দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ব্যবহার করে সংগঠনের নিয়ম ভেঙে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে রিজ বাংলার অনুসন্ধানে। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতিকে ঘিরে এমন গুরুতর অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ খ্যাত মোর্শেদুল আলম ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা।
জানা গেছে, মোর্শেদুল আলমের নেতৃত্বাধীন এই চক্র কিছু অ-মুক্তিযোদ্ধা এমপি, মন্ত্রী, সচিব, পুলিশ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে আঁতাত করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত ফ্ল্যাট অবৈধভাবে অ-মুক্তিযোদ্ধাদের বরাদ্দ দিত। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ পাওয়া সম্পদও নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে আসার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের মদদে এই চক্রটি মামলা, হামলা ও নির্যাতনের মাধ্যমে সংগঠনের প্রকৃত সদস্যদের দমন করে দীর্ঘদিন কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল। এর ফলে বহু আসল মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
সরকারের হস্তক্ষেপে প্রশাসক নিয়োগ
৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্রিয় হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি (রেজি. নং ঢ–০৩৮১/৯৭)-এর নির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। শুরুতে অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মো. আবু মাসুদকে প্রশাসক করা হলেও (সূত্র: সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থা নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ শাখা এর স্মারক নং ৪১.০০.০০০ ০.০০০.০৪৬.২৭.০০১৬.২৪.১৮২; তারিখ ০৯ মার্চ ২০২৫) অল্প সময়ের মধ্যে তাকে অব্যাহতি দিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক এম. এম. মাহমুদুল্লাহকে দায়িত্ব দেওয়া হয় (সূত্র: সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থা নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ শাখা এর স্মারক নং ৪১.০০.০০০ ০.০০০.০৪৬.২৭.০০১৬.২৪.৩৩৬; তারিখ ২৯ এপ্রিল ২০২৫)।
২১ অক্টোবর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত সমাজসেবা অধিদপ্তরের ৪১.০০.০০০ ০.০০০.০৪৬.২৭.০০১৬.২৪.৯০৯ স্মারক থেকে জানা যায় যে, পরবর্তীতে তাকেও সরিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু মো. ইসতিয়াক আজিজ উলফাতকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রশাসক উলফাতের বিতর্কিত পদক্ষেপ
মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসক ইসতিয়াক আজিজ উলফাত সংগঠনের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই সমিতির অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেন। পরদিন তিনি সমিতির সঙ্গে যুক্ত মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের অফিসকক্ষ থেকে বের করে দিয়ে নিজে প্রধান কর্মকর্তার কক্ষে বসতে শুরু করেন। এমনকি তিনি সমিতির দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত ফ্ল্যাট খালি করে অন্যত্র চলে যাওয়ারও নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে।
স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ অধ্যাদেশ ১৯৬১, বিধিমালা ১৯৬২ এবং সংস্থাটির অনুমোদিত গঠনতন্ত্র মোতাবেক নিয়োগপ্রাপ্তির ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন এবং প্রতি মাসে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। তবে, অনুসন্ধান করে জানা গিয়েছে, বর্তমান প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো নির্বাচনের কোনো প্রক্রিয়া শুরু হয়নি, উল্টো গত ১৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে বিজয় রাকিন সিটির ফ্ল্যাটবাসীদের কাছে পাঠানো এক নোটিশে ফ্ল্যাট-সংক্রান্ত সকল লেনদেন সরাসরি প্রশাসকের সঙ্গে করতে বলা হয়, যা অনুমোদিত গঠনতন্ত্র বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্দেশনা বহির্ভূত কর্মকাণ্ড।
রিজ বাংলার অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুতর গরমিল পাওয়া গেছে সমিতির অর্থ পরিচালনা নিয়ে। ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ও ১ জানুয়ারি ২০২৬- এই দুই তারিখে প্রাইম ব্যাংকের স্টেটমেন্ট অনুযায়ী প্রশাসক উলফাত দুই দফায় সমিতির হিসাব থেকে মোট ৪০ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। সমিতির সদস্যগণ রিজ বাংলাকে জানিয়েছেন যে এই অর্থ উত্তোলনের ব্যাপারে তারা অবগত ছিলেন না। অথচ এর আগে প্রশাসক নিজেই বলেছিলেন যে, সমিতির অর্থ ব্যয়ের কোনো ক্ষমতা তার নেই।
