আধুনিক পৃথিবীর দিকে তাকালে আমাদের চোখে পড়ে আকাশছোঁয়া সব অট্টালিকা। বর্তমান সময়ে যে শহরে আকাশচুম্বী ভবনের সংখ্যা যত বেশি, সেই শহর তত বেশি আকর্ষণীয়। আর এই ধরনের আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন বা ক্যাড (CAD)। বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক (3D) বা দ্বিমাত্রিক (2D) ডিজিটাল মডেল ও নকশা তৈরি, যা প্রকৌশল, স্থাপত্য ও উৎপাদন শিল্পে ডিজাইন তৈরির পাশাপাশি পরিবর্তন ও বিশ্লেষণের জন্য অপরিহার্য। এটি কাজের গতি ও নির্ভুলতা বাড়ায়। আধুনিক উৎপাদন ও নির্মাণ প্রক্রিয়ায় এর গুরুত্ব অপরিসীম।
ক্যাডের সূচনা হয় ষাট-সত্তরের দশকে। যখন পশ্চিমা প্রকৌশলীদের কাছেও কম্পিউটার খুব বেশি পরিচিত ছিল না, তখন এক বাংলাদেশি প্রকৌশলীর হাত ধরেই পরিচিতি পায় ক্যাড। প্রকৌশলের আধুনিকায়ন ও সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণে তাঁর এ পদক্ষেপ ছিল যুগান্তকারী।
আমরা কজন জানি, এই ‘স্কাইস্ক্র্যাপার’ বা গগনচুম্বী ভবন নির্মাণের বিপ্লব যাঁর হাত ধরে এসেছিল, তিনি এই দেশেরই সন্তান! যিনি আমাদের এই দেশের জন্য বয়ে এনেছেন সুনাম, নিজের কাজের মাধ্যমে আমাদের দিয়েছেন গর্ব করার সুযোগ। তিনি ফজলুর রহমান খান, সংক্ষেপে এফ আর খান। যাঁকে বিশ্ব চেনে ‘স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আইনস্টাইন’ হিসেবে।
১৯২৯ সালের ৩ এপ্রিল ঢাকার শিবচরে এক সাধারণ মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন ইতিহাসের পাতায় ক্ষণজন্মা এই মহানায়ক। তাঁর বাবা ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ খান বাহাদুর আবদুর রহমান খাঁ। তাঁর মা খাদিজা খাঁতুন ছিলেন পাবনা জেলার দুলাই ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জমিদার আব্দুল বাসিত চৌধুরীর মেয়ে। এফ আর খানের মায়ের বংশের পূর্বপুরুষ শরফুদ্দীন সরকার তুর্কেস্তানের সমরকন্দ শহর থেকে বাংলায় এসে দুলাই গাঁওয়ে বসতি স্থাপন করেছিলেন।
১৯৪৪ সালে ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শেষ করে ১৯৪৬ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে কলকাতার শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পুরকৌশল প্রকৌশলে পড়াশোনা শেষ না করেই ফিরে আসেন ঢাকায়। এরপর তৎকালীন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমান বুয়েট) থেকে বিশেষ বিবেচনায় পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। বুয়েট থেকে ডিগ্রি অর্জনের পরপরই সেখানে অধ্যাপনা শুরু করেন এফ আর খান।
ফজলুর রহমান খান কেবল একজন প্রকৌশলীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। ১৯৫২ সালে ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং অবিশ্বাস্য দ্রুততায় মাত্র তিন বছরে দুটি মাস্টার্স ও একটি পিএইচডি সম্পন্ন করেন। সেখানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় অ্যাট আরবানা-শ্যাম্পেইন থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং তাত্ত্বিক ও ফলিত মেকানিক্সে যুগ্মভাবে এমএস করার পর স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে ডক্টরেট শেষে দেশে ফিরে আসেন।
এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালে ১৯৫৫ সালে তিনি শিকাগোর বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘স্কিডমোর, ওউইং অ্যান্ড মেরিল’ (SOM)-এ যোগ দিয়েছিলেন। দেশে নিজের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব নয় উপলব্ধি করে নিজের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে খান আবারও ফিরে যান মার্কিন মুলুকে। এরপরই তিনি প্রথাগত নিয়মনীতি ভেঙে তৈরি করতে থাকেন একের পর এক বিস্ময়।
সেই সময়ে ভবন যত উঁচু হতো, বাতাসের চাপ সামলাতে খরচও তত বেড়ে যেত। এ সময় এফ আর খান নিয়ে এলেন যুগান্তকারী ‘টিউব স্ট্রাকচার’ পদ্ধতি। এই উদ্ভাবনের ফলে আকাশচুম্বী ভবন তৈরি যেমন সাশ্রয়ী হলো, তেমনি নিরাপদও হলো। শিকাগোর ১০০ তলা ‘জন হ্যানকক সেন্টার’ এবং ১১০ তলা ‘সিয়ার্স টাওয়ার’ (বর্তমান উইলিস টাওয়ার) তাঁর অমর সৃষ্টি। গগনচুম্বী এ দুটি প্রকল্পই তাকে এনে দেয় বিরল সম্মান এবং বাংলাদেশের জন্য গর্ব। এই সিয়ার্স টাওয়ার টানা ২৫ বছর বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন হিসেবে রাজত্ব করেছে। এমনকি বর্তমানের বুর্জ খলিফাও তাঁরই উদ্ভাবিত টিউব পদ্ধতিতে তৈরি। এ কারণেই তাঁকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার এবং ‘স্থাপত্যের আইনস্টাইন’ বলা হয়।
