Skip to main content

Ridge Bangla

নিকোলাস মাদুরো: বাস চালক থেকে ভেনেজুয়েলার ‘লৌহমানব’ এবং আমেরিকার ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’

​লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে গত এক দশকের সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত এবং প্রতাপশালী নামগুলোর একটি হচ্ছে নিকোলাস মাদুরো। একসময়ের সাধারণ বাস চালক থেকে আজ একটি তেলসমৃদ্ধ দেশের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠা- মাদুরোর এই যাত্রা রূপকথার চেয়েও রোমাঞ্চকর। একদিকে তাঁর সমর্থকরা তাঁকে ‘জনগণের প্রেসিডেন্ট’ মনে করেন, অন্যদিকে বিরোধী পক্ষ এবং পশ্চিমা বিশ্বের চোখে তিনি একজন ‘স্বৈরশাসক’। বর্তমানে আমেরিকার বিচার বিভাগের জারি করা কয়েক কোটি ডলারের পুরস্কার এবং গ্রেফতার থেকেই অনুমান করা যায় তিনি বিশ্ব রাজনীতির জটিল সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক আলোচিত চরিত্র তিনি।

​১৯৬২ সালে কারাকাসে জন্মগ্রহণ করেন মাদুরো। তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় খুবই সাদামাটাভাবে। তিনি কারাকাস মেট্রো সিস্টেমে একজন বাস চালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি শ্রমিক ইউনিয়নের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তবে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় ১৯৯২ সালে, যখন তিনি কারাবন্দী বিপ্লবী নেতা হুগো শাভেজের সাথে দেখা করেন। শাভেজের মুক্তির জন্য মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস যে অক্লান্ত লড়াই করেছিলেন, তা শাভেজের মনে মাদুরোর প্রতি অটুট বিশ্বাস তৈরি করে।

​শাভেজ ক্ষমতায় আসার পর মাদুরোর উত্থান ছিল উল্কার বেগে। ১৯৯৯ সালে সংবিধান সভার সদস্য, এরপর জাতীয় পরিষদের স্পিকার, ২০০৬ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ২০১২ সালে ভাইস-প্রেসিডেন্ট। শাভেজ তাঁকে তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী মনে করতেন। ২০১৩ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আগে শাভেজ দেশবাসীকে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন যে, তাঁর অনুপস্থিতিতে মাদুরোকেই যেন নেতা নির্বাচন করা হয়। শাভেজের মৃত্যুর পর এক হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনে জয়ী হয়ে মাদুরো ভেনেজুয়েলার মসনদে বসেন।

​মাদুরোর সাথে আমেরিকার দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে আদর্শিক ও অর্থনৈতিক কারণ। শাভেজের মতো মাদুরোও ‘একবিংশ শতাব্দীর সমাজতন্ত্র’ বা বলিভারিয়ান বিপ্লবের পথে হাঁটেন। ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের খনিগুলোর ওপর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং মাদুরোর রাষ্ট্রীয়করণ নীতি ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করে। এরপর ওবামা আমল থেকে শুরু হয়ে ট্রাম্পের সময় ভেনেজুয়েলার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আমেরিকা। এর ফলে দেশটির অর্থনীতি ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবং মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়। ২০১৯ সালে আমেরিকা বিরোধীদলীয় নেতা জুয়ান গুয়াইদোকে ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা মাদুরো সরকারকে উৎখাতের সরাসরি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীর সমর্থনে মাদুরো সেই যাত্রায় টিকে যান।

আমেরিকার বিচার বিভাগ (Department of Justice) মাদুরোকে কেবল রাজনৈতিক শত্রু নয়, বরং একজন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০২০ সালে আমেরিকার তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার মাদুরো এবং তাঁর সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘নারকো-টেরোরিজম’ বা মাদক সন্ত্রাসের অভিযোগ আনেন। আমেরিকার দাবি, মাদুরো কলম্বিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী FARC-এর সাথে মিলে আমেরিকায় বিপুল পরিমাণ কোকেন পাচারের ষড়যন্ত্র করেছেন। মাদুরোকে ধরার জন্য বা তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তথ্যের জন্য আমেরিকা ১৫ মিলিয়ন (দেড় কোটি) ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে রেখেছে।

​সাম্প্রতিক সময়ে মাদুরোর ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং বিভিন্ন দেশ তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত শুরু করেছে। বিরোধীদের দমন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করেছে। আমেরিকার বিচার বিভাগ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের (যেমন- অ্যালেক্স সাব) গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, মাদুরো যদি ভেনেজুয়েলার বাইরে বা বন্ধুত্বপূর্ণ নয় এমন কোনো দেশে সফর করেন, তবে তাঁকে গ্রেফতার করার একটি আইনি বাধ্যবাধকতা অনেক দেশের ওপরই রয়েছে। মূলত মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই আমেরিকা এই ‘আইনি গ্রেফতারি’র জাল বিস্তার করে রেখেছিল।

​এত চড়াই-উতরাই সত্ত্বেও মাদুরো এতদিন পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো সামরিক বাহিনীর অকুন্ঠ সমর্থন এবং রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো দেশগুলোর কৌশলগত সহযোগিতা। তিনি পশ্চিমা বিশ্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন, যদিও অভিযোগ রয়েছে সাধারণ ভেনেজুয়েলানরা চরম দারিদ্র্য ও দেশত্যাগের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু গত ৩ জানুয়ারি আমেরিকা সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালায়। এই অভিযানেই মাদুরো ও তার স্ত্রী গ্রেফতার হন মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের হাতে। তাকে ও তার স্ত্রী’কে আমেরিকায় নিয়ে আসা হয় এবং শোনা যাচ্ছে, আমেরিকার মাটিতে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

​নিকোলাস মাদুরো আধুনিক ইতিহাসের এমন এক নেতা, যিনি নিষেধাজ্ঞার পাহাড় আর গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে একটি জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর রাজনীতিতে টিকে থাকার ক্ষমতা বিস্ময়কর। তবে আমেরিকার সাথে এই দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি নিরাপদ থাকতে পারেননি। মাদুরোর পতন বা গ্রেফতার কেবল ভেনেজুয়েলার নয়, বরং পুরো দক্ষিণ আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসতে যাচ্ছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

This post was viewed: 29

আরো পড়ুন