Ridge Bangla

সোমালিল্যান্ড: ফিলিস্তিনিদের নতুন ঠিকানা?

হর্ন অব আফ্রিকার ছোট্ট একটি অঞ্চল সোমালিল্যান্ড। এটি আলাদা কোনো দেশ কিনা সেটা তর্কসাপেক্ষ। স্বায়ত্বশাসিত এই ভূখণ্ড তেমন দাবি করলেও স্বল্প সংখ্যক দেশই একে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে কৌশলগত অবস্থান, গণতান্ত্রিক শাসন, স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইত্যাদি কারণে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে বেশ আকর্ষণীয় সোমালিল্যান্ড।

সম্প্রতি ভূরাজনীতিতেও আলোচনার রসদ হয়ে উঠেছে তারা। এর মূল কারণ ইসরায়েলি স্বীকৃতি। বলা হচ্ছে এই স্বীকৃতির পেছনে আছে গাযা থেকে ফিলিস্তিনিদের সোমালিল্যান্ডে নির্বাসিত করার শর্ত।

অবস্থান

ভৌগোলিকভাবে সোমালিল্যান্ড এডেন উপসাগরের (Gulf of Aden) গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে আছে। এর উত্তর-পশ্চিমে জিবুতি, দক্ষিণপশ্চিমে ইথিওপিয়া এবং পূর্বে বৃহত্তর সোমালয়া। প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূল ঘেঁষে চলে গেছে ব্যস্ত নৌপথ। মধ্যপ্রাচ্য ও হর্ন অব আফ্রিকাকে যুক্ত করা বাব আল-মান্দাব (Bab al‑Mandab) প্রণালীর নিকটবর্তীতার কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও তেল রপ্তানিতেও ভূমিকা আছে তাদের।

এসব কারণে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অনেক শক্তি সোমালিল্যান্ডের ব্যাপারে আগ্রহী। ইসরায়েলি স্বীকৃতির পেছনে বাব আল-মান্দাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা শোনা যায়। এর ফলে নৌবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি রাস্তা তাদের হাতে চলে আসবে।

নতুন আফ্রিকান রাষ্ট্র

আফ্রিকার অন্য বেশ কিছু জায়গার মতো সোমালিল্যান্ডও ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। ১৯৬০ সালের জুনে স্বাধীনতা লাভ করে তারা। প্রাথমিকভাবে আলাদা দেশ থাকলেও পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় সোমালিয়া প্রজাতন্ত্রের অংশ হয় তারা। তবে যে আকাঙ্ক্ষায় এই সম্মিলন তা বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে সোমালি একনায়ক সিয়াদ বারের দীর্ঘ দমনমূলক শাসন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উস্কে দেয়। ১৯৯১ সালে বারের পতনের পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার সময় সোমালিল্যান্ড সম্মিলন বাতিল করে সার্বভৌমত্বের ঘোষণা দেয়।

বৃহত্তর সোমালিয়া অবশ্য এই একপাক্ষিক ঘোষণা মেনে নেয়নি, কিন্তু টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের কাছে চাপ প্রয়োগের কোনো সুযোগও ছিল না। সোমালিল্যান্ড এই অবসরে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, সংবিধান এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৈরি করে। বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না মিললেও আফ্রিকার অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় অনেক শান্ত এবং নিরাপদ পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয় তারা। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার সুশৃঙ্খল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, এবং ক্ষমতা হস্তান্তর প্রত্যেকবারই ছিল শান্তিপূর্ণ।

শাসনব্যবস্থা

আফ্রিকার অনেক দেশের মতো সোমালিল্যান্ডেও গোত্রভিত্তিক বিভাজন আছে। তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এই ভিন্নতা সম্মান করে। ২০০১ সালে গৃহীত সংবিধান অনুযায়ী সোমালিল্যান্ডের নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত প্রেসিডেন্টের ওপর। পাশাপাশি আছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা। আইনসভার উচ্চকক্ষ গুর্তি (Guurti) যেখানে বিভিন্ন গোত্রের অভিজ্ঞ ও বয়োবৃদ্ধ লোকেরা বসেন। তারা বিবাদ নিরসন এবং সুষ্ঠু প্রশাসন পরিচালনায় প্রভাব রাখেন।

বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল আছে সোমালিল্যান্ডে। নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে তারা, এবং ক্ষমতার পালাবদল ঘটে তেমন কোনো সহিংসতা ছাড়াই। তবে একেবারে নির্বিঘ্ন নয় সবকিছু। নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা, সহিংসতা, বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইত্যাদি বিদ্যমান। তবে আফ্রিকার অন্যান্য দেশের তুলনায় তারা যথেষ্ট ভালো অবস্থানে আছে।

