Ridge Bangla

মরুর বুকে মিশরের নতুন রাজধানী: পাট চুকল কায়রোর

সেই ফাতিমি শাসনামল থেকে মিশরের রাজধানীর মর্যাদা দখল করে আছে কায়রো। তবে জনসংখ্যার ভারে জর্জরিত, অনুন্নত অবকাঠামো আর অপর্যাপ্ত সেবার এই শহর সরকারের কেন্দ্র হওয়ার জন্য উপযুক্ত নয় এমন ধারণা বেশ অনেক বছর ধরেই চলমান। আগের বেশ কিছু সরকার এমন প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ করেছে, তবে বর্তমান প্রেসিডেন্টের আমলেই সত্যিকার অর্থে গতি পেয়েছে এই প্রকল্প। ২০১৫ সালে মিশর সরকার নতুন প্রশাসনিক রাজধানীর রূপরেখা ঘোষণা করে। মজার ব্যাপার হলো- এখন অবধি এর যথোপযুক্ত নামকরণ হয়নি, এনএসি (New Administrative Capital) নামেই দাপ্তরিক নথিপত্রে চিহ্নিত করা হয় শহরটিকে।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

এনএসি’র লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয় প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং অর্থনৈতিক প্রণোদনার সুযোগ। মিশর সরকারের মতে, একবিংশ শতকে তাদের নেয়া সবথেকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রজেক্ট এই নতুন রাজধানী। কায়রোর ঘিঞ্জি গলিঘুপচি থেকে সুরম্য ও সুপ্রশস্ত শহরে নিয়ে আসা হবে সরকারি কার্যক্রম। মিশরের আধুনিকায়নের অন্যতম প্রতীক হবে এই নগরী।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক জায়গায় নতুন এই শহরের নির্মাণ চলছে। কায়রো থেকে ৪৫ কিলোমিটার পূর্বে সুয়েজ খাল ও প্রাচীন রাজধানীর মাঝে। ফলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রের মেলবন্ধন হবে এনএসি।

কেমন হবে এই শহর?

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে স্মার্ট শহর হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে এনএসিকে। উন্নত ও আধুনিক অবকাঠামোর পাশাপাশি থাকছে উচ্চমানের ডিজিটাল প্রযুক্তি। সবকিছুই করা হচ্ছে পরিবেশবান্ধব চিন্তা থেকে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও অনেক কমানো হয়েছে।

৭১৪ বর্গ কিলোমিটারের এই নগরীতে থাকবে মন্ত্রণালয় অফিস, সামরিক দপ্তর, খেলাধুলার জায়গা, দূতাবাসের জন্য আলাদা এলাকা, আবাসিক ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জোন এবং মিশরের কৃষ্টি-কালচারের নানা প্রতীক। শহরের কেন্দ্রস্থল প্রায় সাড়ে ছয় বর্গ কিলোমিটারের এবং এখানে বেশ কিছু বড় প্রকল্প থাকবে। এর অন্যতম আফ্রিকার উচ্চতম ভবন, এই মধ্যপ্রাচ্যের সর্ববৃহৎ মসজিদ এবং ক্যাথেড্রাল।

যোগাযোগব্যবস্থার জন্য বিশাল অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। এনএসি’তে তৈরি হবে অত্যাধুনিক বিমানবন্দর, যা ক্রমান্বয়ে মিশর এবং এই অঞ্চলের প্রধান এয়ারপোর্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সরকার। সড়কপথে দ্রুত যাতায়াতের জন্য কায়রো পর্যন্ত থাকবে হাইওয়ে। উচ্চগতির রেললাইন বসানোর চিন্তাভাবনাও প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। নতুন এই শহরে খনন করা হবে নদী আর খাল। প্রচুর পার্ক তৈরি করে সবুজের চাদরে ঢেকে দেয়া হবে নগরী।

আবাসিক আর অনাবাসিক এলাকার মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রাখা হবে স্পর্শকাতর স্থাপনা সাধারণ এলাকার বাইরে। পুরো শহরে থাকবে উচ্চগতির ইন্টারনেট। সরকারি সেবা পাওয়ার জন্য চালু হবে উন্নত ডিজিটাল ব্যবস্থা।

বর্তমান অবস্থা

২০২৩ সাল থেকে পুরোদমে চলছে রাজধানীর নির্মাণকাজ। বেশ কিছু এলাকা ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ হয়েছে, বিশেষ করে সরকারি জোন। অন্তত ১৪টি মন্ত্রণালয় ও সরকারি অফিস তাদের কার্যক্রম সরিয়ে নিয়েছে এনএসি’তে। শহরতলীর বিশাল বিশাল দালান ব্যবসা-বাণিজ্যের সমস্ত সুযোগসুবিধা নিয়ে চালু হয়েছে। সামরিক দপ্তর হিসেবে প্রায় প্রস্তুত অষ্টাভুজাকৃতির সুরম্য কমপ্লেক্স। খেলার জন্য সুবিশাল মাঠও অনেকটাই দৃশ্যমান। ২০২৫ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এনএসি পরিণত হয়েছে মিশরের প্রশাসনিক কেন্দ্রে। মানুষ এখনো কায়রোকে রাজধানী হিসেবে চিনলেও কাগজপত্রে সেটা পরিবর্তন করা হচ্ছে।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। নির্মাণকাজ পরিকল্পনার তুলনায় যথেষ্ট ধীরে আগাচ্ছে। অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোও আশানুরূপ দ্রুততায় সম্পন্ন হচ্ছে না। তবে প্রজেক্টের ব্যাপকতার বিবেচনা করলে এগুলো স্বাভাবিক।

