২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যখন জনমনে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তার মধ্যে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির পুরনো প্রবণতা আবারও প্রকট হয়ে উঠেছে। গত দেড় দশকের রাজনৈতিক বলয় থেকে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে পদোন্নতি ও কাঙ্ক্ষিত পোস্টিং নিশ্চিত করতে আমলাদের একটি বড় অংশ এখন নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।
বিশেষ করে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে প্রশাসনের ভেতরে এই ভোল পাল্টানোর প্রতিযোগিতা কয়েক গুণ বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যম ও মাঠ পর্যায়ের তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর গুলশান ও পল্টন এলাকার রাজনৈতিক কার্যালয়গুলোতে এখন নিয়মিত যাতায়াত করছেন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা।
দিনের বেলায় দাপ্তরিক কাজ শেষ করে কিংবা অনেক ক্ষেত্রে অফিস চলাকালেই তারা ধরনা দিচ্ছেন রাজনৈতিক নেতাদের ড্রয়িংরুম, অফিস কক্ষে। অভিযোগ রয়েছে, যারা গত এক যুগে নিজেদের আওয়ামী লীগের আদর্শিক সৈনিক হিসেবে জাহির করতেন, তারাই এখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়া বুঝে বিএনপি, জামায়াত কিংবা নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির শুভাকাঙ্ক্ষী সাজার চেষ্টা করছেন।
দেখা গেছে, রাজধানীর অফিসার্স ক্লাব এখন পেশাগত আলোচনার চেয়ে রাজনৈতিক লবিংয়ের বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তারা নিয়মিত মিলিত হয়ে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ মেলাচ্ছেন।
এছাড়া জামায়াতের পল্টন কার্যালয় এবং বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে আমলাদের যাতায়াত এখন অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। এমনকি শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা ছাত্রনেতাদের পেছনেও অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ঘুরতে দেখা গেছে, যা সরকারি চাকরি বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
নির্বাচন কমিশনের কাছেও প্রশাসনের এমন পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে অভিযোগ জমা পড়েছে। আসন্ন নির্বাচনের মাঠ প্রশাসনে যারা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের বড় একটি অংশ যদি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত থাকেন, তবে ভোটের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে বলে অভিমত তাদের। বিশেষ করে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং পর্যায়ের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে খোদ রাজনৈতিক দলগুলোই এখন সোচ্চার।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রশাসনের এই দলীয়করণ বন্ধ না হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি এবং দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু সরকার যদি নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন না করে কেবল লবিং দেখে পদোন্নতি দেয়, তবে সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হবেন। এতে প্রশাসনের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়বে।
তারা আরও বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া প্রশাসনের এই রোগ সারানো সম্ভব নয়। এই ধরনের কার্যালাপের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে রং পাল্টে সুবিধা নেওয়ার এই সংস্কৃতি চলতেই থাকবে।
৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল ও ওএসডি করার প্রক্রিয়া শুরু হলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যারা এক সময় নির্দিষ্ট নেতার নামে স্লোগান দিতেন, তারাই এখন নিজেদের বঞ্চিত দাবি করে নতুনভাবে সুযোগ নিতে চাইছেন। অতিরিক্ত সচিব থেকে শুরু করে উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই দৌড়ঝাঁপ প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।