Ridge Bangla

পোড়া টাকায় সয়লাব বাজার: ইয়াবার আগুনে পুড়ছে জাতীয় সম্পদ

সকালবেলা কাঁচা বাজারে সবজি ক্রয় করতে গিয়েছেন মো. রাসেল। ১১০ টাকার সবজি ক্রয় শেষে দোকানদারকে ২০০ টাকার একটি নোট দেওয়াতে দোকানদার তাকে ৯০ টাকা ফেরত দিলেন। সেখানে দেখা গেল ২টি ১০ টাকার নোটের উভয় দিক পোড়া। রাসেল মিয়া দোকানদারকে নোট দুটি পরিবর্তন করে দিতে বললে প্রত্যুত্তরে দোকানদার বলেন, “মামা, বাজারে এখন সব নোটই এমন পোড়া। এগুলোই এখন চলে, পোড়া টাকায় কোনো সমস্যা নাই, আপনি নিশ্চিন্তে নিয়ে যান।”

মতিঝিলের দিলকুশায় আলী হোসেন খুচরা সিগারেট বিক্রির ভ্রাম্যমান দোকান পরিচালনা করেন। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হলেও সকাল থেকে সন্ধ্যা তার দোকানে ভিড় লেগেই থাকে। দুপুরে দোকানে একজন ক্রেতা এসে সিগারেট কেনার পর ১০ টাকার দুটি নোট দিলে নোট দেখে তিনি বলে ওঠেন, আবারও এই পোড়া নোট! তার ভাষ্যে, দেশের সব টাকাই এখন পুড়ে গেছে।

এ ব্যাপারে তার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, “শুধু আমি না, আপনি রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে যেকোনো ফুটপাতের ব্যবসায়ীর কাছে খোঁজ নিন। সকলেই বলবে যে, তারা দিনে কম করে হলেও দুই থেকে চারটি আগুনে পোড়া নোট পায়। আগুনে পোড়া নোট এখন দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি নতুন নোট দেখে মনে হবে কিছুই হয়নি, হয়তো কালকে বাজারে ছাড়া হয়েছে। কিন্তু সেটা আপনি হাতে নিলে দেখবেন একটা কোণা পোড়া।”

তার এই কথার সত্যতা যাচাই করতে অনুসন্ধানে নামলে বাস্তবতার আরো ভয়ানক চিত্র ফুটে ওঠে। কথা হয় রাস্তার রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে ফুটপাতের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও কাঁচামাল বিক্রেতার সঙ্গে। দেশে কাগুজে মুদ্রার পোড়া নোটগুলো যে এখন মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, সে সম্পর্কে অবগত তারা সকলেই। তবে এই পোড়া নোটগুলোর উৎস সম্পর্কে জানতে গিয়ে সামনে এসেছে দেশের মাদকাসক্তির এক রূঢ় বাস্তবতা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক সেবনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কাগুজে মুদ্রার নোট। আর ইয়াবা সেবনে এই কাগুজে মুদ্রার ব্যবহারই পোড়া টাকায় বাজার সয়লাব হওয়ার কারণ। আগে এই ধরনের মাদক সেবনের জন্য ক্যালেন্ডারের শক্ত কাগজ, সিগারেটের প্যাকেটের ভেতর থাকা পাতলা কাগজসহ অন্যান্য কৃত্রিম বস্তু ব্যবহার করা হলেও, এখন এই জায়গা পুরোপুরি দখল করেছে কাগুজে মুদ্রার নোট। ফলে নোটগুলো আগুনে পুড়ে দ্রুত নষ্ট হয়ে অচল হয়ে পড়ছে, যা সরাসরি দেশের অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলছে।

মাদকসেবীরা ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক সেবনের জন্য কাগজের নোট রোল করে নাকে টেনে মাদক গ্রহণ করে অথবা নোট ব্যবহার করে আগুনে গরম করে ধোঁয়া গ্রহণ করে। এতে নোটগুলো সরাসরি আগুনের সংস্পর্শে এসে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অল্প সময়েই অচল হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ নষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্ত নোট প্রত্যাহার করে নতুন নোট ছাপাতে বাধ্য হয়। নোট নষ্ট হওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে ব্যবহারজনিত ক্ষয়, পানি বা তাপে নষ্ট হওয়ার মতো কারণ উল্লেখ করা হলেও বর্তমানে মাদক সেবনজনিত কারণে নষ্ট হওয়া টাকার পরিমাণও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বেড়েছে।

করোনার সময় থেকে দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা উচ্চহারে বাড়ছে। লকডাউনের সময় দীর্ঘদিন ঘরে বসে থাকা, মানসিক চাপ ও অবসরের কারণে অনেকেই মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। মাদক সেবনের প্রেক্ষিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নোট পুড়ে যাওয়ার ঘটনাও এখন আলোচনায় আসছে, যা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে দেশের অর্থনীতিকে।

জাতীয় মুদ্রা কেবল অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যম নয়, এটি রাষ্ট্রের মর্যাদা ও অর্থনীতির প্রতীক। যখন একটি টাকার নোট আগুনে পুড়ে নষ্ট হচ্ছে, তখন সেটি কেবল কাগজের ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ও হচ্ছে, যা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের নানাবিধ সমস্যায় যোগ করছে নতুন মাত্রা।

ইয়াবা সেবনে কাগুজে মুদ্রার এই ব্যবহার যে শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ, বিষয়টি এমন নয়। তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বাইরেও। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিসহ একাধিক দেশীয় গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময় শিরোনামে এসেছে, ইয়াবা সেবনের জন্য ভারতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশি কাগুজে মুদ্রার নোট।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভারতের মাদক সেবীদের অনেকের কাছে নেশাদ্রব্য গ্রহণের জন্য বাংলাদেশি নতুন দুই টাকার নোট খুবই জনপ্রিয়। ইয়াবা সেবনে আকাশচুম্বী চাহিদার কারণে দেশটিতে বাংলাদেশের ২ টাকার নোট ৫ রুপিতে পর্যন্ত বিক্রির খবরও উল্লেখ করা হয় তখন।

মাদক সেবনের উদ্দেশ্যে দেশ থেকে ভারতে পাচার হওয়ার সময় বিপুল পরিমাণ কাগজের নোটসহ পাচারকারীদের আটক করার খবর গণমাধ্যমে এসেছে সময়ে সময়ে। এ থেকেই বোঝা যায় যে, মাদক সেবনের জন্য দেশীয় কাগুজে নোটের ব্যবহার এখন শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বাইরেও।

করোনার পূর্বে দেশে মাদক সেবনের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুই টাকা, পাঁচ টাকার নোট ব্যবহার করা হলেও এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। বর্তমানে ২ টাকা ও ৫ টাকার নোট দিয়ে মাদক সেবনের সাথে পাল্লা দিয়ে ১০ টাকা, ২০ টাকা ও ৫০ টাকার নোট ব্যবহারের সংখ্যাও বেড়েছে বহুলাংশে।

ইয়াবা সেবনের ফলে আগুনে পুড়ে যাওয়া যেসব নোট হাতে পাওয়া যাচ্ছে, তার মধ্যে এখন ২ টাকা ও ৫ টাকার নোটের তুলনায় ১০ টাকা, ২০ টাকা ও ৫০ টাকার নোটের সংখ্যাই বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে। এর পেছনে একটি বড় কারণ মাদকসেবীদের কারণেই বাজার থেকে কমে গেছে ২ টাকা ও ৫ টাকার কাগুজে মুদ্রার সংখ্যা। ২ টাকা ও ৫ টাকার নোটের ব্যাপারে খবর নিতে গেলে অনেকেই জানিয়েছেন, ইয়াবাসেবীদের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণেই বাজার থেকে কমে গেছে ২ টাকা ও ৫ টাকার নোট। তাই এখন তারা অনেকটা বাধ্য হয়েই ১০ টাকা, ২০ টাকা সহ ক্ষেত্রবিশেষে অন্যান্য বড় নোট ব্যবহার করে মাদক সেবন করছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতিদিন সারাদেশে ৮ লাখের বেশি মানুষ ইয়াবা সেবন করে। এই ৮ লাখ ইয়াবাসেবীর অর্ধেকও যদি ইয়াবা সেবনের সময় একটি করে নোট ব্যবহার করে, তাহলে প্রতিদিন ৪ লাখ নোট আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে বিনিময় অযোগ্য পড়ে। আর এই চার লাখ টাকার নোটের প্রতিটিকে যদি ৫ টাকা করে হিসেব করা হয়, তাহলে টাকার অঙ্কে প্রতিদিন ধ্বংস হচ্ছে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা; বছরে যার পরিমাণ দাঁড়ায় কয়েক কোটি টাকায়।

এছাড়া ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি একটি জাতীয় গবেষণার ফলাফলে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদক ব্যবহার করছেন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে ইয়াবাসেবীর সংখ্যা ২৩ লাখ।

এই ইয়াবা আসক্তরাই তাদের নেশার সময় ব্যবহার করছে কাগজের নোট। ফলে নষ্ট হচ্ছে দেশের সম্পদ টাকা, আবার নষ্ট হওয়া টাকাগুলো সংগ্রহ করে পুনরায় নতুন টাকা ছাপাতেও লাগছে খরচ।

এ বিষয়ে আলাপকালে কয়েকজন ইয়াবাসেবী জানান, তারা আগে ইয়াবা সেবনের জন্য ক্যালেন্ডারের শক্ত কাগজ, সিগারেটের প্যাকেটের ভেতরের কাগজ ব্যবহার করতেন। তবে সেসব সঙ্গে রাখলে পুলিশ সন্দেহ করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিন্তু টাকা সঙ্গে রাখা স্বাভাবিক বিষয় হওয়ায় সন্দেহের ঝুঁকি কম। তাই এখন অনেকেই নোট ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। এই নিরাপত্তা ইয়াবা সেবনে টাকা ব্যবহারের বড় কারণ বলে জানান তারা।

তারা বলেন, বাজারে থাকা নতুন হালকা রঙের টাকার নোটগুলো ইয়াবা সেবনের জন্য খুবই ভালো। তাদের মতে, এগুলো অতি সহজে গোল করে ‘পাইপ’ বানানো যায়। এরপর সেটি নাকে দিয়ে সহজেই ইয়াবার ধোঁয়া টেনে নেওয়া যায়। কিছুক্ষণ এভাবে টানার পর নোটের মাথার অংশ পুড়ে যায়। এরপর সেটির আর কার্যকারিতা থাকে না। তাদের ইয়াবা সেবনে এভাবেই নষ্ট হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় বিনিময়মাধ্যম কাগুজে মুদ্রার নোট।

বাংলাদেশে মাদক সমস্যা এখন আর কেবল একটি সামাজিক ব্যাধি নয়। এটি ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে এক ভয়াবহ জাতীয় সংকটে। গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন, আইস বা ক্রিস্টাল মেথের মতো ভয়ংকর মাদক দেশে যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে এখন শুধু আর মানুষ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদও। আজ যদি আমরা এই সমস্যাকে গুরুত্ব না দিই, তবে আগামী দিনে এর মূল্য দিতে হবে আরও বেশি। কারণ মাদকে টাকার নোট নয়, পুড়ে যাচ্ছে একটি জাতির সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।

This post was viewed: 11

আরো পড়ুন