Ridge Bangla

মোগল আমলে বাংলার অর্থনীতি

ভারতের ইতিহাসে মোগল যুগকে বলা হয় স্বর্ণযুগ। আর এই স্বর্ণযুগে বাংলার অবস্থান ছিল মুকুটে শোভা পাওয়া জ্বলজ্বলে এক রত্নের মতো। ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে বাংলা ছিল উপমহাদেশের অন্যতম ধনী প্রদেশ। উর্বর ভূমি, সমৃদ্ধ কৃষি, রেশম ও মসলিনের মতো বিশ্বখ্যাত পণ্য সবমিলিয়ে বাংলা হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত অর্থনৈতিক জগৎ।         

বাংলায় মোগল বিজয়ের সূত্রপাত ঘটে সম্রাট হুমায়ুনের আমলে। ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি গৌড় অধিকার করে এর মনোরম সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে নাম রাখেন ‘জান্নাতাবাদ’। পরবর্তীতে ১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবরের সেনাপতি খান-ই-জাহান, কররানী বংশের শেষ শাসক দাউদ খান কররানীকে রাজমহলের যুদ্ধে পরাজিত করলে বাংলায় মোগল শাসনের ভিত্তি দৃঢ় হয়। এরপর বাংলাকে মোগল সাম্রাজ্যের একটি সুবাহ বা প্রদেশ ঘোষণা করা হয়, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা। আকবরের সময়েই মোগল শাসনের সূচনা ঘটলেও, সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সমগ্র বাংলায় মোগল আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।        

মোগল আমলে সুবাহ বাংলায় দীর্ঘ সময় ধরে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করেছিল। এই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। দেশের ভেতরে নিরাপদ পরিবেশ ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্প, সব ক্ষেত্রেই দ্রুত উন্নতি সাধিত হয়। বাংলার সঙ্গে উত্তর ভারত, মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। পাশাপাশি ইউরোপীয় বণিকদের আগমন বাংলার সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। ইউরোপীয়দের মাধ্যমে বাংলার পণ্য দূর-দূরান্তে রপ্তানি হতে থাকে। ফলে বাংলায় বিপুল অর্থ প্রবাহিত হয়। 

বাংলা ছিল মূলত কৃষিনির্ভর দেশ। মোগল আমলে বাংলার সমৃদ্ধির মূল উৎস ছিল কৃষি। নদীমাতৃক ভূ-প্রকৃতি ও উর্বর পলিমাটিতে ভরপুর বাংলার বিশাল সমতল ভূমি কৃষির জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল। এখানকার কৃষকরা বছরে একাধিক ফসল ফলাত। প্রচুর পরিমাণে ধান উৎপন্ন হতো, যা দেশের চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত অংশ উত্তর ও দক্ষিণ ভারত, এমনকি সিংহল (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) পর্যন্ত রপ্তানি করা হতো। ধানের পাশাপাশি বাংলায় গমও চাষ হতো, যা ভারত মহাসাগরীয় বিভিন্ন দ্বীপে রপ্তানি করা হতো।          

বাংলায় উৎপাদিত রবিশস্যের মধ্যে ডাল, পেঁয়াজ, মরিচ, হলুদ, সরিষা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, নারকেলসহ নানা ফল-মূল প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হতো। বাংলার মরিচ, আদা ও হলুদের বিশেষ সুনাম ছিল। এগুলো এশিয়ার বহু দেশে রপ্তানি করা হতো।

বাংলার আখ চাষও অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। এখানকার আখের রস থেকে উৎকৃষ্টমানের গুড় ও চিনি তৈরি করা হতো। এসব শুধু ভারতেই নয়, আরব, ইরান ও ইরাক পর্যন্ত তা রপ্তানি করা হত। বাংলার পাট ছিল অতি উন্নতমানের। এ পাট থেকে তৈরি দড়ি, বস্তা ও অন্যান্য পাটজাত দ্রব্য বিদেশে বিপুল চাহিদা লাভ করেছিল।

মোগল আমলে বাংলায় নীলচাষও ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। বাংলার নীল রং তার গুণমানের জন্য বিদেশে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল। একই সময়ে উন্নত মানের তুলা বা কার্পাস উৎপন্ন হতো, যা অনেক সময় সুরাট বা এমনকি মিশরের তুলার চেয়েও ভালো মানের ছিল বলে সমকালীন সূত্রে জানা যায়।

