Ridge Bangla

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্রাউডফান্ডিংয়ের প্রসার

রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই অর্থের উৎস যদি হয় অস্বচ্ছ, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ কাঠামো এতদিন গড়ে ওঠেনি। সাধারণত বড় বড় শিল্পপতি বা ‘ব্যবসায়ী-রাজনীতিক’ জোটই রাজনীতির মূল পুঁজি জোগান দিয়ে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই রীতির আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার এবং তরুণ প্রজন্মের সচেতনতা রাজনীতির অর্থায়নে নিয়ে এসেছে ‘ক্রাউডফান্ডিং’ বা গণ-অর্থায়ন। সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুদানের মাধ্যমে বড় কোনো রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়নের এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।

ক্রাউডফান্ডিং মূলত একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি। বাংলাদেশে রাজনীতিতে গণচাঁদার ইতিহাস পুরোনো হলেও ডিজিটাল মাধ্যমে এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান সাম্প্রতিক ঘটনা। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় নতুন রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এখন নির্বাচনের ব্যয় মেটাতে সাধারণ মানুষের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

​উল্লেখযোগ্য উদাহরণ: হাদি, ফুয়াদ ও জারা

বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্রাউডফান্ডিংয়ের ধারণাকে জনপ্রিয় করতে বেশ কয়েকজন তরুণ নেতৃত্ব সামনে এসেছেন।

​ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক এবং ২০২৪-এর বিপ্লবের অন্যতম সম্মুখসারির যোদ্ধা শহীদ ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার নির্বাচনী কার্যক্রম ও ইনকিলাব মঞ্চের আদর্শ প্রচারের জন্য তিনি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে গণ-অর্থায়নের ডাক দিয়েছিলেন। তার এই আহ্বানে অভাবনীয় সাড়া পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে যে স্বচ্ছ আদর্শ থাকলে সাধারণ মানুষ নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে দ্বিধা করে না। তার অকাল মৃত্যু এই সম্ভাবনাময় ধারায় এক শোকের ছায়া ফেললেও তার শুরু করা এই মডেলটি অন্য তরুণদের অনুপ্রাণিত করছে।

আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)-এর সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার ফুয়াদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার। তিনি তার দলের কার্যক্রম পরিচালনা এবং রাজনৈতিক প্রচারণার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্রাউডফান্ডিং অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের ব্যবহার প্রচার করছেন। তিনি মনে করেন, মুষ্টিমেয় ধনকুবেরের পকেটস্থ না হয়ে রাজনীতিকে জনতার দোরগোড়ায় নিতে হলে গণ-অর্থায়নের বিকল্প নেই। সম্প্রতি সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও তিনি ভিডিওবার্তায় ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচনে তহবিলে জনসাধারণের কাছে অর্থসহায়তা চেয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত মুখ ডা. তাসনিম জারা ঢাকা-৯ আসনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে মাত্র ২৯ ঘণ্টায় প্রায় ৪৭ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করেছেন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা এবং ডিজিটাল ক্রাউডফান্ডিংয়ের শক্তিমত্তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্রাউডফান্ডিং জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। সাধারণ মানুষ যখন অর্থ দেয়, তখন তারা সেই টাকার সদ্ব্যবহার দেখতে চায়। এটি রাজনীতিকদের ওপর একটি পরোক্ষ চাপ তৈরি করে। বড় ব্যবসায়ীরা যখন অর্থায়ন করেন, তখন তারা নীতি-নির্ধারণে প্রভাব খাটান। ক্রাউডফান্ডিং সেই শেকল ভেঙে দিয়ে জনগণকে রাজনীতির মূল মালিকানায় ফিরিয়ে আনে। এছাড়া বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো এমএফএস সেবার কারণে এখন প্রান্তিক মানুষও সহজেই অংশ নিতে পারছে।

ক্রাউডফান্ডিংয়ের সম্ভাবনা যেমন ব্যাপক, এর চ্যালেঞ্জগুলোও কম নয়। বাংলাদেশের নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রার্থীদের ব্যয়ের সীমা নির্ধারিত থাকে। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে টাকা তোলা নির্বাচনী আইনের লঙ্ঘন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এছাড়া সংগৃহীত অর্থের অডিট না হলে কালো টাকা সাদা করার ঝুঁকিও থেকে যায়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্রাউডফান্ডিং কেবল টাকা তোলার একটি পদ্ধতি নয়, এটি আসলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের একটি সংকেত। মানুষ এখন কেবল ভোট দিয়েই দায়মুক্ত হতে চায় না, তারা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে পরিবর্তনের অংশীদার হতে চাচ্ছে। ডা. তাসনিম জারা, শহীদ ওসমান হাদি বা ব্যারিস্টার ফুয়াদের মতো ব্যক্তিত্বরা যে পথ দেখিয়েছেন, তা যদি আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা যায়, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতি কালো টাকার প্রভাবমুক্ত হয়ে সত্যিকারের ‘জনগণের রাজনীতিতে’ পরিণত হবে।

This post was viewed: 6

আরো পড়ুন