ভবিষ্যৎ

মিশর সরকার নতুন এই রাজধানীকে অন্তত সাড়ে ছয় মিলিয়ন লোকের বসবাস উপযোগী করতে চায়। এই মডেলের ভিত্তিতে সারা দেশে পরিকল্পিত আরো নগরী গড়ে তোলার ইচ্ছে তাদের। আপাতত লক্ষ্য খুব সহজ। দ্রুত সরকারের সমস্ত কাজকর্ম এনএসি’তে স্থানান্তর, আবাসিক এলাক বর্ধিত করে আরো অনেক মানুষ ধারণের উপযুক্ত করা, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ইত্যাদি। শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার জন্য সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জাদুঘর এবং থিয়েটারও চূড়ান্ত নকশায় রেখেছে।

শহরের জন্য নবায়নযোগ্য বিদ্যুতশক্তিতে লগ্নি করেছে মিশর সরকার। পরবর্তী এক দশকের মধ্যে একে পূর্ণরূপ দিতে বদ্ধপরিকর তারা। তাদের বিশ্বাস এর মাধ্যমে সমস্যা ভারাক্রান্ত কায়রোর ওপর চাপ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এত বড় প্রকল্পের খরচও সেই পরিমাণ। হিসেব অনুযায়ী প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার লাগবে এনএসির প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে। এই টাকা আসছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উৎস থেকে। এর মধ্যে আছে সরকারের নানা সংস্থা, ডেভেলপারদের কাছে জমি বিক্রি, সরকারি-বেসরকারী অংশীদারিত্ব ইত্যাদি। বিদেশী বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য অংশ মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো থেকে আগত। চীনও প্রচুর অর্থ ও প্রযুক্তি দিচ্ছে।

প্রথম ধাপের জন্য ইতোমধ্যে অতিরিক্ত অর্থ খরচ হয়ে গেছে। এটা মূলত হয়েছে অবকাঠামোতগত জটিলতা এবং তারল্য সংকটের কারণে। পাশাপাশি বেসরকারি অংশীদাররাও আস্থার অভাবে অর্থ ছাড় করতে দেরি করেছেন।

এনএসি নিয়ে মিশরে মিশ্র অনুভূতি আছে। সমর্থকদের বক্তব্য কায়রো জরাজীর্ণ এক শহর, প্রশাসনিক কেন্দ্র হবার অনুপযুক্ত। একে মেরামত করার থেকে অধিকতর যুক্তিসঙ্গত নতুন করে একটি কেন্দ্র গড়ে তোলা। এর ইতিবাচক দিক হল নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ। সর্বোপরি এর ফলে অর্থনীতি বেগবান হবে।

তবে সমালোচকদের যুক্তিও শক্ত। তাদের মতে- মিশর ধুঁকছে মূলস্ফীতি, ঋণ আর ডলার সংকটের মতো বড় বড় সমস্যায়। এর মধ্যে এনএসি’র পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করা অর্থের অপচয় মাত্র, মিশরের অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে চোখ সরানোর ধূর্ত প্রয়াস। বরং এই অর্থ ও সম্পদ সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে লাগালে সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া যেত।

এনএসি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। মিশরের আধুনিকায়নের আকাঙ্ক্ষায় এই রাজধানী একটি মাইলফলক হতে থাকবে। এর প্রয়োজনীয়তা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, বরং দশকের পর দশক ধরে জমতে থাকা কায়রোর পর্বতপ্রমাণ সমস্যার পরিণতি। নানা বাধার মুখেও চলমান নির্মাণকাজ প্রমাণ করে এনএসি’কে বাস্তবে রূপ দিতে মিশর সরকার বদ্ধপরিকর, এবং বিকেন্দ্রীকরণের কাজ কিন্তু ইতোমধ্যেই আরম্ভ হয়েছে। সরকারি দপ্তরগুলো ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে নতুন নগরীতে।

তবে এনএসি’র পেছনে বিপুল ব্যয় কিছুটা হলেও উদ্বেগের সৃষ্টি করে, কারণ বাজেটের থেকে অতিরিক্ত অর্থ ইতোমধ্যেই খরচ হয়ে গেছে। তবে বিশাল প্রকল্পে এমনটা অহরহই ঘটে। সরকারের আশা যদি সব পরিকল্পনা অনুযায়ী হয় তাহলে আগামী এক দশকের মধ্যেই গমগমে এক মেট্রোপোলিসে পরিণত হবে এনএসি। আর তা নাহলে টাকার শ্রাদ্ধের আদর্শ এক উদাহরণে পরিণত হবে এই নগরী।

This post was viewed: 13

আরো পড়ুন