বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ এবং কৌশলগত অবকাঠামো প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যার মাধ্যমেই আমাদের দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করে। ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ নির্মাণ শুরুর পর থেকে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকে ঘিরে বহু বছর ধরেই নানা রকম অগ্রগতির আশ্বাস, নির্ধারিত সময়সূচি, উদ্বোধনের প্রস্তুতি এবং “সবকিছু ঠিকঠাক চলছে”- এমন বার্তা বারবার সামনে আনা হয়েছে।
কিন্তু রিজ বাংলার হাতে আসা বিভিন্ন নথি ভিন্ন এক বাস্তবতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেসব নথির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির ভেতরে কেবল বিলম্বই নয়, এর পাশাপাশি কারিগরি ঘাটতি, নিরাপত্তা-সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা, ব্যয়বৃদ্ধি, পরীক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন, এমনকি তথ্য গোপন বা সাজিয়ে উপস্থাপনের অভিযোগও রয়েছে।
এসব সমস্যা আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তা মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণই শুধু নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য পারমাণবিক নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতি ও জননিরাপত্তার জন্য অপরিমেয় ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
রিজ বাংলা এর আগেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নানা অনিয়ম, ব্যয়, ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। নতুন এই অনুসন্ধান সেই পুরনো আশঙ্কাগুলোকে আরও ঘনীভূত করছে। কারণ এখানে যে অভিযোগগুলো উঠে এসেছে, তা কেবল একটি প্রকল্পের ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ার চিত্রই তুলে ধরছে না, বরং সর্বোচ্চ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত জাতীয় স্থাপনা কতটা প্রস্তুত, তা নিয়েও মৌলিক প্রশ্ন তোলে।
জানা গেছে, মূল চুক্তি অনুসারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ফুয়েল লোডিং শুরুর নির্ধারিত সময় ছিল ২৩ অক্টোবর ২০২২। এরপর ২০২৩ সালের অক্টোবরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর পরিকল্পনার কথাও ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও সেই কাজ সম্পন্ন হয়নি।
তবুও ২০২৩ সালের অক্টোবর নাগাদ একে একটি বড় উন্নয়ন-মাইলফলক হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়। এমনকি ২০২৪ সালের এপ্রিলেই ফুয়েল লোডিং ও বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর বার্তাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর সেই অগ্রগতির আর বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।
সরকার পরিবর্তনের পরও আবার দ্রুত ফুয়েল লোডিংয়ের প্রস্তুতির কথা বলা হয়, ২০২৫ সালেও অন্তত পাঁচবার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এভাবে তারিখ নির্ধারণের পুনরাবৃত্তি প্রকল্প বিলম্বের মূল কারণ আড়াল করা এবং সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল হতে পারে।
রিজ বাংলার অনুসন্ধান থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী একটা বিষয় নিশ্চিত, আর তা হলো- বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই প্রকল্প একটি মহল নিজ হীন স্বার্থেই ব্যবহার করছে। সেই সাথে প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা আড়াল করে অন্ধকারে রাখা হয়েছে নীতিনির্ধারকদের।
কীভাবে? চলুন এখন জানা যাক সেই সম্পর্কেই।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ নানা যন্ত্রাংশ, বিশেষ করে ইন্সট্রুমেন্টেশন ও কন্ট্রোল সিস্টেমের সরবরাহ নেই। এই ঘাটতির পেছনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, এবং ইউরোপীয় উৎস থেকে যন্ত্রপাতি না আসার কথাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার, রূপপুরের জন্য রাশিয়ায় প্রস্তুত কিছু যন্ত্রপাতিও রাশিয়া ও তাদের কৌশলগত মিত্র অন্যান্য দেশের প্রকল্পে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে চীন ও ভারত থেকে আংশিক সরঞ্জাম আনার অভিযোগও রয়েছে। তবে সেগুলোর গুণগত মান নিয়ে আপস করা হয়েছে। ফলাফল হিসেবে পরীক্ষার সময় বারবার সেসব উপকরণ মানোত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছে।
চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনার কথা কারো অজানা নয়। ফুকুশিমার পারমাণবিক বিপর্যয় তো মাত্র পনের বছর আগেই ঘটেছে। একটি পারমাণবিক দুর্ঘটনার ফলাফল কতটা ভয়াবহ ও ব্যাপক হতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে কিছুই বলার নেই। এমতাবস্থায় নিম্নমানের উপকরণ বেছে নিয়ে কর্তৃপক্ষ কি এ দেশের জনগণের ভাগ্য নিয়েই ভয়াবহ খেলায় মেতে উঠল না? প্রশ্ন থেকেই যায়!
এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ ছাড়া কাজগুলো যেন অনেকটা জোড়াতালি দিয়েই চালানোর চেষ্টা করা হয়েছে, এবং এমন জোড়াতালির সংখ্যা তিন থেকে চার হাজারের মতো! এটি গোটা সিস্টেমের নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, ফুয়েল লোডিংয়ের আগে পরিকল্পিত ১,৭৪৬টির বেশি পরীক্ষার মধ্যে অল্পসংখ্যক পরীক্ষাই সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পাঠানো এক চিঠিতে প্রায় পাঁচ বছর চেষ্টার পর মাত্র ২৪০টি পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। অথচ পরে ১৯১৯টি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে- এমন দাবি তোলা হয়েছে!
সংখ্যাগত এই ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। গত সাত মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়া কতটা সম্ভব, যেখানে আগের ৬০ মাসে হয়েছে মাত্র ২৪০টি? ফলে পরীক্ষণ-সংক্রান্ত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যায়। আসলেই কি হয়েছে সেসব পরীক্ষা, নাকি সেসবের অস্তিত্ব কেবলই কাগজে-কলমে? আর যদি হয়েও থাকে, তাহলে কতটা মানসম্পন্ন হয়েছে সেসব? প্রথম ৬০ মাসে ২৪০টি করে কীভাবে পরের ৭ মাসে এতগুণ বেশি কাজ করা গেল?
নিরাপত্তা অবকাঠামো নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। Engineered Safety Feature Actuation System (ESFAS), HVAC, Automated Environment Radiation Monitoring System (AERMS), Fire Detection System, Radioactive Waste Management System-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বিষয়ক সিস্টেম এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর নয়। এগুলো ছাড়া প্ল্যান্ট পরিচালনা করলে পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
পারমাণবিক যেকোনো প্রকল্পে যেখানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এরপরই এগোনোর কথা, সেখানে এমন অপূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা সিস্টেম কি এই ভূখণ্ড এবং এর বাসিন্দারাই কেবল নয়, সেই সাথে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনযাত্রাকেও হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে না?
একইভাবে Emergency Preparedness and Response ব্যবস্থা, Radiation Monitoring System এবং Offsite Warning System যথাযথভাবে তৈরি না থাকলে কোনো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণকে দ্রুত সতর্ক করা বা সরিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।
আরও একটি মৌলিক সংকটের বিষয়ও নজরে এসেছে আমাদের। প্রকল্পের মৌলিক কারিগরি নথি, যেমন Technical Specification, Reactor Designer Document, P&ID এবং হালনাগাদ ডিজাইন ডকুমেন্ট পর্যন্ত প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে পূর্ণাঙ্গভাবে হস্তান্তর করা হয়নি। ফলে প্রকৃত সিস্টেম কনফিগারেশন, কম্পোনেন্ট সংখ্যা ও পরীক্ষার প্রক্রিয়া নিয়েই অস্বচ্ছতা রয়ে গেছে। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো উচ্চঝুঁকির প্রকল্পে এই ধরনের নথিগত ঘাটতি শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতারও প্রশ্নও।
রূপপুর প্রকল্পের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ইতোমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ। অপারেটিং প্রতিষ্ঠান NPCBL-এর সুস্পষ্ট অর্গানোগ্রাম, সার্ভিস রুল, সিনিয়রিটি তালিকা এবং মানবসম্পদ কাঠামো এখনও সুসংগঠিত নয়। অভিজ্ঞ কর্মীদের অব্যাহতি এবং প্রশিক্ষিত জনবলের ক্ষয় প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা দুর্বল করছে।
প্রকল্পের ব্যয়ের প্রশ্নে আরও বিস্ফোরক চিত্রই উঠে এসেছে। জানা গেছে, দুই ইউনিটবিশিষ্ট ২,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় সাধারণভাবে ৫-৬ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। সেই অনুপাতে ২,৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় সর্বোচ্চ ৭.২ বিলিয়ন ডলার হওয়ার কথা।
কিন্তু নথি অনুযায়ী, রূপপুরের নির্মাণ ব্যয় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার, আর প্রস্তুতিমূলক কাজসহ মোট ব্যয় ১৩.১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০০০ মেগাওয়াটের বদলে ২৪০০ মেগাওয়াট এবং ১৩.১৬ বিলিয়ন ডলারে চুক্তিমূল্য নির্ধারণের পক্ষে কোনো ওয়ার্কিং পেপার পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, প্রকল্পটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মোঃ জাহেদুল হাছান এই চুক্তির একজন নেগোশিয়েটর ছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
প্রকল্পের নির্মাণকালীন সুদ (Interest During Construction) এর অঙ্ক প্রতিদিন ১১-১২ কোটি টাকা। অডিট রিপোর্টের পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, রূপপুর প্রকল্পের নির্মাণব্যয় আন্তর্জাতিক যেকোনো মানের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি।
