Ridge Bangla

দ্য ড্যান্সিং প্লেগ: এক রহস্যময় মহামারী

ষোড়শ শতাব্দী ছিল ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন শতাব্দীগুলোর মধ্যে একটি। একদিকে যেমন প্লেগ, গুটিবসন্ত ও ক্ষুধার মহামারীতে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে, তেমনই আরেক ভয়ংকর ও রহস্যময় ঘটনা গোটা মহাদেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। ১৫১৮ সালের গ্রীষ্মে ফরাসি শহর স্ট্রাসবার্গে (Strasbourg) অদ্ভুত মহামারী মহামারী হানা দেয়। এটি ইতিহাসে ‘ড্যান্সিং প্লেগ’ নামে পরিচিত। এই ঘটনাটি এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে, হাজার হাজার বছর ধরে ঐতিহাসিক ও বিজ্ঞানীরা এর কারণ উদঘাটনে হিমশিম খেয়েছেন। এটি ছিল এমন এক বিচিত্র রোগ, যার কোনো নিরাময় ছিল না। এই অদ্ভুত মহামারীর মানুষ নাচতে নাচতে মারা যেতে শুরু করেছিল।

১৫১৮ সালের জুলাই মাসে, স্ট্রাসবার্গের এক সরু গলিতে প্রথমবারের মতো ড্যান্সিং প্লেগের ঘটনা দেখা যায়। ফ্রাউ ট্রোফিয়া (Frau Troffea) নামের একজন নারী হঠাৎ করে রাস্তা থেকে নাচতে শুরু করেন। তিনি কোনো সঙ্গীতের তালে তালে বা আনন্দের কারণে নাচছিলেন না। বরং তার নাচের ধরন ছিল নিয়ন্ত্রণহীন। তার হাত-পা অবশ হতে শুরু করলেও নাচ থামাননি তিনি। ক্রমাগতভাবে ঘুরতে ও লাফাতে থাকেন।

তার নাচের এই অদ্ভুত ঘটনা দেখে প্রথমে মানুষ কৌতূহলী হয়৷ কিন্তু কয়েকদিন পর যখন তার নাচ থামার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না, তখন সবার মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এক সপ্তাহের মধ্যে আরও প্রায় ৩৪ জন মানুষ ফ্রাউ ট্রোফিয়ার মতো করে নাচতে শুরু করে। যারা নাচ শুরু করেছিলেন, একেবারে মারা না যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের নাচ থামছিলই না। এক মাসের মধ্যেই মৃতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যায়, এবং সেই সংখ্যা দ্রুত গতিতে বাড়তে থাকে।

​সারা শহর জুড়ে এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখা যায়। শত শত মানুষ একযোগে নাচছে, কিন্তু তাদের মুখে আনন্দ বা উদ্দীপনার কোনো চিহ্ন নেই। বরং তাদের মুখগুলো ছিল যন্ত্রণায় কাতর, চোখে ছিল শূন্য দৃষ্টি। দেখে মনে হচ্ছিল কোন অদৃশ্য শক্তি তাদের মস্তিষ্কের দখল নিয়ে তাদেরকে রোবটের মতো ব্যবহার করছে। তারা থামতে পারছিল না কোনভাবেই, তাদের শরীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। অনেকেই ক্লান্তি, পানিশূন্যতা ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ছিলেন।

​শহরের কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকেরা এই রহস্যময় রোগের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। তারা একে ‘উষ্ণ রক্তের’ রোগ বলে মনে করেন। তাদের ধারণা ছিল, রোগীর শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে গিয়েছে এবং নাচের মাধ্যমেই একসময় এই উত্তাপ বের করে দেওয়া সম্ভব। এই অদ্ভুত ধারণার বশবর্তী হয়ে, তারা আরও ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেন। তারা মনে করলেন, আক্রান্তদের সুস্থ হওয়ার জন্য আরও বেশি করে নাচতে দেওয়া উচিত।

শহরের মধ্যস্থানে একটি কাঠের মঞ্চ স্থাপন করা হয়, সেখানে পেশাদার নর্তকদের আনা হয় এবং যন্ত্রসংগীত বাজানোর জন্য সঙ্গীতশিল্পীদের নিয়োগ করা হয়, যাতে রোগীরা নির্বিঘ্নে নাচ চালিয়ে যেতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, নাচের মাধ্যমে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়া। কিন্তু এর ফল হয় সম্পূর্ণ বিপরীত। এক দিনে প্রায় ১৫ জন মানুষ নাচের ক্লান্তি ও হৃদরোগে মারা যায়। এই ঘটনার পর শহরের কর্তৃপক্ষ দ্রুত তাদের ভুল বুঝতে পারেন এবং সব ধরনের নাচ, গান ও সঙ্গীত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এরপর রোগীদের জোর করে শহরের বাইরে সেন্ট ভিটুসের (St. Vitus) মঠে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যিনি নৃত্যরোগীদের নিরাময়কারী পুরোহিত হিসেবে সমাজে পরিচিত ছিলেন।

​আধুনিক যুগে বিজ্ঞানীরা এই ঘটনার দুটি প্রধান কারণ সম্পর্কে গবেষণা করেছেন। প্রথম ও সবচেয়ে জনপ্রিয় তত্ত্বটি হলো গণ হিস্টিরিয়া বা Mass Psychogenic Illness (MPI)। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে মানসিক চাপ, ভয় বা ট্রমার কারণে একটি গোষ্ঠীর মধ্যে শারীরিক উপসর্গ ছড়িয়ে পড়ে, যার কোনো শারীরিক বা জৈবিক কারণ থাকে না।

১৫১৮ সালের স্ট্রাসবার্গ ছিল দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য ও ভয়ংকর প্লেগ মহামারীর কেন্দ্রস্থল। মানুষ ছিল চরম মানসিক চাপ ও দুর্দশার মধ্যে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ফ্রাউ ট্রোফিয়ার নাচ সম্ভবত জনগণের অবরুদ্ধ মানসিক যন্ত্রণা ও ভয় প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছিল। যখন একজন মানুষ মানসিক চাপে থাকে, তার মস্তিষ্ক এমন কিছু উপসর্গ তৈরি করতে পারে, যা বাস্তবে শারীরিক অসুস্থতা নয়। স্ট্রাসবার্গের মানুষ যখন একে একে নাচতে শুরু করে, তখন এটি একধরনের সম্মিলিত মানসিক উন্মাদনায় পরিণত হয়।

​দ্বিতীয় তত্ত্বটি হলো আর্গট বিষক্রিয়া (Ergot Poisoning)। এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ, যা ‘ক্ল্যাভিসেপ্স পার্পিউরিয়া’ (Claviceps purpurea) নামক ছত্রাক দ্বারা ছড়ায়। এই ছত্রাক সাধারণত রাই, গম বা অন্য শস্যের উপর জন্মায়। এই বিষক্রিয়ার ফলে মানুষের শরীরে খিঁচুনি, অঙ্গ-প্রতঙ্গের সংকোচন ও হ্যালুসিনেশন হয়। প্রাচীন যুগে এই রোগকে ‘সেন্ট অ্যান্টনির আগুন’ বলা হতো। তবে আধুনিক বিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বটি বাতিল করে দিয়েছেন। কারণ, আর্গট বিষক্রিয়ার ফলে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং অঙ্গ-প্রতঙ্গ গ্যাংরিনে আক্রান্ত হয়, যা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বা দিনের পর দিন ধরে নাচাকে অসম্ভব করে তোলে।

ড্যান্সিং প্লেগ ছিল একটি বিরল ও বিচিত্র ঐতিহাসিক ঘটনা, যা আজও আমাদের বিস্মিত করে। এটি কেবল একটি স্বাস্থ্য সংকট ছিল না, বরং এটি ছিল চরম মানসিক চাপ ও সামাজিক দুর্দশার এক করুণ বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মন কতটা শক্তিশালী এবং একটি ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থায় মানসিক যন্ত্রণা কীভাবে শারীরিক উপসর্গ হিসেবে প্রকাশ পেতে পারে।

তথ্যসূত্র

১) The people who ‘danced themselves to death’

২) What Was the Dancing Plague of 1518?

৩) The Dancing Plague of 1518

This post was viewed: 38

আরো পড়ুন