এই ধরনের কর্মকাণ্ডে হতাশা প্রকাশ করে এই প্রতিবেদককে মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন, নির্বাচনী কাজকে অগ্রাধিকার না দিয়ে ব্যাংক হিসাবের স্বাক্ষর পরিবর্তনসহ আর্থিক বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ায় প্রশাসকের দায়িত্বহীনতা স্পষ্ট হয়েছে এবং এটি অর্থ আত্মসাতের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
প্রশাসকের সহযোগী আমির আলীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
রিজ বাংলার এই অনুসন্ধানে আরও জানা গিয়েছে যে, এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে প্রশাসকের সহযোগী হিসেবে খন্দকার মো. আমির আলীর আকস্মিক আবির্ভাব সংগঠনের ভেতরে চরম বিতর্কের সৃষ্টি করে। তার ব্যাপারে অভিযোগ করে মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন, প্রশাসক আমির আলীকে আইনবহির্ভূতভাবে সমিতির সব কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতা দিয়েছেন। সরেজমিন পরিদর্শন ও অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, প্রশাসক উলফাত নিজে অনিয়মিতভাবে অফিসে এলেও কার্যত সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন আমির আলীই।
বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ মারফত জানা যায়, ইসতিয়াক আজিজ উলফাত এবং খ ম আমির আলী- উভয়ের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ১৬ সেপ্টেম্বর জামুকার সদস্যপদ থেকে তাদের অব্যাহতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০২২-এর ৫(২) ধারা অনুযায়ী এই আদেশ জারি হয়।
খন্দকার মো. আমির আলীর অতীতের নানা কর্মকাণ্ড ঘিরে রিজ বাংলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বানানোর নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া, স্বর্ণ চোরাচালান, চেক ও পে-অর্ডার জালিয়াতি, এবং মানি লন্ডারিংসহ একাধিক অপরাধের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। বিভিন্ন মামলার এজাহার ও আদালতের নথিতে তাকে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও আদালতের নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, ঢাকার বনানী থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২)/৪ ধারায় দায়ের করা এক মামলার এজাহারে খন্দকার মো. আমির আলীর নাম রয়েছে। ওই এজাহারে বলা হয়, ২০১২ সালে তিনি ও তার সহযোগীরা ভুয়া কোম্পানি খুলে স্বর্ণ ব্যবসার নামে চেক ও পে-অর্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ১৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন।
মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আমির আলীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত এক লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, জামুকার সদস্য হওয়ার পর তিনি গোপনে বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন এবং অ-মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন।
ঝিনাইদহের নলডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, তার বাবাকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে আমির আলী ১ লাখ ৭৮ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার বাবার নাম আর তালিকাভুক্ত করা হয়নি। প্রতারিত আমিরুল ইসলাম তার টাকাও ফেরত পাননি। এ ছাড়া শৈলকুপা উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের জন্য ইনস্যুরেন্স করানোর নামে ২৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগেও আমির আলীর নাম উঠে এসেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খন্দকার মো. আমির আলী বলেন, তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, কোনো দুর্নীতির সঙ্গে তিনি জড়িত নন। মুক্তিযোদ্ধাদের ইনস্যুরেন্সের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করে এর দায় অন্যদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন। জামুকা থেকে অব্যাহতির প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, কোনো কারণ ছাড়াই তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতির প্রকৃত সদস্যদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত, সমিতির সকল আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ অডিট এবং স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃত প্রতিনিধিদের হাতে নেতৃত্ব হস্তান্তরের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। এসব ব্যবস্থা না নিলে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণের নামে নতুন করে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশঙ্কাও করছেন তারা।