এখানেই শেষ নয়। মূল চুক্তিতে অপারেশনাল সাপোর্ট, মেইন্টেন্যান্স-রিপেয়ার সাপোর্ট এবং স্পেয়ার পার্টস সাপোর্টের বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার পরও গ্যারান্টি পিরিয়ড শেষ হওয়ার আগেই নতুন চুক্তির আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। কেন এমন তাড়াহুড়া, কার স্বার্থে, এবং পূর্বচুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে কেন নতুন দরকষাকষির প্রয়োজন হলো- এই প্রশ্নগুলোও তাই চলেই আসে।
প্রকৌশলগত আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে আছে Water Intake Channel। মূল ডিজাইন পরিবর্তন করে যেভাবে এটি নির্মাণ করা হয়েছে, তাতে এক বছরের মধ্যেই পলি জমে তা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শীতলকরণের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন করে খননকাজ করতে হচ্ছে, খরচ বাড়ছে, আর প্রয়োজনীয় পানি না পেলে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা যাবে না। চালু থাকলেও বন্ধ করে দিতে হতে পারে। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এটি কোনো সাধারণ ত্রুটি নয়; এটি কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা- দুইয়ের সঙ্গেই যুক্ত।
কর্মরত জনবলকে সুরক্ষায় একটি সুসংগঠিত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কর্মসূচি কার্যত নেই বলেও উঠে এসেছে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে।
পরীক্ষণ নিয়ে সন্দেহজনক বক্তব্য, জোড়াতালি দিয়ে টেস্ট সম্পন্ন দেখানো, এমনকি ভুয়া রিপোর্ট তৈরির অভিযোগও রয়েছে। এ অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি, কারণ এগুলো সত্য হলে তা কেবল প্রকল্পের নয়, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিরও গুরুতর সংকট।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) ১০ থেকে ২৭ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত রূপপুরে একটি মিশন সম্পন্ন করে। পরে সংস্থাটি একটি প্রেস নোটের পাশাপাশি ৮৫ পাতার একটি গোপনীয় প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনেও রূপপুর নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
রূপপুর নিয়ে বড় প্রশ্নটি তাই এখন আর “কবে থেকে চালু” নয়। প্রশ্ন হলো- এই প্রকল্প কি আসলেই নিরাপদ, প্রস্তুত, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনায় আছে?
আগামী ৭ এপ্রিল এই প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের আনুষ্ঠানিক ফুয়েল লোডিং কার্যক্রমের ভার্চুয়াল উদ্বোধন করতে চলেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। কর্তৃপক্ষের আশা, আগামী জুলাই মাসের মধ্যেই এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব।
তবে আমাদের অনুসন্ধান থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ফুয়েল লোডিংকে কেন্দ্র করে উৎসবমুখর আনুষ্ঠানিকতা তৈরির আগে প্রয়োজন ছিল প্রকল্পটির সামগ্রিক বাস্তবতা খতিয়ে দেখা।
চলমান ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান যুদ্ধে যেসব সংকটের কথা খুব জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ সংকট তার মাঝে একটি। বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের কথা উঠে আসছে বার বার। এই দেশের জনগণের বহুল আকাঙ্ক্ষিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কি সেই বিকল্প হয়ে ওঠার মতো পর্যায়ে এখনও পৌঁছাতে পেরেছে? সামগ্রিক অনুসন্ধান ও গবেষণা এই প্রশ্নের নেতিবাচক উত্তরই দিচ্ছে।
প্রকল্পটির ফুয়েল লোড হয়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা ছিল অনেক আগেই, তবে সেটা অবশ্যই সকল রকমের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে, এবং সকল রকমের উৎকৃষ্ট মানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে। অর্থাৎ, পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে এরপরই সেটা করার কথা ছিল। তবে পূর্বঘোষিত সেই সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই।
কেন একটি নিরাপদ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সকল চেকলিস্ট পূরণ করে এতদিনেও জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারল না রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র? আর, সেসব পূরণ করে সম্ভব হবেই বা কবে থেকে? এই যে এতদিনেও হলো না, এর পেছনে দায় কার/কাদের? তারা কি জবাবদিহিতার আওতায় আসবে?
গেল জানুয়ারিতে জানা যায়, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে এই প্রকল্পের খরচ বেড়েছে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। পুরো প্রকল্প সম্পন্ন করতে খরচ হচ্ছে (নতুন হিসেবে) ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ মূল্য বৃদ্ধি হলো যাদের গাফিলতির ফলে, তাদের কথা, তাদের কর্মকাণ্ডের কথা কি কখনো প্রকাশ্যে আসবে?
প্রকল্প শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত দুটি ভিন্ন সরকার (আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) পেরিয়ে তৃতীয় সরকার (বিএনপি) এলেও পেছনের মানুষগুলো আজও বদলাননি। তাদের খুঁটির জোর কোথায়? কেন এত অনিয়ম, অভিযোগ, স্বেচ্ছাচার আর অর্থের অপচয়ের পরও তাদের কোনো জবাবদিহিতার আওতায়ই আনা সম্ভব হলো না?
প্রশ্ন থেকেই যায়।