লম্বা সময় ব্রিটিশ রাজপরিবারের নেতৃত্ব ছিল রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের হাতে। বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর রাজপরিবারের রানির মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন এলিজাবেথের ছেলে তৃতীয় চার্লস। ব্রিটেনের ৪০তম রাজা হিসেবে ক্ষমতায় আছেন তিনি। প্রশ্ন হচ্ছে, রাজাদের আসলে কাজ কী? আগের মতো ক্ষমতা কি আছে তাদের?
সোনালি অতীত পেরিয়ে…
একটা সময় ব্রিটিশ রাজাদের দোর্দন্ড প্রতাপ থাকলেও এখন পদটি কেবলই সম্মানের। যাদের কথায় চলত বিশ্ব, তাদের এখন রাজ সিংহাসন অলঙ্কার করা ছাড়া তেমন প্রতাপ নেই বললেই চলে। রাজাদের ক্ষমতা সীমিত হয়ে আসছে ক্রমেই। যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপ্রধান হলেও রাজার বেশিরভাগ ক্ষমতাই আসলে প্রতীকী। সীমাবদ্ধ থাকে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে। মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকেন তারা। সেইসব সোনালি দিন অতীত হয়েছে, যখন আক্ষরিক অর্থেই তাদের কথাই ছিল শেষ কথা।
তাই বলে রাজারা বেকার?
অতি কৌতূহলী হয়ে কেউ জিজ্ঞেস করতে পারেন, তাহলে শুধু শুধু কেন তারাই সবার ওপরে? যদি একেবারেই কোনো কাজ না থাকে, তারা আসলে করেন কী? রাজ সিংহাসনে বসে যে ব্যস্ত সময় পার করেন, তা ফলপ্রসূ তো! চলুন সেসব নিয়ে কৌতূহল মেটানো যাক…
ব্রিটিশ রাজাদের আসলে যেসব কাজ করতে হয়
সবার আগে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাজা স্টেট ওপেনিং সেরেমনির মাধ্যমে পার্লামেন্টারি বছর শুরু করেন। অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে তিনি সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। হাউজ অব লর্ডসের সিংহাসন থেকে এই ভাষণ দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে প্রতিদিন রাজার কাছে বিভিন্ন নথিপত্র আসে। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাজার কাছে একটি লাল চামড়ায় মোড়া বাক্সে দৈনন্দিন কাজের ফিরিস্তি ও নথিপত্র আসে, যার মধ্যে থাকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভার সারসংক্ষেপ। কিছু কিছু কাগজপত্র আসে, যেগুলো পাঠানো হয় রাজার স্বাক্ষরের জন্য। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বুধবারের রুটিন হলো, বাকিংহ্যাম প্যালেসে রাজার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া। বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে রাজাকে অবগত করেন প্রধানমন্ত্রী। খুব গোপনীয় ও ব্যক্তিগত এসব বৈঠকের কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড রাখা হয় না।
কমনওয়েলথের নেতৃত্ব
যুক্তরাজ্যের রাজার বড় দায়িত্ব হচ্ছে কমনওয়েলথের নেতৃত্ব দেওয়া। এক সময়ের ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে শাসিত বিশ্বের ৫৬টি স্বাধীন দেশের জোট হচ্ছে কমনওয়েলথ। যেখানে পৃথিবীর প্রায় ২৫০ কোটি মানুষের আবাসস্থল। পদাধিকার বলে এই কমনওয়েলথের প্রধান হন ব্রিটিশ রাজারা। এর বাইরে আরও ১৪টি দেশ ও অঞ্চলের রাষ্ট্রপ্রধান হন রাজা, সেসব দেশ ও অঞ্চলগুলো ‘কমওয়েলথ রেমস’ নামে পরিচিত। নিয়ম করে রাজা ৪৫ থেকে ৫৬টি দেশে ভিজিট করেন। কখনও কখনও কোনো দেশে একাধিকবার সফরে যান।
সংসদে রাজার ভূমিকা
সংসদের জন্য রাজাকে বেশকিছু আনুষ্ঠানিক ভূমিকা পালন করতে হয়। যা ভীষণ বিচক্ষণতার সঙ্গে করতে হয়। একটু বলি, বুঝতে সুবিধা হবে। রাজার অন্যতম প্রধান কাজ সরকার নিযুক্ত করা। যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলের দলনেতাকে বাকিংহ্যাম প্রাসাদে ডাকা হয়। আমন্ত্রণ জানানো হয় সরকার গঠন করতে। সাধারণ নির্বাচনের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার ভাঙার কাজটিও রাজাকেই করতে হয়। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে কোনো বিধি পাস করার পর তা আইনে পরিণত হতে হলে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজার অনুমোদন নিতে হয়। রাজার অনুমোদন ছাড়া সেসব কার্যকর হতে পারে না।
ঐতিহ্যের ঝাণ্ডবাহক
নাক উঁচু ব্রিটিশদের আছে ঐতিহ্যবাহী কৃষ্টি। প্রতি বছরের নভেম্বরে বার্ষিক স্মরণ বা রিমেমব্রান্স অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দিতে হয় রাজাকে। এটি অনুষ্ঠিত হয় লন্ডনের সেনোটাফ বা জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভে। এটি ব্রিটিশদের একটি ঐতিহ্যবহনকারী কালচার। যার সূচনা হয় রাজার হাত ধরে। এখানেও রাজা ছাড়া অচল ব্রিটিশরা।
কূটনৈতিক কলাকৌশল
সংসদ নির্বাচন, কমনওয়েলথ ভুক্ত দেশে ভ্রমণ তো আছেই। আছে রাষ্ট্রের গুরুতপূর্ণ বিষয়ে অনুমোদন দেওয়া। এসবের বাইরে রাজার আরেকটি মহাগুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। যেটি মূলত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মজবুত করতে সহায়তা করে। ব্রিটেনে সফররত রাষ্ট্রপ্রধানদের আতিথেয়তার দায়িত্বটিও রাজার ওপর বর্তায়। যুক্তরাজ্যে নিয়োজিত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করেন রাজা। কূটনৈতিক সেসব মিটিংয়ে আসে অনেক সিদ্ধান্দ এবং ভবিষ্যতের করণীয়।
তাই বাকিংহাম প্যালেসে বসে রাজারা কেবল আদেশ দিয়ে বেড়ান, এমনটি ভাবা বোকামি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিতে এসেছে পরিবর্তন। তবু, কিছু জিনিসে পুরোনো সুপ্রিমেসির ছোঁয়া চাই-ই চাই। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, ব্রিটেনের মানুষ রাজতন্ত্রে এখনও ভরসা রাখতে চান। ২০২৩ সালে বিবিসির প্রতিবেদনে প্রকাশিত একটি জরিপে দেখা যায়, দেশটির প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষই রাজতন্ত্রের পক্ষে। আর ২৬ শতাংশের ভাবনা, নির্বাচিত সরকার। যদিও, এখন পর্যন্ত তা ধোপে টেকেনি।