Ridge Bangla

সুয়েজ সংকট: মিশরে ইঙ্গ-ফরাসী আগ্রাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ

১৯৫৬ সাল; পৃথিবীর ইতিহাসের ঘটনাবহুল এক বছর। মিশরের সুয়েজ খাল সেই সময় হয়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব তখন যাচ্ছে পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে। বিভক্ত জার্মানিতে শাসন করছে মিত্রশক্তি, জাতিসংঘ শিশু মাত্র। স্নায়ুযুদ্ধ চলছে পুরোদমে। এর মধ্যে মিশর ঘিরে সৃষ্টি হয় নতুন উত্তেজনা।

সুয়েজ খাল

উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্তও ইউরোপ থেকে এশিয়া যেতে হত আফ্রিকার উপকূল ঘুরে। ১৮৬৯ সালে উন্মুক্ত হওয়া সুয়েজ খাল এই যাত্রা সহজ ও দ্রুততর করে তোলে। ভূমধ্যসাগর আর লোহিত সাগরকে সংযুক্ত করা খাল কেটেছিল সুয়েজ কোম্পানি (Suez Canal Company), যার মালিকানা যৌথভাবে ছিল ফরাসি ও ব্রিটিশ বিনিয়োগকারী এবং মিশরের তৎকালীন শাসকের হাতে।

ঔপনিবেশিক শক্তি, বিশেষ করে ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সের সুয়েজ খাল ব্যবহার করতো এশিয়াতে তাদের উপনিবেশের সাথে দ্রুত যোগাযোগের জন্য। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের তেল আহরণ করে দেশে নিয়ে আসতে ইংল্যান্ডের কাছে এই জলপথের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

বিংশ শতকের শুরুতেও সুয়েজ খালের মালিকানা ধরে রেখেছিল ইঙ্গ-ফরাসি ব্যবসায়ীরা। মিশরের মাটিতে হলেও এর ওপর মিশরীয়দের মালিকানাই ছিল সবথেকে কম। ফলে এই জলপথ থেকে যে বিপুল মুনাফা অর্জিত হতো তার সিংহভাগই জমা হতো বিদেশিদের কোষাগারে। এ কারণে মিশরের মানুষের মধ্যে পুঞ্জীভূত হচ্ছিল ক্ষোভ।

ক্ষমতার পালাবদল

বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও মিশরে ছিল রাজতন্ত্র, আর রাজপরিবারের মূল পৃষ্ঠপোষক ছিল ব্রিটিশরা। ১৯২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা মিশরকে স্বাধীন ঘোষণা করে, কিন্তু সুয়েজের নিয়ন্ত্রণ রেখে দেয় নিজেদের হাতে। তাদের সেনারা মিশরে রয়ে যায়, খালের আশপাশে অক্ষুন্ন থাকে ব্রিটিশ ঘাঁটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মাথা চাড়া দেয় জাতীয়তাবাদ। ঔপনিবেশির শক্তির বিরুদ্ধে সংগঠিত হয় জনমত। ব্রিটিশ মদদপুষ্ট রাজার দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা আর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী হস্তক্ষেপে বিরক্ত হয়ে ওঠে মিশরীয়রা। এই প্রেক্ষাপটে তরুণ সামরিক অফিসাররা গড়ে তোলেন গোপন এক সংঘ (Free Officers Movement)। ১৯৫২ সালে রাজা ফারুককে (King Farouk) উৎখাত করে ক্ষমতা গ্রহণ করে সামরিক বাহিনী।

১৯৫৪ সালে তরুণ অফিসারদের একজন মিশরের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাঁর নাম গামাল আব্দেল নাসের (Gamal Abdel Nasser)। জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর। মিশরকে সম্পূর্ণভাবে বিদেশী প্রভাবমুক্ত করতে চেয়েছিলেন তিনি।

সংকটের সূচনা

বিশ্বে তখন চলছে ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ। ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সের সাম্রাজ্যবাদি যুগের সূর্য অস্তাচলে। পরাশক্তি হিসেবে উত্থান ঘটেছে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন আর পুঁজিবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। নাসের দুজনের সাথেই সুসম্পর্ক স্থাপন করেন, বিনিময়ে আদায় করে নেন সামরিক ও অর্থনৈতিক সুবিধে।

সোভিয়েতদের সাথে তাঁর দহরম মহরম অবশ্য সুনজরে দেখেনি  লন্ডন আর ওয়াশিংটন। তাদের অর্থায়নে তৈরি হচ্ছিল আসওয়ান বাঁধ (Aswan High Dam project)। ১৯৫৬ সালে এর বরাদ্দ বন্ধ করে দেয় তারা। তাদের আশঙ্কা সমাজবাদিদের সাথে খুব বেশি ঘেঁষাঘেঁষি করছেন মিশরীয় প্রেসিডেন্ট।

এর প্রতিক্রিয়ায় নাসের যা করলেন তার জন্য প্রস্তুত ছিল না বিশ্ব। ১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই তিনি ঘোষণা দিয়ে সুয়েজ কোম্পানিকে জাতীয়করণ করে নেন। সুয়েজ খালের ওপর স্থাপিত হয় মিশরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। তিনি জানিয়ে দেন- এখান থেকে যে মুনাফা আসবে সেটা ব্যয় হবে আসওয়ান প্রজেক্টে। উল্লাসে ফেটে পড়ে মিশরের মানুষ।

