২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা প্রদেশের রাজধানী অ্যাঙ্করেজে অবস্থিত মার্কিন সশস্ত্রবাহিনীর ঘাঁটি জয়েন্ট বেস এলমেনডর্ফ-রিচার্ডসনে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে একটি সামিট অনুষ্ঠিত হয়। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথমবারের মতো রুশ রাষ্ট্রপতি পুতিন পশ্চিমা বিশ্বের কোনো রাষ্ট্র সফর করলেন। উক্ত সফরের মূল আলোচ্য বিষয়বস্তু ছিল প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে চলমান রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধের অবসান ঘটানো। কিন্তু উক্ত সামিটে মার্কিন ও রুশ নেতৃবৃন্দ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি, এবং সামিটটিতে উভয় পক্ষ কী আলোচনা করেছে, সেটিও ওয়াশিংটন বা মস্কো কেউই স্পষ্ট করেনি।
সামিটটি অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে সামিটে আলোচিত বিষয়বস্তু নিয়ে নানা ধরনের জল্পনাকল্পনা চলছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্তা ‘রয়টার্স’-এর ভাষ্য অনুসারে, যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য রাশিয়া বেশ কয়েকটি শর্ত দিয়েছে।
রাশিয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে, ইউক্রেনকে দনেৎস্ক ও লুগানস্ক থেকে সম্পূর্ণরূপে সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে। বিনিময়ে রাশিয়া খারকভ ও সুমি অঞ্চলে অধিকৃত ভূখণ্ড ইউক্রেনের কাছে প্রত্যর্পণ করবে। খেরসন ও জাপোরোঝিয়ে অঞ্চলের রুশ-অধিকৃত ও ইউক্রেনীয়-নিয়ন্ত্রিত অংশ যথাক্রমে রাশিয়া ও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
উল্লেখ্য, রাশিয়া ২০১৪ সালের মার্চে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া অধিকার করে নিয়েছে এবং ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ইউক্রেনের দনেৎস্ক, লুগানস্ক, খেরসন ও জাপোরোঝিয়ে অঞ্চলগুলোকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। বর্তমানে ক্রিমিয়ার সম্পূর্ণ অংশ, দনবাস অঞ্চলের (দনেৎস্ক ও লুগানস্ক) প্রায় ৮৮% এবং খেরসন ও জাপোরোঝিয়ের প্রায় ৭৫% রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তদুপরি, রুশরা খারকভ ও সুমি অঞ্চলের প্রায় ৪০০ বর্গ কি.মি. ভূখণ্ড এবং দনেপ্রোপেত্রোভস্ক ও নিকোলায়েভ অঞ্চলের অল্প কিছু ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে। সামগ্রিকভাবে, রাশিয়া ইউক্রেনের ২০১৪-পূর্ববর্তী ভূখণ্ডের প্রায় ২০% (১,১৪,৫০০ বর্গ কি.মি.) অধিকার করেছে।
রুশ প্রস্তাব অনুসারে, ইউক্রেন যদি দনবাসের ইউক্রেনীয়-অধিকৃত ১২% ভূখণ্ড (প্রায় ৬,০০০ বর্গ কি.মি.) রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করে, সেক্ষেত্রে রাশিয়া খারকভ ও সুমি অঞ্চলে অধিকৃত ৪০০ বর্গ কি.মি. ভূখণ্ড ইউক্রেনকে ফিরিয়ে দিবে এবং খেরসন ও জাপোরোঝিয়ে অঞ্চলের যে ২৫% ভূখণ্ড ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেটি দখলের জন্য রাশিয়া আক্রমণ চালাবে না। দনবাসের ইউক্রেনীয়-নিয়ন্ত্রিত অংশে ইউক্রেন বিগত এক দশকে অত্যন্ত বিস্তৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং ইউক্রেন যদি উক্ত ভূখণ্ড রাশিয়ার নিকট সমর্পণ করে, সেটি রাশিয়ার জন্য একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
রাশিয়ার দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে, ক্রিমিয়াকে রুশ ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
রাশিয়া ইউক্রেনের কাছ থেকে পাঁচটি অঞ্চলের সম্পূর্ণ অংশ বা অংশবিশেষ অধিকার করেছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো পশ্চিমা রাষ্ট্র উক্ত অঞ্চলগুলোকে রুশ ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ক্রিমিয়াকে রুশ ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দিলে এটি রাশিয়ার জন্য একটি কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
রাশিয়ার তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, যুদ্ধ বন্ধের পর রাশিয়ার উপর আরোপিত বিস্তৃত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার অন্তত একাংশ প্রত্যাহার করে নিতে হবে।