১৯৭২ সালে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ-রেকর্ডের ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ মনোনীত হন। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৪ সালে আমেরিকার নিউজউইক ম্যাগাজিন তাদের কভার ফিচারে মার্কিন স্থাপত্যের শীর্ষে অবস্থানকারী ব্যক্তি হিসেবে তাকে অভিহিত করে। এ ছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ-রেকর্ড ম্যাগাজিন তাকে ১৯৬৫, ১৯৬৮, ১৯৭০, ১৯৭১ ও ১৯৭৯ সালে মোট পাঁচবার স্থাপত্য শিল্পে সর্বোচ্চ অবদানকারী ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে। মুসলিম স্থাপত্যশিল্পে গবেষণা ও বিশেষ অবদানের জন্য তিনি লাভ করেন ‘আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার’।
বিখ্যাত দুই স্কাইস্ক্র্যাপার তাঁকে নির্মাণ দুনিয়ার পথিকৃতের স্থান এনে দিলেও তিনি পুরকৌশল প্রকৌশলের অন্যান্য শাখাতেও দুর্দান্ত সাফল্যের ছাপ রেখেছেন। ওয়ান ম্যাগনিফিসেন্ট মাইল, জেদ্দা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হজ টার্মিনাল, কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়, মার্কিন বিমানবাহিনীর একাডেমি, ম্যাকম্যাথ-পিয়ার্স সোলার টেলিস্কোপের পাশাপাশি অনেক স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নাম।
প্রবাসে থাকলেও এফ আর খানের হৃদয়ে সবসময় ছিল বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে যখন দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তিনি তখন শিকাগোতে নিজের ক্যারিয়ারের শীর্ষে। কিন্তু দেশের টানে তিনি সব বিলাসিতা ছেড়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তিনি প্রবাসীদের নিয়ে ‘বাংলাদেশ ইমার্জেন্সি ওয়েলফেয়ার আপিল’ এবং ‘বাংলাদেশ ডিফেন্স লীগ’ গঠন করেন। তাঁর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে দেওয়া বক্তব্য বিশ্বজনমত গঠনে এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মার্কিন অবস্থান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। নিজের উপার্জনের বড় একটি অংশ তিনি মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে দান করতেন।
পেশায় প্রকৌশলী হলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর বাঙালি এবং সংস্কৃতিমনা। কাজ শেষে বাড়ি ফিরে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে ভালোবাসতেন। ঘরোয়া অনুষ্ঠানে নিজেই গান ধরতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন প্রকৌশলীকে কেবল অঙ্ক বুঝলে চলে না, তাকে সমাজ ও শিল্পের দর্শনও বুঝতে হয়। তিনি জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন মার্কিন নাগরিক ল্যাসেলেট খানকে। তাঁর একমাত্র সন্তান ইয়াসমিন সাবিনা খানও বাবার পথ ধরে স্থাপত্যকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
১৯৮২ সালের ২৬ মার্চ জেদ্দায় ৫২ বছর বয়সে এই মহান নির্মাণ প্রকৌশলীর জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। সৌদি আরবে প্রাণ ত্যাগ করলেও শেষকৃত্যের জন্য তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রে। মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকসহ বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ারের পাদদেশের সড়কটির নাম রাখা হয়েছে তার স্মরণে ‘ফজলুর আর. খান ওয়ে’।
আজকের পৃথিবীর প্রতিটি আকাশচুম্বী অট্টালিকা যেন এই মহান বাঙালির মেধা আর দূরদর্শিতার একেকটি জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ। ফজলুর রহমান খান প্রমাণ করে গেছেন, মেধা আর একাগ্রতা থাকলে বাংলার মাটি থেকে উঠে এসেও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন সত্যি করা সম্ভব।