প্যারিস আর লন্ডনের কর্তাব্যক্তিদের মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। ইংল্যান্ডের জন্য এশিয়ার সাথে যোগাযোগ রাখতে সুয়েজের ভূমিকা অপরিসীম। আর ফ্রান্সের সমস্যা ফরাসি শাসিত আলজেরিয়ার স্বাধীনতাপন্থীদের প্রতি নাসেরের সমর্থন। তারা ঠিক করল জোর খাটিয়ে হলেও সুয়েজ দখল করবে তারা, সঙ্গী হিসেবে যুক্ত হলো মধ্যপ্রাচ্যের নতুন রাষ্ট্র ইসরাইল। মিশরের সীমান্তবর্তী এলাকার প্রতি তাদের কুনজর বহুদিনের।

সংঘাত

তিন শক্তি গোপনে এক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে (Protocol of Sèvres)। সাইনাই (Sinai Peninsula) উপদ্বীপ দিয়ে হামলা চালাবে ইসরাইলি বাহিনী। তখন ইঙ্গ-ফরাসি জোট দুই পক্ষকেই আহ্বান জানাবে যুদ্ধ বন্ধ করে খালের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ত্যাগ করতে। তারা জানতো নাসের এতে রাজি হবেন না। এই ছুতোয় তাদের সেনারা অভিযান চালিয়ে খালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে।

২৯ অক্টোবর ছক অনুযায়ী আক্রমণ শুরু করে ইসরাইল। এক ধাক্কায় সাইনাই দিয়ে মিশরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তারা। হুঁশিয়ারি পাঠাতে দেরি করেনি লন্ডন আর প্যারিস। অনুমিতভাবেই নাসের প্রত্যাখ্যান করেন। সাথে সাথেই বিমান হামলা চালায় দুই শক্তি, তাদের সৈন্যরা অবতরণ করে পোর্ট সাইদে। বেহাত হয়ে যায় সুয়েজ খাল।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

সামরিকভাবে সফল হয় পরিকল্পনা, কিন্তু বিপদ দেখা দেয় রাজনৈতিকভাবে। ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স ভুলে গিয়েছিল- এসেছে নতুন শক্তি, তাঁকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান।

যুক্তরাষ্ট্রকে আগেভাগে কিছু জানানো হয়নি। প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার (Dwight Eisenhower) প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন। তাঁর দৃষ্টিতে এই অভিযান হঠকারী, এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অশান্ত করে তুলবে। নাসেরকে সম্পূর্ণভাবে ঠেলে দেবে সোভিয়তে ব্লকের দিকে। তিনি অবিলম্বে অস্ত্রবিরতির দাবি করেন। সোভিয়েতরাও হুমকি দেয় মিশর থেকে সরে না গেলে লন্ডন আর প্যারিস তাক করে মিসাইল ছুঁড়বে তারা।

দুই পরাশক্তির প্রবল চাপ উপেক্ষা করার শক্তি ছিল না ইঙ্গ-ফরাসি জোটের। তারা মিশর ত্যাগ করলে ইতিহাসে প্রথম জাতিসংঘের নেতৃত্বে শান্তি মিশন মোতায়েন হয়। এক বছরের মাথায় পরিস্থিতি শান্ত হলে তারা মিশর ত্যাগ করে। ইসরাইলও সাইনাই ছেড়ে দিয়েছিল, তবে এর বদলে আদায় করে নিয়েছিল আকাবা উপসাগর দিয়ে অবাধ চলাচলের সুযোগ।

সুয়েজ সংকট এক অর্থে নতুন এক যুগের সূচনা। এককালের ঔপনিবেশিক শক্তিদের দুর্বলতা প্রকাশ্যে চলে আসে। এর ফলে ত্বরান্বিত হয় ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যের পতন। কয়েক দশকের মধ্যেই প্রায় সব উপনিবেশ ছেড়ে চলে যেতে হয় তাদের।

মিশরের সেনাবাহিনী শত্রুদের সামনে দাঁড়াতে না পারলেও নাসেরের জন্য এটা ছিল রাজনৈতিক বিজয়। আরব জাতীয়তাবাদীদের চোখে তিনি পরিণত হন নায়কে। পশ্চিমাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস দেখিয়েছেন তিনি, চপেটাঘাত করেছেন সাম্রাজ্যবাদিদের গর্বে। কয়েক দিনের ব্যবধানে তিনি হয়ে ওঠেন আরব বিশ্বের নেতা।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুয়েজ সংকট ছিল বিশ্বমঞ্চে নিজেদের ক্ষমতা জাহিরের আরেকটা সুযোগ। ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স নয়, বরং তাঁরাই যে পশ্চিমা শক্তির বর্তমান নেতা সেটা স্পষ্ট হয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার গুরুত্বও অনুধাবন করেন ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারকেরা। বিশেষ করে সেখানে সোভিয়েত প্রভাব ঠেকাতে নতুন কৌশলের প্রয়োজন অনুভন করেন তারা। সোভিয়েতরাও মিশরকে সমর্থন দিয়ে আরবদের বন্ধু হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার প্রয়াস পায়। সুয়েজ খাল তখন থেকে রয়ে যায় মিশরের নিয়ন্ত্রণে।

This post was viewed: 5

আরো পড়ুন