আজ ১৯ জানুয়ারি, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক অমর নাম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী। তিনি শুধু একটি সময়ের রাজনীতির প্রতিনিধি ছিলেন না, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক বিপ্লবী প্রতীক। সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক, মুক্তিযোদ্ধা থেকে রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা- জিয়াউর রহমানের জীবন ও কর্ম একাধিক স্তরে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।
বগুড়ার বাগবাড়িতে ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। শৈশব কেটেছে তৎকালীন ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাবের মধ্যে। কলকাতা ও করাচিতে শিক্ষালাভের পর তিনি সামরিক জীবন বেছে নেন। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দিয়ে ১৯৫৫ সালে কমিশন লাভের মাধ্যমে তার সৈনিক জীবন শুরু হয়। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য তিনি ‘হিলাল-ই-জুরাত’ খেতাব পান।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার শুরুতে জিয়াউর রহমান সেনা কর্মকর্তা থেকে বিদ্রোহী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি জাতিকে সাহস যুগিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে ‘জেড ফোর্স’ গঠন করে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধশেষে ‘বীর উত্তম’ খেতাবপ্রাপ্ত এই সেনানায়ক এক জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন জিয়া। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি ক্ষমতাকে কেবল সামরিক শাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে উদ্যোগী হন। ১৯৭৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনেন।
জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের মূল লক্ষ্য ছিল গ্রাম থেকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চিত্র উন্নত করা। ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’, খাল খনন, সেচ প্রকল্প ও গ্রাম সরকার ব্যবস্থা তার উদ্যোগের অংশ। তিনি উৎপাদন এবং স্বাবলম্বী অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছিলেন। কৃষি ও শিল্পের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা- সবকিছুই তার অর্থনৈতিক দর্শনের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তার শাসনামলে নারী উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পুলিশে নারীর অন্তর্ভুক্তি, মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সংসদে সংরক্ষিত আসন বৃদ্ধি- এসব পদক্ষেপ সমাজের পরিবর্তনের সূচক ছিল। যৌতুকবিরোধী আইন, যুব উন্নয়ন কর্মসূচি, প্রাথমিক ও বয়স্ক শিক্ষা বিস্তার সামাজিক সংস্কারেও তিনি এগিয়ে ছিলেন।
‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণা তার রাজনৈতিক দর্শনের মূল। ভাষাভিত্তিক নয়, রাষ্ট্রভিত্তিক ও সার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক জাতীয় পরিচয় তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। সংবিধানে আনা পরিবর্তন, ধর্মীয় নীতি, মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সংহতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তাকে নতুন দিক নির্দেশ করেছে। দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার স্বপ্ন থেকে সার্কের ধারণা আসে। চীন, পশ্চিমা দেশ ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন জিয়া। তার কূটনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে বহুমাত্রিক করে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন জিয়াউর রহমান। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে থেমে যায় তার জীবন। চার বছরের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বকাল অল্প হলেও প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী।
জিয়াউর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “শহীদ জিয়া ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা রাষ্ট্রনায়ক, মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সের অধিনায়ক। তার দেশপ্রেম, সাহস, সততা ও সহজ-সরল জীবন আজও আমাদের জন্য আদর্শ।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. রমিত আজাদ বলেন, “জিয়াউর রহমান রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছেন। তার ‘১৯ দফা’ কর্মসূচি আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ব্লু-প্রিন্ট।”