Ridge Bangla

কোরীয় উপদ্বীপের বিভাজন: এক জাতির দ্বিখণ্ডিত হওয়ার নেপথ্য ইতিহাস

​বর্তমান বিশ্বের মানচিত্রের দিকে তাকালে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়াকে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দেশ হিসেবে দেখা যায়। একদিকে উত্তর কোরিয়া তার কঠোর সাম্যবাদী শাসন আর পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য পরিচিত, অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া তার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং অভাবনীয় অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের (কে-পপ, কে-ড্রামা) জন্য বিশ্বজুড়ে নন্দিত। অর্থাৎ দুটি দেশই বলতে গেলে বিপরীত দিকে গিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১৯৪৫ সালের আগে এই দুটি দেশ ছিল একটি একক ভূখণ্ড এবং একীভূত জাতি। কেন এবং কীভাবে এই বিভক্তি ঘটেছিল, তার উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের তাকাতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) জটিল সমীকরণে।

​কোরীয় উপদ্বীপ বিভক্তির গল্পের শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। সাম্রাজ্যবাদী জাপান সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠলে তাদের সাম্রাজ্যের আয়তন বড় করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তব রূপ লাভ করে। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯১০ সালে জাপান কোরিয়া দখল করে নেয় এবং দীর্ঘ ৩৫ বছর সেখানে অত্যন্ত কঠোর ও নিষ্ঠুর শাসন চালায়। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয় কোরিয়ার জন্য স্বাধীনতার বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু সেই স্বাধীনতা কোরিয়াবাসীর জন্য কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। জাপানি সৈন্যরা যখন কোরিয়া থেকে পাততাড়ি গুটাচ্ছিল, তখন সেখানে এক বিশাল ‘পাওয়ার ভ্যাকুয়াম’ বা ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। এই শূন্যস্থান পূরণ করতে এগিয়ে আসে তৎকালীন দুই বিশ্ব পরাশক্তি- সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

​১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে যখন জাপান আত্মসমর্পণ করে, তখন সোভিয়েত বাহিনী উত্তর দিক থেকে কোরিয়ায় প্রবেশ করতে শুরু করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভয় পাচ্ছিল যে, পুরো উপদ্বীপ হয়তো সোভিয়েত তথা সাম্যবাদের দখলে চলে যাবে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা তড়িঘড়ি করে একটি সিদ্ধান্ত নেন। ​মার্কিন কর্নেল ডিন রাস্ক এবং চার্লস বোনস্টিল একটি ম্যাপ খুলে উপদ্বীপের ঠিক মাঝখান দিয়ে ‘৩৮তম সমান্তরাল রেখা’ (38th Parallel) বরাবর একটি কাল্পনিক সীমান্ত টেনে দেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, এই রেখার উত্তর অংশ সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ অংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। মজার ব্যাপার হলো, এই বিশাল ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি নিতে তারা মাত্র আধঘণ্টা সময় ব্যয় করেছিলেন এবং কোরিয়ার কোনো নেতার সাথে এ বিষয়ে কোনো পরামর্শই করা হয়নি।

​শুরুতে এই বিভক্তি ছিল সাময়িক। পরিকল্পনা ছিল এরকম যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে নির্বাচন দিয়ে পুরো দেশ আবার একত্র করা হবে। কিন্তু ততদিনে শুরু হয়ে গিয়েছিল ‘কোল্ড ওয়ার’ বা স্নায়ুযুদ্ধ। উত্তর অংশে সোভিয়েতরা কিম ইল-সাং-এর নেতৃত্বে একটি কট্টর সাম্যবাদী রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করে। অন্যদিকে, দক্ষিণ অংশে মার্কিন মদদে সিংম্যান রি’র নেতৃত্বে পুঁজিবাদী  ও পশ্চিমা ঘেঁষা শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ​১৯৪৮ সালের মধ্যে এই দুটি ভিন্ন মতাদর্শের দ্বন্দ্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পুরো কোরিয়ায় একটি নির্বাচন করার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ফলস্বরূপ, ১৯৪৮ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দুটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে ‘রিপাবলিক অফ কোরিয়া’ (দক্ষিণ) এবং ‘ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অফ কোরিয়া’ (উত্তর) আত্মপ্রকাশ করে।

​বিভক্তির পর দুই পক্ষই পুরো উপদ্বীপকে নিজের শাসনে আনতে চেয়েছিল। এই উত্তেজনা থেকে ১৯৫০ সালের ২৫ জুন উত্তর কোরিয়া হঠাৎ দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণ করে বসে। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী ‘কোরীয় যুদ্ধ’। তিন বছর স্থায়ী এই যুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায় এবং পুরো উপদ্বীপ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে এবং চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর কোরিয়ার পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে লড়লে এটি একটি বৈশ্বিক সংকটে রূপ নেয়। ​১৯৫৩ সালে কোনো বিজয় বা পরাজয় ছাড়াই একটি ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তি’ (Armistice Agreement) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির ফলে ৩৮তম সমান্তরাল রেখার কাছে একটি ‘ডিমিলিটারাইজড জোন’ বা ডিএমজেড (DMZ) তৈরি করা হয়, যা আজও বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও বিপজ্জনক সীমান্ত হিসেবে পরিচিত। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কোনো চূড়ান্ত ‘শান্তি চুক্তি’ না হওয়ায় কৌশলগতভাবে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া আজও যুদ্ধের অবস্থায় রয়েছে।

​কোরীয় উপদ্বীপ ভাগ হওয়ার মূল কারণ ছিল পরাশক্তিদের আধিপত্যের লড়াই এবং ভিন্ন মতাদর্শের সংঘাত। কোরিয়াবাসীর নিজের কোনো দোষ বা ইচ্ছা এই বিভক্তির পেছনে ছিল না। এর ফলে কয়েক হাজার পরিবার একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা আজও হয়তো কোনো একদিন পুনর্মিলনের আশায় দিন গুণে।

​আজ সাত দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। উত্তর কোরিয়া তাদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে চলেছে, আর দক্ষিণ কোরিয়া নিজেকে অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু ৩৮তম সমান্তরাল রেখার সেই কাল্পনিক দেয়ালটি আজও দুই কোরিয়াকে শুধু ভৌগোলিকভাবেই নয়, বরং মানসিকভাবেও যোজন যোজন দূরত্বে ঠেলে দিয়েছে। পরাশক্তিদের সেই ‘আধঘণ্টার সিদ্ধান্ত’ আজও কোটি কোটি মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

This post was viewed: 6

আরো পড়ুন