়োনিয়ার গ্রিক বসতিগুলো দখল করলে অনেকে বাধ্য হয়ে ইতালিতে পালিয়ে যায়।

পারস্য সাম্রাজ্যের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সামরিক শক্তিও হয়ে ওঠে ভয়ংকর। সাইরাস দ্য গ্রেট গড়ে তোলেন এক অভিজাত অশ্বারোহী বাহিনী, যারা ঘোড়ার পিঠে বসেই তীর ছুড়তে পারত। তারা ব্যবহার করতেন যুদ্ধরথ, যাদের চাকায় লাগানো থাকত ধারালো ব্লেড। তার সেনারা ছিল দুর্দান্তভাবে প্রশিক্ষিত ও দারুণ মনোবলে উজ্জীবিত। শীতকালে শত্রুর কল্পনার চেয়েও দ্রুত অগ্রসর হতে পারত তারা। পূর্ব দিকের অঞ্চলগুলো দখলের পর সাইরাস দৃষ্টি দেন পশ্চিম এশিয়ার নব্য-বাবিলীয় সাম্রাজ্যের দিকে।

খ্রি.পূ. ৫৩৯ অব্দে পারস্য বাহিনী আক্রমণ চালায় সমৃদ্ধ ও উর্বর নব্য-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যে। টাইগ্রিস নদীর তীরে অবস্থিত ওপিস জয় করার মাধ্যমে পারসিকরা ব্যাবিলনীয় সেনাদের পরাস্ত করে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তারা পৌঁছে যায় প্রাচীন বিশ্বের বৃহত্তম নগরী ব্যাবিলনের দ্বারপ্রান্তে। কোনো রক্তপাত ছাড়াই শহরটি দখল করে নেয় পারস্য বাহিনী।

ব্যাবিল জয় করার পরপরই সাইরাস মুক্তি দেন বন্দি থাকা ইহুদিদের। প্রায় ৫০ বছর আগে তাদেরকে রাজা নেবুচাঁদনেজার দ্বিতীয় বন্দি করে নিয়ে এসেছিলেন ব্যাবিলে। বন্দিত্ব থেকে মুক্ত পেয়ে অনেকেই ফিরে যান জেরুজালেমে, তাঁদের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক জন্মভূমিতে।

ব্যাবিল বিজয়ের মধ্য দিয়ে এজিয়ান সাগর থেকে শুরু করে দূর প্রাচ্যের সিন্ধু নদ পর্যন্ত পারস্য সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটে। এমন এক সুবিশাল সাম্রাজ্য তখনকার প্রাচীন জগতে কল্পনারও অতীত ছিল। সাইরাস সিলিন্ডারে সাইরাস নিজেই ঘোষণা করেন, “আমি সাইরাস, মহাবিশ্বের রাজা।”

সাইরাসের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট তথ্য ইতিহাসে অনুপস্থিত। ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৫২৯ সালের দিকে সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তে এক যুদ্ধাভিযানে আহত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃতদেহ ফিরিয়ে আনা হয় পাসারগাদে। ওখানে সূর্যোদয়ের দিকে মুখ করে নির্মিত একটি বিশাল পাথরের সমাধি, তাঁর চিরনিদ্রার আশ্রয় হয়ে ওঠে।

সাইরাসের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন তাঁর পুত্র দ্বিতীয় ক্যাম্বাইসেস। পিতার উত্তরাধিকার ধরে রেখে তিনি পারস্য সাম্রাজ্যের পরিসর আরও বাড়িয়ে দেন, জয় করেন প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতাও। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে পারস্য সাম্রাজ্য ছিল সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল। শেষমেশ খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০ অব্দে, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সেনাবাহিনীর হাতে তাদের পতন ঘটে।

তথ্যসূত্র

১। Cyrus the Great | Biography & Facts – Britannica

২। Cyrus the Great and the Persian Empire | EBSCO Research Starters

৩। Cyrus The Great: The Architect Of The Persian Empire

৪। The Story of Cyrus the Great: How an Exile Built the Greatest Empire

৫। Who was Cyrus the Great? – National Geographic

৬। How Cyrus the Great Turned Ancient Persia Into a Superpower

This post was viewed: 22

আরো পড়ুন