Ridge Bangla

গিজার পিরামিড: ৪৫০০ বছরের অমীমাংসিত রহস্য

মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পাথরের স্থাপত্য গিজার পিরামিড। মিশরের রাজধানী কায়রোর উপকণ্ঠে অবস্থিত গিজার পিরামিড আজও মানব সভ্যতার বিস্ময়ের প্রতীক। হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও এই স্থাপত্যের রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে। এগুলো কি কেবলই সমাধি, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো উদ্দেশ্য?

প্রায় ৪ হাজার ৫০০ বছর আগে, যখন আধুনিক প্রযুক্তি বা যান্ত্রিক শক্তির কোনো অস্তিত্ব ছিল না, তখন কীভাবে এত বিশাল কাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছিল, এ প্রশ্ন আজও বিজ্ঞানী ও গবেষকদের ভাবিয়ে তোলে।

গিজা মালভূমিতে অবস্থিত তিনটি প্রধান পিরামিড- খুফু, খাফরে এবং মেনকাউরে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো খুফুর পিরামিড। প্রায় ৪৮১ ফুট উচ্চতার এই স্থাপত্য তৈরি হয়েছে প্রায় ২৩ লাখ পাথরের ব্লক দিয়ে, যার প্রতিটির ওজন ২ থেকে ১৫ টনের মধ্যে।

এই বিশাল পাথরগুলো কীভাবে কাটা, পরিবহন এবং নিখুঁতভাবে স্থাপন করা হয়েছিল, তা নিয়ে রয়েছে নানা তত্ত্ব। কেউ বলেন, ঢালু র‍্যাম্প ব্যবহার করা হয়েছিল। কেউ আবার পানির প্রবাহকে কাজে লাগানোর কথা বলেন। আবার অনেকের মতে, এত নিখুঁত নির্মাণ কেবল মানবশ্রম দিয়ে সম্ভব ছিল না।

তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদ একমত, এগুলো তৈরি করেছিলেন দক্ষ ও সংগঠিত মিশরীয় শ্রমিকরা, যারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করতেন।

পিরামিডের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, এগুলো কি সত্যিই সমাধি? প্রাচীন মিশরীয়দের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর আত্মা আবার দেহে ফিরে আসতে পারে। তাই তারা মৃতদেহ সংরক্ষণ, সমাধি নির্মাণ এবং মূল্যবান সম্পদ রেখে যাওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। এই বিশ্বাস থেকেই ধারণা করা হয়, পিরামিডগুলো নির্মিত হয়েছিল ফেরাউনদের সমাধি হিসেবে।

তবে রহস্যের শুরু এখানেই। কারণ এত বড় ও জটিল কাঠামো থাকা সত্ত্বেও গিজার পিরামিডে আজ পর্যন্ত কোনো ফেরাউনের মমি পাওয়া যায়নি। যদিও সমাধি কক্ষ, পাথরের কফিন (সারকোফেগাস) এবং ধর্মীয় কাঠামোর অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে এগুলো সমাধির জন্যই নির্মিত হয়েছিল, তবুও মমির অনুপস্থিতি প্রশ্ন জাগায়, আসলেই কি এখানে দাফন করা হয়েছিল?

গবেষকদের ধারণা, প্রাচীনকালেই পিরামিডগুলো লুট হয়ে গিয়েছিল। দুষ্কৃতকারীরা মূল্যবান সম্পদের পাশাপাশি মমিও সরিয়ে ফেলতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এখনো অজানা কোনো গোপন কক্ষের সন্ধান পাওয়া বাকি, যেখানে হয়তো লুকিয়ে আছে সেই উত্তর।

পরে অবশ্য মিশরের ফেরাউনরা তাদের সমাধির ধরন পরিবর্তন করেন। তারা পিরামিডের পরিবর্তে পাহাড় কেটে গোপন সমাধি নির্মাণ শুরু করেন, যার অন্যতম উদাহরণ ভ্যালি অব দ্য কিংস। এখানেই আবিষ্কৃত হয় বিখ্যাত ফেরাউন তুতানখামুনের মমি, যা প্রমাণ করে লুটপাট থেকে রক্ষা পেতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল।

গিজার পিরামিডের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আরেক রহস্যময় স্থাপনা- গ্রেট স্ফিংক্স। মানুষের মুখ ও সিংহের দেহবিশিষ্ট এই বিশাল মূর্তিকে অনেকেই পিরামিডের রক্ষক হিসেবে মনে করেন। এর নির্মাণকাল, উদ্দেশ্য এবং প্রকৃত অর্থ নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক, যা আজও সমাধান হয়নি।

পিরামিড শুধু একটি স্থাপত্য নয়; এটি মানুষের কল্পনা, বিশ্বাস এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার এক অসাধারণ নিদর্শন। আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে আমরা উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে অনেক কিছু করতে পারি, কিন্তু হাজার হাজার বছর আগে মানুষের হাতে গড়া এই নিখুঁত কাঠামো আজও আমাদের বিস্মিত করে।

This post was viewed: 8

আরো পড়ুন