একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য রাজনৈতিক সহনশীলতা ও নাগরিক নিরাপত্তা অপরিহার্য। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখনো সহিংসতার ছায়া প্রবল। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) বছরের প্রথম তিন মাসের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে জনজীবনে বাড়ছে অস্থিরতা।
বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা রীতিমতো আতঙ্কজনক। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রথম তিন মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৩৬ জন নিহত এবং ৪ হাজার ৭৮ জন আহত হয়েছেন। প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে ২৮ জন বিএনপির, চারজন জামায়াতের এবং একজন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কর্মী।
এই সময়ের মোট ৬১০টি সহিংসতার ঘটনার মধ্যে ৫৭৩টিই ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিংবা অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিরোধের জেরে। আধিপত্য বিস্তার, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রেষারেষি এবং সভা-সমাবেশকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
এদিকে, গত তিন মাসে রাজনৈতিক মামলায় কমপক্ষে ৮৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪৩৬ জন, বিএনপির ৩১৪ জন, জামায়াতের ৭৬ জন এবং এনসিপির ১৭ জন কর্মী রয়েছেন। এছাড়া যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে আরও ছয় শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের বড় অংশই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী।
মুক্ত গণমাধ্যম গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হলেও গত তিন মাসে সংবাদকর্মীদের ওপরও নেমে এসেছে নির্যাতনের খড়গ। ৮২টি পৃথক হামলায় ১৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে, সমাজে ‘মব ভায়োলেন্স’ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের চিত্রই ধরে রেখেছে। চুরি, ডাকাতি কিংবা ধর্মীয় অবমাননার মতো বিভিন্ন অভিযোগে ৮৮টি ঘটনায় ৪৯ জন নিহত ও ৮০ জন আহত হয়েছেন। আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার গত নির্বাচনী প্রচারণায় মব লিঞ্চিং বন্ধ করার কথা বললেও বাস্তবে তার ভিন্ন চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তিন মাসের এই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি নারী ও শিশুদের সামগ্রিক চিত্রও সন্তোষজনক নয়। ২৭টি হামলায় ৩১ জন সংখ্যালঘু ব্যক্তি আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চারটি মন্দির, দুটি প্রতিমা এবং ১৯টি বসতবাড়ি। জমি ও সম্পত্তি দখল বা ক্ষতির ঘটনাও ঘটেছে ১৩টি।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নারী নির্যাতনের ভয়াবহতার চিত্রও। এ সময়ে ৬৭০ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৪৭ জন, যার অর্ধেকের বেশি, অর্থাৎ ৭৬ জন, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও কিশোরী।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির এই তথ্যচিত্র কেবল কিছু সংখ্যার যোগফল নয়, বরং এটি দেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র। সীমান্ত সহিংসতা থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হানাহানি- সবই এক অস্থির সমাজকাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। একটি শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীলতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।