২০১৪ সালের ইউক্রেনীয় সঙ্কটের পর এবং বিশেষত ২০২২ সালে রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার উপর অন্তত ২৫,৬৯১টি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর ফলে রাশিয়ার বৈদেশিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং রুশ অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে গেন্নাদি তিমচেঙ্কো ও সুলেইমান কেরিমভের মতো রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী রুশ ধনকুবেররা ব্যাপক আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার অন্তত একাংশের প্রত্যাহারও রাশিয়ার জন্য লাভজনক হবে।
রাশিয়ার চতুর্থ শর্ত হচ্ছে, ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হতে পারবে না, কিন্তু ইউক্রেনকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া হবে।
রুশ দৃষ্টিকোণ থেকে, ইউক্রেনের ন্যাটোয় যোগদানের সম্ভাবনা ছিল রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ শুরুর মূল কারণ। সুতরাং ইউক্রেনের ন্যাটোয় যোগদান বা ইউক্রেনের ভূখণ্ডে বিদেশি সৈন্য মোতায়েন রাশিয়ার নিকট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অবশ্য রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের ভাষ্যমতে, ইউক্রেনের ন্যাটোয় যোগদান থেকে বিরত থাকার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া সম্মিলিতভাবে ইউক্রেনকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে।
রাশিয়ার পঞ্চম শর্ত হচ্ছে, রুশ ভাষাকে ইউক্রেনের সম্পূর্ণ অংশ জুড়ে বা অংশবিশেষে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
১৯৯১ সালে ইউক্রেন স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ইউক্রেনীয় ভাষা রাষ্ট্রটির একমাত্র সরকারি ভাষা, কিন্তু ইউক্রেনীয় সংবিধানে রুশ ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। ২০১৯ সালে ইউক্রেনে গৃহীত নতুন ভাষা আইন অনুসারে রুশ ভাষার সাংবিধানিক সুরক্ষাকে বাতিল করা হয়। ইউক্রেনের জনসাধারণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশেষত পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনের জনসাধারণের সিংহভাগ, রুশভাষী এবং যুদ্ধের আগে থেকেই রাশিয়া ইউক্রেনে রুশভাষীদের অধিকার রক্ষার দাবি জানিয়ে আসছে।
রাশিয়ার সর্বশেষ শর্ত হচ্ছে, ইউক্রেনে রুশ অর্থোডক্স চার্চকে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার অধিকার দিতে হবে।
ঐতিহাসিকভাবে, ইউক্রেনীয় জনসাধারণের প্রায় ৭২.৭% অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্মের অনুসারী। অতীতে তারা রুশ অর্থোডক্স চার্চের অধীনস্থ ইউক্রেনীয় অর্থোডক্স চার্চের অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু ইউক্রেনের উপর রুশ প্রভাব খর্ব করার উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালে ‘অর্থোডক্স চার্চ অফ ইউক্রেন’ নামে অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্মের আরেকটি ধারার প্রবর্তন করা হয়। ২০২৪ সালে ইউক্রেনীয় সরকার রুশ অর্থোডক্স চার্চকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। রাশিয়া একে রুশ ধর্ম ও সংস্কৃতির উপর একটি বড় আঘাত হিসেবে বিবেচনা করে এবং এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য ইউক্রেনকে চাপ দিচ্ছে।
অবশ্য ইউক্রেন রাশিয়ার কোনো শর্তেই রাজি হয়নি। ইউক্রেন দনবাসের অবশিষ্ট ৬,০০০ বর্গ কি.মি. ভূখণ্ড রাশিয়াকে ছেড়ে দিতে কিংবা রুশ ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিতে নারাজ। বরং তারা পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক রাশিয়ার কাছ থেকে জব্দ করা ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ হিসেবে চাচ্ছে এবং ইউরোপীয় অর্থায়নে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের আগ্রহ ব্যক্ত করেছে।
সুতরাং, আলাস্কা সামিটের ফলে রুশ–ইউক্রেনীয় যুদ্ধ সহসাই বন্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।