মোগল যুগে বাংলার অর্থনীতির আরেক প্রধান ভিত্তি ছিল শিল্প ও কারুশিল্প। এ সময় বড়ো কোনো ভারী শিল্প গড়ে না উঠলেও গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প সমৃদ্ধি লাভ করে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতনামা ছিল বস্ত্র শিল্প। বিশেষ করে ঢাকার মসলিনের সূক্ষ্মতা, মিহি গঠন ও দৃষ্টিনন্দন নকশার জন্য দেশ-বিদেশে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছিল। রাজপরিবারের সদস্য ও ধনী অভিজাতরা ছিলেন এই বিলাসবহুল বস্ত্রের প্রধান ক্রেতা। মসলিনের মান ও বুননভেদে নানা নাম প্রচলিত ছিল। যেমন, মখমল, জামদানি, আবরোয়ান, নয়নসুখ, বদনখাস প্রভৃতি।

বস্ত্র শিল্পের পাশাপাশি রেশম শিল্পও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। নবাব ও সুবাহদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশীয় তাঁতিরা উৎকৃষ্টমানের রেশম বস্ত্র তৈরি করতেন। কাশিমবাজারে ওলন্দাজদের বিশাল রেশম কারখানাও ছিল, যেখানে স্থানীয় তাঁতিরা কর্মরত ছিলেন। সাধারণ মানুষের জন্য তুলনামূলক সস্তা মোটা কাপড়ও তৈরি হতো।

মোগল যুগে বাংলার বাণিজ্যিক কার্যক্রম ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বহুমুখী। স্থল ও জল—দুই পথেই বাংলার সঙ্গে উত্তর ভারত ও ইরানের ব্যাবসায়িক সম্পর্ক ছিল দৃঢ়। বাংলার বাণিজ্যের মূল দিক ছিল রপ্তানি। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কার্পাস ও রেশমি বস্ত্র, চিনি, চাউল, ঘি, তেল, চন্দন কাঠ, আফিম, মরিচ, আদা, পাটজাত দ্রব্য, ফলমূল ও পান-সুপারি। অন্যদিকে, আমদানি বাণিজ্য ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। গুজরাট থেকে তুলা, চীন থেকে কাঁচা রেশম, ইরান থেকে সুগন্ধি ও গালিচা, এবং আফ্রিকা থেকে দাস আমদানি করা হতো। বিদেশি বণিকেরা বাংলার পণ্য কিনতে মূল্যবান পাথর, সোনা ও রুপা নিয়ে আসত।

বাণিজ্যের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় ব্যাংকিং প্রথারও উন্নতি ঘটে। নবাবি আমলে জগৎশেঠ পরিবার এ খাতে শীর্ষস্থান দখল করে। তাঁদের পাশাপাশি আরও অনেক শেঠ, মহাজন ও সাহু হুন্ডির মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করতেন। হুন্ডি ছিল এক ধরনের প্রাচীন ব্যাংকিং পদ্ধতি, যা আজকের চেক ব্যবস্থার পূর্বসূরি বলা যেতে পারে। হুন্ডির মাধ্যমে নগদ অর্থ স্থানান্তর করা যেত। দিল্লিতে খাজনা পরিশোধ ও বিদেশি লেনদেনেও এর ব্যবহার হতো।

সামসময়িক ইউরোপীয় পর্যটকদের বিবরণে জানা যায়, শায়েস্তা খানের আমলে এক টাকায় আট মন চাউল পাওয়া যেত। মুর্শিদাবাদে এক টাকায় তিন মন উৎকৃষ্ট গম বা দশ সের ঘি কেনা যেত, যা বাংলার অর্থনৈতিক সচ্ছলতার স্পষ্ট প্রমাণ।

সাধারণ মানুষও তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনযাপন করত। অল্প জনসংখ্যা ও অধিক পরিমাণে জমি থাকায় কৃষকরা পর্যাপ্ত ফসল ফলাতে পারত। তবে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে কৃষকদের কষ্ট ভোগ করতে হতো। নগদ অর্থের অভাবে তারা প্রায়ই মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিত, যার চড়া সুদের কারণে তারা অনেক সময় সর্বস্বান্ত হয়ে যেত।

সব মিলিয়ে, মোগল আমলে বাংলা ছিল কৃষি, বাণিজ্য ও কারুশিল্পনির্ভর এক সমৃদ্ধ অর্থনীতির কেন্দ্র, যেখানে উৎপাদন, রপ্তানি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করত।

তথ্যসূত্র
  1. ইতিহাস, ১ম পত্র, উপমহাদেশের ইতিহাস, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
  2. বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি।
  3. Land of Two Rivers: A History of Bengal from the Mahabharata to Mujib, Sengupta, Nitish K. (২০১১)
  4. Bengal: The Unique State, J. N. Nanda, Concept Publishing Company, 2005
This post was viewed: 47

আরো পড়ুন