Ridge Bangla

তিব্বত: কেন একে ‘নিষিদ্ধ দেশ’ বলা হয়?

​হিমালয় পর্বতমালার ওপারে মেঘের রাজ্যে ঘেরা এক রহস্যময় জনপদ ‘তিব্বত’। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই ভূখণ্ডকে বলা হয় ‘বিশ্বের ছাদ’। শত শত বছর ধরে বহির্বিশ্বের কাছে তিব্বত ছিল এক পরম বিস্ময়। তিব্বতের রাজধানী লাসা-কে বলা হতো ‘নিষিদ্ধ শহর’ (Forbidden City)। অন্যদিকে পুরো দেশটিকে বলা হতো ‘নিষিদ্ধ দেশ’। কিন্তু বর্তমানের আধুনিক স্যাটেলাইট ও আকাশপথের যুগেও কেন তিব্বতের গায়ে এই রহস্যের নাম জড়িয়ে আছে? এর নেপথ্যে রয়েছে ভৌগোলিক দুর্গমতা, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা এবং রাজনৈতিক জটিলতার এক দীর্ঘ ইতিহাস।

​তিব্বতকে নিষিদ্ধ দেশ বলার প্রথম ও প্রধান কারণ ছিল এর ভৌগলিক অবস্থান। হিমালয় পাহাড়ের বিশাল প্রাচীর তিব্বতকে পৃথিবীর বাকি অংশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। বিশ শতকের শুরুর দিক পর্যন্তও তিব্বতে যাওয়ার কোনো সহজ পথ ছিল না। নেপাল বা ভারত থেকে পাহাড় ডিঙিয়ে সেখানে পৌঁছাতে হলে তুষারপাত, অক্সিজেনের অভাব এবং চরম বৈরী আবহাওয়ার মোকাবিলা করতে হতো। এই দুর্গম পথের কারণে সাধারণ পর্যটকদের জন্য তিব্বত ছিল একপ্রকার ‘অসাধ্য’ গন্তব্য। মূলত এই দুর্ভেদ্যতা থেকেই একে ‘নিষিদ্ধ’ মনে করা হতো।

​তিব্বতের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণভাবে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের ওপর নির্ভরশীল। কয়েক শতাব্দী ধরে তিব্বতের শাসকরা মনে করতেন, বিদেশিদের প্রবেশ তাদের পবিত্র ধর্ম ও সংস্কৃতিকে কলুষিত করতে পারে। বিশেষ করে খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রভাব এবং পশ্চিমা আধুনিকতার ঢেউ থেকে নিজেদের ঐতিহ্যকে বাঁচাতে তিব্বতের দালাই লামারা এক কঠোর বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো বিদেশি নাগরিকের লাসা শহরে প্রবেশ ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যারা গোপনে ঢোকার চেষ্টা করতেন, তাদের কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হতো। এই ধর্মীয় কঠোরতা তিব্বতকে বিশ্বের কাছে আরও রহস্যময় ও ‘নিষিদ্ধ’ করে তুলেছিল।

​উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের শুরুতে মধ্য এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যে এক গোপন রেষারেষি শুরু হয়, যাকে বলা হয় ‘গ্রেট গেম’। তিব্বত ছিল এই দুই পরাশক্তির মাঝখানে এক বাফার স্টেট। ব্রিটিশরা ভয় পেত রাশিয়া তিব্বত দখল করে নিলে ভারতের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে, আর রাশিয়া ভাবত উল্টোটা। এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে দুই পক্ষই তিব্বতে বিদেশিদের যাতায়াত সীমিত রাখতে উৎসাহিত করেছিল। ১৯০৪ সালে ব্রিটিশ কর্নেল ইয়াংহাজব্যান্ড এক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে লাসা-তে প্রবেশ করেন, যা প্রথমবারের মতো তিব্বতের ‘নিষিদ্ধ’ তকমা কিছুটা হলেও শিথিল করেছিল।

​তিব্বতের প্রাণকেন্দ্র লাসা। এখানে অবস্থিত রাজকীয় পোতালা প্রাসাদ (Potala Palace) ছিল দালাই লামার বাসস্থান। লাসাকে কেন নিষিদ্ধ শহর বলা হতো? কারণ, এটি ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি স্থান। কেবল বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী ছাড়া অন্য কারও জন্য এখানে পা রাখা ছিল অকল্পনীয়। অ্যালেকজান্দ্রা ডেভিড-নীল নামের একজন ফরাসি নারী প্রথম পশ্চিমা হিসেবে ১৯২৪ সালে ভিক্ষু সেজে ছদ্মবেশে লাসায় প্রবেশ করেছিলেন। তার সেই রোমাঞ্চকর অভিযানের গল্প যখন বিশ্ববাসী জানতে পারে, তখন তিব্বতের প্রতি মানুষের কৌতূহল বহুগুণ বেড়ে যায়।

​১৯৫০ সালে চীন তিব্বত দখল করার পর থেকে এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যায়। তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা চতুর্দশ দালাই লামা ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। এরপর থেকে চীন সরকার তিব্বতে বিদেশিদের প্রবেশের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। বর্তমান যুগেও তিব্বত ভ্রমণ করতে হলে কেবল চীনা ভিসা যথেষ্ট নয়, বরং ‘তিব্বত এন্ট্রি পারমিট’ (Tibet Entry Permit) নামক বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়। নির্দিষ্ট ট্যুর অপারেটর ছাড়া এবং নির্দিষ্ট কিছু জায়গা ছাড়া পর্যটকদের অবাধ চলাচল আজও সেখানে নিয়ন্ত্রিত। এই রাজনৈতিক কড়াকড়িই আধুনিক যুগে তিব্বতকে পুনরায় ‘নিষিদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত করেছে।

​তিব্বত আজ আর পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। সেখানে এখন ট্রেন চলে, বিমান নামে, এমনকি পর্যটনও অনেক উন্নত হয়েছে। তবুও ‘নিষিদ্ধ দেশ’ শব্দটি তিব্বতের সাথে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে আছে। ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা থেকে শুরু হওয়া এই তকমা সময়ের আবর্তে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক রূপ লাভ করেছে। তবে পর্যটকদের কাছে এই ‘নিষিদ্ধ’ শব্দটিই সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। মানুষ আজও সেই রহস্যময় লাসা এবং তিব্বতি পাহাড়ের টানে সেখানে ছুটে যেতে চায়, যেখানে এক সময় পা রাখা ছিল মৃত্যুদণ্ডের সমান অপরাধ।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন