Ridge Bangla

বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষি সংকট: মাঠে নেই ডিলারদের সার, দখলে কালোবাজার

রাজশাহীর বরেন্দ্র এলাকায় আলু ও বোরো আবাদের ভরা মৌসুমে সরকারি ভর্তুকির সার কৃষকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলারদের জন্য বরাদ্দকৃত সারের একটি বড় অংশ কালোবাজারে চলে যাচ্ছে। এর ফলে সাধারণ কৃষকদের সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক লাইসেন্সবিহীন ব্যক্তিও টনে-টনে সরকারি সার মজুত করে চড়া দামে বিক্রি করছেন। তানোরের মোহর গ্রামের বিএডিসি বীজের ডিলার মাসুদ, যাঁর সার বিক্রির অনুমোদন নেই, ট্রাকভর্তি সার এনে উচ্চমূল্যে বিক্রি করছেন। আলুচাষি শরিফুল ইসলামের অভিযোগ, যেখানে চাষি পর্যায়ে ডিএপি সারের সরকারি দাম ১ হাজার ৫০ টাকা, সেখানে মাসুদ তাঁর কাছে প্রতি বস্তা ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি করতে চাইছেন।

মাসুদ স্বীকার করেছেন, তিনি তানোরের মেসার্স প্রণব ট্রেডার্স, মেসার্স আনজুয়ারা ট্রেডার্স এবং বিসিআইসি ডিলার সুমন কুমার শীলের কাছ থেকে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত ২৫০ টাকা দিয়ে সার কিনে আনেন। তবে অভিযুক্ত ডিলার প্রণব কুমার সাহা মাসুদের কাছে সার বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

শুধু তাই নয়, এক জেলার জন্য বরাদ্দকৃত সার পাচার হয়ে যাচ্ছে অন্য জেলায়। এক উপজেলার সরকারি সার চোরাই পথে ঘুরছে আরেক উপজেলায়। কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় সার ডিলাররা গুদাম থেকে সার উত্তোলন করে কালোবাজারে বিক্রি করে দেন। কৃষকরা কিনতে গেলে মজুত ফুরিয়ে গেছে বলে জানানো হয়।

চাষিদের অভিযোগ, বর্তমান কৃত্রিম সংকটের কারণে ১ হাজার ৫০ টাকার ডিএপি সার ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায়, ১ হাজার ৩৫০ টাকার টিএসপি ২ হাজার টাকায় এবং ১ হাজার টাকার এমওপি সার ১ হাজার ৩০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।

কাগজে-কলমে জেলা ও উপজেলা সার মনিটরিং কমিটি থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর কার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে না। ভুক্তভোগী কৃষকদের গুরুতর অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় পুলিশ এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের কিছু ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়েই এই অবৈধ সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে।

যদিও দু-একটি ক্ষেত্রে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে চোরাই সার উদ্ধার করা হয়, সেসব ক্ষেত্রেও পাচারকারীদের নামমাত্র জরিমানা করে ছেড়ে দিচ্ছে উপজেলা সার মনিটরিং কমিটিগুলো।

তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল্লাহ সারের পাচারের তথ্য অস্বীকার করে জানিয়েছেন, নিয়মিত ডিলারদের স্টক পরীক্ষা করা হয়। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

এদিকে সারের কৃত্রিম সংকট ও লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বহুগুণে বেড়েছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে অনেক ক্ষুদ্র কৃষক আলু ও বোরো আবাদের পরিকল্পনা করেও পিছিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। যারা আবাদ করছেন, তারা সারের পেছনে বাড়তি টাকা খরচ করায় লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েছেন।

কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অবিলম্বে সারের কালোবাজারি সিন্ডিকেটকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনকে মাঠ পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে ভর্তুকি মূল্যের সার যেন প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

This post was viewed: 33

আরো পড়ুন