গুটি বসন্ত বা স্মল পক্স ছিল খুবই ভয়াবহ ছোঁয়াচে একটা রোগ। হ্যাঁ, রোগটা ছিল কারণ, এটাই একমাত্র রোগ, যেটা বিশ্ব থেকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। প্রাচীন মিশরের ফেরাউনদের মমিতে গুটি বসন্তের মতো র্যাশ দেখা যাওয়ায় ধারণা করা হয় রোগটি অন্তত ৩,০০০ বছরের পুরোনো।
রোগটা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, এতে আক্রান্ত রোগীর ৩০ শতাংশেরই মৃত্যু হতো। কোভিডের সাথে যদি তুলনা করা হয়, সেখানে আক্রান্ত রোগীর মাত্র ০.৭ শতাংশ মৃত্যু হয়েছে। শুধুমাত্র বিংশ শতাব্দীতেই ৩০ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয়ে। দুই বিশ্বযুদ্ধ মিলিয়েও এত মানুষের মৃত্যু হয়নি। সে জায়গায় ১৯৮০ সালের ৮ মে একে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এটা নিঃসন্দেহে জনস্বাস্থ্য খাতের একটা বড় সাফল্য।
গুটি বসন্ত বা স্মল পক্স রোগটি ছড়ায় ভেরিওলা (Variola) ভাইরাসের দুটি স্ট্রেইন দিয়ে; একটি হচ্ছে ভেরিওলা মেজর এবং অন্যটি ভেরিওলা মাইনর। ভেরিওলা মেজরই ছিল বেশি মারাত্মক। এই স্ট্রেইনে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুহার ছিল ৩০ শতাংশ; এক বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ছিল আরো বেশি। সে তুলনায় ভেরিওলা মাইনর কিছুটা দুর্বল ভাইরাস ছিল। এর মৃত্যুহার ছিল ১ শতাংশ।
গুটি বসন্ত ভাইরাস ছড়াত আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে সংস্পর্শে লম্বা সময় ধরে থাকলে। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, কফ, নাকের সর্দি থেকেও ছড়াত। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে জ্বর আর র্যাশ দেখা যেত। সাধারণত ৮-১৬ দিনের মধ্যে মৃত্যু হতো। যারা প্রাণে বেঁচে যেত, তাদের সারা শরীরে ক্ষতগুলো চিরস্থায়ী হয়ে যেত। কিছু ক্ষেত্রে রোগটা চোখেও ছড়িয়ে পড়ত, সেখান থেকে অনেকে অন্ধত্ব নিয়ে বাকি জীবন কাটাত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গুটিবসন্তে আক্রান্ত জীবিতদের ৬৫ থেকে ৮০ শতাংশের ক্ষত চিরস্থায়ীভাবে থেকে যেত। ৫ থেকে ৯ শতাংশের চোখে জটিলতা বা অন্ধত্ব দেখা যেত।
এত ভয়ঙ্কর একটা রোগ থেকে তাহলে মানুষ কীভাবে নিজেদের রক্ষা করত? এক্ষেত্রে মধ্যযুগের মানুষরা সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছিল। তখন মানুষ এটা জানত যে, গুটি বসন্তে একবার আক্রান্ত হয়ে জীবিত থাকলে আর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। চীনে পঞ্চদশ শতাব্দীর দিকে সুস্থ মানুষরা আক্রান্ত মানুষের চামড়ার র্যাশের কাছে নাক নিয়ে শ্বাস নিত, যেন ভাইরাস তাদের দেহে প্রবেশ করে। তারা তুলনামূলক মৃদু মাত্রার আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে যেত। একে বলা হতো variolation। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ০.৫ থেকে ২ শতাংশ মৃত্যু হতো। যেখানে রোগে আক্রান্ত হলে ৩০ শতাংশ মৃত্যুহার ছিল, সেখানে variolation প্রক্রিয়া অনেকখানিই সেটা কমিয়ে আনে। তবে এই প্রক্রিয়ার নিশ্চিতভাবেই অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল।
১৭৯৬ সালে ইংরেজ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার লক্ষ করলেন, গোয়ালিনীরা যারা আগে Cowpox রোগে আক্রান্ত ছিল (এই ভাইরাসটা variola ভাইরাসের সাথেই সম্পর্কিত ছিল, তবে কম ক্ষতিকর), তারা গুটি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে না। তিনি variolation সম্পর্কে জানতেন। সেখান থেকে তিনি ধারণা করলেন, cowpox এর ভাইরাসের সাথে যদি আগেই মানুষকে সংস্পর্শে আনা যায়, তাহলে হয়তো তারা গুটি বসন্ত থেকে নিরাপদ থাকবে।
জেনার তখন সারাহ নেলমস নামে cowpox রোগে আক্রান্ত এক গোয়ালিনীর হাতের ক্ষত থেকে জীবাণু নিয়ে তার বাগানের মালির ৮ বছর বয়সের ছেলে জেমস ফিপসের বাহুর সংস্পর্শে আনেন। এরপর কয়েক মাস ধরে তিনি একাধিকবার ফিপসকে variola ভাইরাসের সংস্পর্শে আনেন। কিন্তু ফিপস কখনো গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয়নি। এরপর আরো গবেষণা চালানোর পর ১৮০১ সালে জেনার ভ্যাকসিনের প্রস্তাবনা করেন। এই ভ্যাকসিন ব্যাপকভাবে গৃহীত হয় এবং ধীরে ধীরে variolation প্রক্রিয়ার অবসান ঘটে। আঠারো শতাব্দীর দিকে cowpox থেকে vaccinia ভাইরাস দিয়ে ভ্যাকসিন বানানো শুরু হয়।
১৯৫৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গুটি বসন্ত নির্মূলের প্রকল্প শুরু করে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, পর্যাপ্ত অনুদান আর বৈশ্বিক অঙ্গীকারের অভাব থাকায় সেই প্রকল্প সফল হয়নি। ১৯৬৭ সালে পুনরায় জোরালোভাবে ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়। তখন বৈশ্বিকভাবেই ভ্যাকসিন গবেষণা ও উন্নয়ন, আক্রান্ত রোগীদের সার্ভেইল্যান্স আর ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রথমে শনাক্ত করে বিচ্ছিন্ন করা হতো এবং তার সাথে সংস্পর্শে আসা সকলের খোঁজ নেওয়া হতো। এমনকি সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিরাও কাদের সংস্পর্শে আসত, তাদের খোঁজ নেওয়া হতো। এদের সকলকেই ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হতো।
এতে করে সত্তরের দশকে গুটি বসন্তে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা একেবারেই কমে আসে। সর্বশেষ ভেরিওলা মেজর ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী ছিল ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের তিন বছর বয়সী রহিমা বানু। ভেরিওলা মাইনরে আক্রান্ত সর্বশেষ রোগী ছিল সোমালিয়ায়। ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে গুটি বসন্তকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে প্রাকৃতিকভাবে কোনো গুটি বসন্তের রোগী দেখা যায়নি।
রোগ নির্মূল হওয়ার পর গবেষণার প্রয়োজনে বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে দুই জায়গায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে গুটি বসন্তের ভাইরাস রাখা আছে। একটি যুক্তরাষ্ট্রের CDC তে এবং অন্যটি রাশিয়ার VECTOR ইন্সটিটিউটে।