Ridge Bangla

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পাহাড়: রাশিয়ার অর্থনীতি কেন এখনো ধসে পড়েনি?

​২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়ার ওপর নজিরবিহীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো। আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা ‘সুইফট’ (SWIFT) থেকে বিচ্ছিন্ন করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জব্দ করা এবং রাশিয়ার তেল-গ্যাসের ওপর আমদানিনিষেধ- সব মিলিয়ে রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্য ছিল পশ্চিমাদের। অনেক বিশেষজ্ঞই তখন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, রাশিয়ার অর্থনীতি কয়েক মাসেই ধসে পড়বে। কিন্তু দুই বছরেরও বেশি সময় পর দেখা যাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র। খোদ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) হিসেবে, ২০২৪ সালে রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক পশ্চিমা দেশের তুলনায় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

​এত সব স্যাংশনের পরও রাশিয়া কীভাবে টিকে আছে এবং এমনকি প্রবৃদ্ধিও অর্জন করছে, তার পেছনে রয়েছে কিছু সুদূরপ্রসারী কৌশল এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা।

​জ্বালানি রপ্তানির নতুন বাজার এবং ‘শ্যাডো ফ্লিট’

​রাশিয়ার আয়ের প্রধান উৎস হলো খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস। পশ্চিমা দেশগুলো রুশ তেলের ওপর ‘প্রাইস ক্যাপ’ বা মূল্যসীমা নির্ধারণ করে দিলেও রাশিয়া তা পাশ কাটাতে সক্ষম হয়েছে। ইউরোপীয় বাজার হারানোর পর রাশিয়া তার জ্বালানি রপ্তানির বিশাল অংশ ভারত, চীন এবং ব্রাজিলের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। ​বিশেষ করে ভারত ও চীন রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ছাড়ে অপরিশোধিত তেল কিনছে। পশ্চিমা বীমা ও জাহাজ ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি এড়াতে রাশিয়া তৈরি করেছে এক বিশাল ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া জাহাজ বহর। এই পুরনো জাহাজগুলোর মাধ্যমে রাশিয়ার তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে, যেখানে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সরাসরি প্রভাব পড়ছে না।

​’ওয়ার ইকোনমি’ বা যুদ্ধের অর্থনীতি

​রাশিয়ার বর্তমান প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ আসছে সরকারের বিপুল সামরিক ব্যয় থেকে। রুশ সরকার তাদের বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করছে। সামরিক কারখানাগুলো দিনরাত সচল রয়েছে, যার ফলে কর্মসংস্থান বেড়েছে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও দীর্ঘমেয়াদে এটি মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ায়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে এটি রাশিয়ার জিডিপি (GDP) সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই ব্যাপারটি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে চাঙা করে রেখেছে।

প্যারালাল ইমপোর্ট বা সমান্তরাল আমদানি

​রাশিয়া থেকে আইফোন, বিএমডব্লিউ বা পশ্চিমা প্রযুক্তির চিপ উধাও হওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবে ঘটেনি। রাশিয়া ‘প্যারালাল ইমপোর্ট’ বা বৈধ উপায়ে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পণ্য আমদানির নীতি গ্রহণ করেছে। তুরস্ক, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো হয়ে পশ্চিমা পণ্য রাশিয়ার বাজারে ঢুকছে। তথ্যানুসারে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ইউরোপীয় দেশগুলোর বাণিজ্য বহুগুণ বেড়েছে, যার বড় একটি অংশ পরোক্ষভাবে রাশিয়ার বাজারে যাচ্ছে।

​কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্ত অবস্থান

​রাশিয়ার অর্থনীতি টিকে থাকার অন্যতম মূল কারিগর ধরা হয় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এলভিরা নাবিউলিনাকে। যুদ্ধের শুরুতে রুবলের দরপতন ঠেকাতে তিনি সুদের হার ২০ শতাংশে বাড়িয়ে দেন এবং কঠোর পুঁজি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেন। এর ফলে রুবল দ্রুত স্থিতিশীল হয়। এছাড়া রাশিয়ার নিজস্ব পেমেন্ট সিস্টেম ‘মির’ (Mir) এবং চীনা সিআইপিএস (CIPS) ব্যবহারের মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এনেছে।

​আমদানির বিকল্প কৌশলের সাফল্য

​পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো রাশিয়া ছেড়ে যাওয়ার পর সেই জায়গা দখল করেছে স্থানীয় এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর কোম্পানি। উদাহরণস্বরূপ, ম্যাকডোনাল্ডসের জায়গায় এসেছে ‘ভুকুসন ই তোচকা’, স্টারবাকসের জায়গায় ‘স্টারস কফি’। যদিও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে, তবে এর ফলে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ চেইন সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। অন্যদিকে চীনের কোম্পানিগুলো (যেমন: শাওমি, চেরি অটোমোবাইলস) রাশিয়ায় তাদের ব্যবসার ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছে, যা রাশিয়ার ভোক্তাদের চাহিদা মেটাচ্ছে।

​গ্লোবাল সাউথ-এর নিরপেক্ষতা

​পশ্চিমারা নিষেধাজ্ঞা দিলেও বিশ্বের বিশাল একটি অংশ, যাকে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বলা হয়, রাশিয়াকে একঘরে করেনি। ব্রিকস (BRICS) দেশগুলোর সম্প্রসারণ এবং রাশিয়ার সাথে এসব দেশের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য সম্পর্ক মস্কোকে নিঃসঙ্গ হতে দেয়নি। পশ্চিমা জোটের বাইরে থাকা দেশগুলো রাশিয়ার সাথে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার ফলে রাশিয়ার অর্থনীতিতে বিশ্ববাজারের প্রবেশাধিকার এখনো রয়ে গেছে।

​রাশিয়া আপাতত টিকে থাকলেও তাদের সামনে বড় কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, শ্রমশক্তির অভাব (কারণ অনেক যুবক যুদ্ধে নিয়োজিত বা দেশত্যাগী) এবং দীর্ঘমেয়াদে আধুনিক প্রযুক্তির সংকট রাশিয়ার অর্থনীতির গতি কমিয়ে দিতে পারে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়াকে ধীরে ধীরে দুর্বল করা, যা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি স্পষ্ট যে, রাশিয়া তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রথম ও বড় ধাক্কাটি সফলভাবে সামলে নিয়েছে। ​রাশিয়ার এই টিকে থাকা বিশ্ব অর্থনীতির নতুন মেরুকরণের সংকেত দেয়, যেখানে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনো বড় শক্তিকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা বর্তমানের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে প্রায় অসম্ভব।

This post was viewed: 5

আরো পড়ুন