দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক করুণ স্মৃতি বহন করছে কুমিল্লার ময়নামতিতে অবস্থিত ‘ওয়ার সিমেট্রি’। ১৯৪০-৪৫ সাল পর্যন্ত মিয়ানমারে সংঘটিত ভয়াবহ যুদ্ধে ৪৫ হাজার কমনওয়েলথ সেনা নিহত হন। তাদের স্মরণে বাংলাদেশের কুমিল্লা, মিয়ানমার ও আসামের বিভিন্ন স্থানে সমাধি তৈরি করা হয়, যার মধ্যে কুমিল্লার ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি অন্যতম।
কুমিল্লা শহর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার পশ্চিমে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পাশে অবস্থিত ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি প্রায় চার একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। এই স্মৃতিসৌধ শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়, বিদেশি পর্যটকদেরও বিশেষ আকর্ষণ। এখানে ১৩ দেশের ৭৩৭ জন যোদ্ধার সমাধি রয়েছে, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ হারান।
এখানে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা একদিকে যেমন ময়নামতির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে যুদ্ধের স্মৃতির কারণে এখানে এসে হৃদয়বিদারক অনুভূতির কথাও প্রকাশ করেন। যুক্তরাজ্য, ভারত, আফ্রিকা, জাপানসহ নানা দেশের সৈনিকের সমাধি রয়েছে এখানে।
ওয়ার সিমেট্রির প্রবেশমুখে একটি তোরণ রয়েছে, যার ভেতরে কবরস্থানটির ইতিহাস ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় লেখা রয়েছে। প্রশস্ত পথের দুই পাশে সারি সারি কবরফলক রয়েছে, যার ওপর যোদ্ধাদের নাম, পদবি, ধর্মীয় প্রতীক এবং মৃত্যুর তারিখ উল্লেখ রয়েছে। সিমেট্রির কেন্দ্রে একটি বেদি রয়েছে, যার ওপর খ্রিষ্টধর্মের প্রতীক ক্রুশ দেখা যায়।
ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রির রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে কমনওয়েলথ গ্রেভ ইয়ার্ড কমিশন (সিডব্লিউজিসি)। এই কমিশন প্রতি বছর নভেম্বরের প্রথমদিকে একটি বার্ষিক প্রার্থনাসভার আয়োজন করে, যেখানে কমনওয়েলথভুক্ত দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হন। গার্ড অব অনার প্রদানের পর যুদ্ধাহত সৈন্যদের স্মৃতির উদ্দেশে ফুলেল শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো হয়।
ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রিতে সমাহিত যোদ্ধাদের মধ্যে রয়েছে অবিভক্ত ভারতের ১৭৮ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৫৭ জন, জাপানের ২৪ জন, কানাডার ১২ জন, অস্ট্রেলিয়ার ১২ জন, নিউজিল্যান্ডের ৪ জন, এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, বেলজিয়াম, পোল্যান্ড ও বার্মার একজন করে সেনার কবর। এই জাতিগত বৈচিত্র্য যুদ্ধের বৈশ্বিক মাত্রাকে যেমন ফুটিয়ে তোলে, তেমনই এই কবরস্থানে তাদের নীরব উপস্থিতি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।