অর্থনীতি

সোমালিল্যান্ডের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এখনো গবাদিপশু রপ্তানি এবং প্রবাসী আয়। গালফ অফ এডেনে বিশাল একটি নৌবন্দর আছে তাদের, বার্বেরা (Port of Berbera)। কিন্তু এর পুরো ফায়দা তুলতে এখন পর্যন্ত ব্যর্থ সোমালিল্যান্ড সরকার। বন্দরের সক্ষমতার স্বল্প অংশই কাজে লাগানো হয়। সম্প্রতি আরব আমিরাত এবং বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে বার্বেরার অধিকতর উন্নয়ন করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য একে আঞ্চলিক একটি বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করা।

তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবে সোমালিল্যান্ডের কিছু সমস্যা আছে। এর অন্যতম আর্থিক লেনদেনে সীমাবদ্ধতা। এছাড়া অবকাঠামোর অভাব, খরাপ্রবণ আবহাওয়া ইত্যাদিও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এসব দিক থেকেও ইসরাইলি স্বীকৃতি সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আশা এর ফলে অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিতে গতি সঞ্চারিত হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

যেহেতু এখনো দেশ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত নয় সোমালিল্যান্ড, তাই তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভ এই স্বীকৃতি আদায় করা। তবে পশ্চিমা বিশ্ব এখন পর্যন্ত তাদের সোমালিয়ার অংশ হিসেবেই দেখে, এর কারণ আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রতি তাদের অবস্থান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইসরায়েলি স্বীকৃতি তাদের কাছে ছিল বহুল আকাঙ্ক্ষিত, কারণ এর মাধ্যমেই প্রথম জাতিসংঘের একটি পূর্ণ সদস্য দেশ তাদের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেয়।

অবশ্য এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকাতে প্রচুর বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সমর্থকদের মতে বৈশ্বিক স্বীকৃতির দিকে এটা প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। তবে সমালোচকদের বক্তব্য এর ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়বে। প্রতিবেশী সোমালিয়া এর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে।

ইসরায়েলের সাথে সোমালিল্যান্ডের সম্পর্ক কিন্তু অনেক পুরনো। সেই ১৯৬০ সালেই ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীন হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে ইসরায়েল স্বীকৃতি দিয়েছিল তাদের। সুতরাং বর্তমান স্বীকৃতি আসলে এর নবায়ন মাত্র। আফ্রিকায় বিশ্বস্ত একজন অংশীদারের খোঁজে আছে তারা অনেকদিন ধরে, এবং বিভিন্ন দিক বিবেচনায় সোমালিল্যান্ড হতে পারে সেই উপযুক্ত সঙ্গী। দুই পক্ষের জন্যেই এটা লাভজনক। সোমালিল্যান্ড পাবে আন্তর্জাতিক পরিচিত, আর ইসরায়েল পাবে কৌশলগত নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণের সুযোগ। তবে প্রতিবেশীরা যে এই দহরম-মহরম সুদৃষ্টিতে দেখছেনা সেটা বলাই বাহুল্য।

গাযা ও সোমালিল্যান্ড

গাযায় যুদ্ধের পর সেখান থেকে ফিলিস্তিনিদের জোর করে সোমালিল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়া হবে এমন একটা রিপোর্ট এসেছিল আল-জাজিরায়। বেশ কয়েকজন মার্কিন রাজনীতিবিদ নাকি এর বিনিময়ে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাইয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

স্বাভাবিকভাবেই তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বিশ্লেষকদের মতে এমন কিছু হবে জাতিগত নিধনের সমতুল্য, এবং সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। সোমালিল্যান্ডের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক সংস্থা সরাসরি এর বিরোধিতা করে। ফিলিস্তিনিদের দাবির প্রতি সেখানকার অধিকাংশ মানুষই সহানুভূতিশীল। তারা ইসরায়েলি স্বার্থসিদ্ধি করতে গিয়ে নিজেদের নৈতিক ও আঞ্চলিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় না। ফলে তেমন কোনো পরিকল্পনা থেকে থাকলেও বাস্তবায়ন অসম্ভবই মনে হচ্ছে।

সোমালিল্যান্ডের আছে অপার সম্ভাবনা। তাদের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যথেষ্ট সুশৃঙ্খল। নৌবাণিজ্যের জন্যেও দেশটির অবস্থান আদর্শ। সুতরাং অহেতুক বিতর্ক এড়িয়ে রাষ্ট্রগঠনে মনোযোগ দিলে অচিরেই আফ্রিকার অন্যতম সফল দেশে পরিণত হবে তারা।

This post was viewed: 6

আরো পড়ুন