Ridge Bangla

দেশবাসীকে কাঁদিয়ে গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রীর বিদায়

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সাধারণ কোনো চরিত্র নন। গৃহিণী থেকে সফল রাষ্ট্রনায়কের রূপান্তরের যাত্রা, দায়িত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে তার জীবন মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার এক অমর অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করা খালেদা জিয়ার আদি বাড়ি ফেনীর ফুলগাজী। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার, মা তৈয়বা মজুমদার। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়।

শিক্ষাজীবন কাটে দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান, যিনি ১৯৮১ সালে নিহত হন, বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও রাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া বিএনপির রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে ওঠেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো স্বার্থের চেয়ে নীতি ও আদর্শকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সাতবার আটক হন, তবুও আপসহীন নেতৃত্ব বজায় রাখেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বকাল তিনবারের জন্য, ১৯৯১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত, উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং নারীর ক্ষমতায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তিনি নির্বাচনে কখনো হেরে যাননি। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতে জয়লাভ করেন। ২০০৮ সালে তিনটি আসন থেকে জয়ী হন। এছাড়া দেশের ছয় ভিন্ন জেলা- বগুড়া, ফেনী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর ও খুলনা- থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া তাঁর জনপ্রিয়তার সাক্ষ্য।

নারী শিক্ষার প্রসারে তিনি অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করেন। ২০০১ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দেন। পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করেন এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর প্রথম নারী চেয়ারপার্সন হন। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কারাবাস, মামলা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রের মধ্যেও অবিচল ছিল। ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেওয়া ছিল নীতিনিষ্ঠ অবস্থানের পরিচয়। বিদেশি চিকিৎসা, শারীরিক কষ্ট ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও তিনি আপসহীন ছিলেন।

তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বেসরকারি খাতের শক্তিশালীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং গার্মেন্টস শিল্পের প্রসার ঘটে। জাতিসংঘে গঙ্গার পানি ও রোহিঙ্গা সমস্যা উত্থাপনসহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের স্বার্থ রক্ষা করেন তিনি। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কেবল নেতৃত্বের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ন্যায় ও মানবিকতার এক অমর প্রতীক। তিনবার প্রধানমন্ত্রীত্ব, রাজনৈতিক সংগ্রাম, কারাবাস ও পারিবারিক শোকের মধ্যেও তিনি প্রমাণ করেছেন, নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতা নয়, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, নীতি ও আপসহীনতা।

দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালে মারা যান। পারিবারিক ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও খালেদা জিয়ার সংগ্রাম ও নেতৃত্ব বাংলাদেশে গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব ও নারীর ক্ষমতায়নের এক অমর অধ্যায় হয়ে থাকবে। আজ বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক চরিত্র নন; তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র, ন্যায় ও সাহসের এক স্থায়ী প্রতীক। তাঁর জীবনকথা আমাদের শেখায়, একজন নারী চাইলে শুধু পরিবার নয়, সমগ্র জাতিকেও পথ দেখাতে পারেন; নেতৃত্বের সঙ্গে নৈতিকতা ও আপসহীনতা যুক্ত করা যায়। বেগম খালেদা জিয়ার নাম বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে- সংগ্রামের শিখায় উজ্জ্বল, সততার দীপ্তিতে দীপ্যমান এবং গণতন্ত্রের যাত্রাপথে অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা হিসেবে।

This post was viewed: 47

আরো পড়ুন